‘মহাগুরু’ থেকে ‘পাগলু’।
এ বারের লোকসভা ভোটের প্রচারে তৃণমূলের সভাগুলিতে কালনা মহকুমার নানা গ্রামে জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। প্রিয় তারকাকে নিজের চোখে দেখবার জন্য সভাগুলিতে ভিড়ও হয়েছিল বেজায়। আর এই ভিড়কে সামনে রেখেই জয়ের আঁক কষছেন তৃণমূল নেতৃত্ব। জেলা তৃণমূল নেতাদের দাবি, তারকাদের দেখতে যাঁরা এসেছেন, তাঁরাই ইভিএমে জোড়াফুল চিহ্নে বোতাম টিপবেন। কারণ, মিঠুন, দেব, দেবশ্রী-যাঁরাই বক্তব্য রেখেছেন, তাঁরা জনতাকে তৃণমূলে ভোট দেওয়ার আহ্বান করেছেন। জনতাও তাতে চিৎকার করে সাড়া দিয়েছেন। যদিও, বিরোধীদের অবশ্য দাবি, তারকাদের দেখতে স্বাভাবিক কৌতূহলেই কিছু মানুষ গিয়েছিলেন। কিন্তু ভোট দেওয়ার সময়ে মানুষ তৃণমূলের বিরুদ্ধেই রায় দেবেন।
সোমবার, ভোট প্রচারের শেষ দিন, কালনা-২ ব্লকের বড়ধামাস পঞ্চায়েতের ফুটবল মাঠে সভা করতে এসেছিলেন অভিনেত্রী ও তৃণমূল বিধায়ক দেবশ্রী রায়। অভিনেত্রীকে দেখতে তীব্র গরমের মধ্যেও উপস্থিত ছিলেন হাজার হাজার মানুষ। দেবশ্রী যতক্ষণ ছিলেন, ততক্ষণ ভিড় শুধুই বেড়েছে। গত, ২৭ এপ্রিল, পূর্বস্থলীর জামালপুরে সভা করতে এসেছিলেন ঘাটাল লোকসভা কেন্দ্রের তৃণমূল প্রার্থী ও বাংলা সিনেমার অভিনেতা দেব। প্রথম বার তাঁর কপ্টার ধুলোঝড়ের কারণে মাটিতে নামতে না পারলেও দেব দর্শনে আসা জমাটি ভিড় কিন্তু একটুকুও হালকা হয়নি। কিছু ক্ষণ পরে অন্য একটি সভা থেকে ফের কপ্টারে করে এসে জামালপুরে নামেন দেব। তখন জনতার উল্লাস ছিল চোখে পড়ার মত। ২৩ এপ্রিল, কালনার অঘোরনাথ পার্ক স্টেডিয়ামে এসেছিলেন অভিনেতা ও তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ মিঠুন চক্রবর্তী। গরম উপেক্ষা করেই ব্যাপক ভিড় হয়েছিল সেই সভায়। শুধু কালনাই নয়, গ্রামীণ বর্ধমানের অন্য প্রান্তগুলিতেও অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে এসে প্রচার করেছে তৃণমূল। মেমারি, মন্তেশ্বর, খন্ডঘোষ, রায়না, গলসিতে প্রচারে এসেছিলেন যীশু সেনগুপ্ত, শুভশ্রী, জুন মালিয়া-সহ একঝাঁক অভিনেতা-অভিনেত্রী। তারকাদের কাছে যাওয়ার জন্য সব কটি সভাতেই দেখা গিয়েছে ব্যাপক হুড়োহুড়ি।
তৃণমূলের জেলা (গ্রামীণ) সভাপতি ও রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের আশা, “তারকা খচিত সভাগুলিতে জনতার স্বতস্ফূর্ততা ছিল চোখে পড়ার মত। প্রত্যেকটি সভায় প্রচুর মানুষ ভিড় করেছিলেন। ইভিএমে তার প্রভাব পড়বেই। নতুন ভোটারদের বেশির ভাগই ভোটই আসবে আমাদের ঝুলিতে।”
যদিও তারকাদের প্রচারে এনে ভোট বাড়ানো যায় না বলেই মনে করছে সিপিএম। দলের পূর্বস্থলী জোনাল কমিটির সম্পাদক সুব্রত ভাওয়ালের দাবি, “সারদা-সহ অনেক কেলেঙ্কারিতে ভরে গিয়েছে তৃণমূলের সরকার। মানুষ সব জানে। তাই তারকাদের প্রচারে এনে কোনও লাভ হবে না।” তাঁর সংযোজন, “সাধারণ মানুষ অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দেখতে সভায় গিয়েছিলেন। এর সঙ্গে ভোটের কোনও সম্পর্কই নেই।” কালনার এক সিপিএম নেতার কটাক্ষ, “অঘোরনাথ পার্ক স্টেডিয়ামের সভায় মিঠুন চলে যাওয়ার পরেই মাঠ অর্ধেক ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল। তাই ওসব নিয়ে আমরা ভাবছি না।” যদিও কালনা শহরের তৃণমূল নেতা গোরা পাঠকের পাল্টা দাবি, “মিঠুনের সভায় অঘোরনাথ পার্ক স্টেডিয়াম কানায় কানায় ভর্তি ছিল। বিরোধীরা মিঠুনের সভা নিয়ে অপপ্রচার করলেও লাভ হবে না।”
বর্ধমান-পূর্বের বিজেপি প্রার্থী সন্তোষ রায়ের মতে, “যাঁদের ছবি টিকিট কেটে সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে হয়, তাঁদের যদি বাড়ির পাশেই দেখা যায়, তাহলে তো ভিড় হবেই। সেই ভিড়ে তৃণমূল ছাড়া অন্য দলের কর্মীরাও থাকতে পারেন। তাহলে কী ধরতে হবে তাঁরাও তৃণমূলে ভোট দেবেন?” জেলা কংগ্রেস নেতারাও তৃণমূলের এই প্রচার কৌশলকে ‘সস্তার চমক’ বলে কটাক্ষ করেছেন।
কার অনুমান সঠিক, তার জন্য অবশ্য অপেক্ষা করতে হবে ১৬ মে ইভিএম খোলা পর্যন্ত।