Advertisement
E-Paper

বিচারক নেই, ধর্ষণের মামলা পিছোচ্ছেই

আদালতের বন্ধ কামরায়, বিচারকের সামনে প্রায় দু’বছর আগে ‘ধর্ষক’কে চিনিয়ে দিয়েছিলেন অভিযোগকারিণী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাঁর ছোট মেয়ে। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বের দু’বছর কাটতে চললেও শুনানি শেষ হল না অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেতুগ্রাম ধর্ষণের মামলার। সরকারি থেকে অভিযুক্তদের আইনজীবী, সকলেরই অভিযোগ, কাটোয়া ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের বিচারক না থাকায় এই মামলা বারেবারে পিছিয়ে গিয়েছে।

সৌমেন দত্ত

শেষ আপডেট: ৩০ জুলাই ২০১৫ ০২:২৯

আদালতের বন্ধ কামরায়, বিচারকের সামনে প্রায় দু’বছর আগে ‘ধর্ষক’কে চিনিয়ে দিয়েছিলেন অভিযোগকারিণী ও ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তাঁর ছোট মেয়ে। সাক্ষ্যগ্রহণ পর্বের দু’বছর কাটতে চললেও শুনানি শেষ হল না অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেতুগ্রাম ধর্ষণের মামলার।
সরকারি থেকে অভিযুক্তদের আইনজীবী, সকলেরই অভিযোগ, কাটোয়া ফাস্ট ট্র্যাক আদালতের বিচারক না থাকায় এই মামলা বারেবারে পিছিয়ে গিয়েছে। তাঁরা সাফ জানিয়েছেন, বিচারক না থাকায় পাঁচ মাস ধরে এই মামলার মূল তদন্তকারী অফিসার জয়জিৎ লোধের সাক্ষ্যগ্রহণ বারবার পিছিয়ে গিয়েছে।
আর মেয়ের মাথায় বন্দুক ধরে কাটোয়ার ছোট রেল থেকে নামিয়ে যে মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ, তিনি বলেন, “আমরা ভয়ে বা কোনও প্রলোভনে পড়ে পিছিয়ে যাইনি। আমি ও আমার মেয়ে আদালতে ওই শয়তানদের চিনিয়ে দিয়েছি। কিন্তু তিন বছর কেটে যাওয়ার পরেও বিচার শেষ হল না! ওদের শাস্তি না হওয়া পর্যন্ত শান্তিতে ঘুমাতে পারব না।” তিন বছর ধরে ওই মহিলার পাশে থাকা প্রতিবেশীরাও বলেন, “সাক্ষীদের শুনানি শেষ হতেই যদি, দু’বছরের উপর লেগে যায়, তাহলে বিচার কবে হবে? ওই মহিলা একা যে ভাবে লড়াই করেছেন, তাতে ওর ন্যায় বিচার পাওয়া উচিত।”

২০১৩ সালের ৩০ অগস্ট এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শুরু হয়েছিল। প্রথম দিনই বন্ধ আদালত কক্ষের ভিতর অভিযোগকারিণী তিন অভিযুক্ত রেজাউল মির্জা ওরফে বাবু, নয়ন শেখ ও ফরিদ শেখকে চিনিয়ে দেন। পরবর্তীতে এই তিন জনের মধ্যে জামিনে থাকা ফরিদ পথ দুর্ঘটনায় মারা যান। যে বিচারকের সামনে কাটোয়া উপ সংশোধনাগারে টিআই প্যারেড হয়েছিল, সেই বিচারক উদয় রানা সাক্ষ্য দেওয়ার সময় জানিয়েছিলেন, রেজাউল মির্জা ডাকাতি করতে ট্রেনে উঠেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

এক সময় বীরভূমের কীর্ণাহারে সেলাইয়ের কাজ করতেন কেতুগ্রামের ওই বিধবা। ২০১২ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি কাটোয়া -আমোদপুর ছোট রেলে (ন্যারোগেজ ট্রেন) করে বাড়ি ফিরছিলেন তিনি। তখনই কেতুগ্রামের পাচুন্দির কাছে গার্ডের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ট্রেনে ডাকাতি শুরু হয়। সেই সময়ে মেয়ের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ওই মহিলাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে ঝোপের ভিতর নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করা হয় বলেও অভিযোগ। সেই ছোটরেল এখন ব্রডগেজের দিকে দৌড়চ্ছে। কিন্তু ৩৮ জনের মধ্যে ৩৭ জনের সাক্ষ্য দেওয়া হয়ে যাওয়ার পরেও থমকে রয়েছে ওই মহিলার জীবন।

মামলা শেষ হতে এত দেরি কেন?

আইনজীবীরা জানাচ্ছেন, এই মামলা শুরুর হওয়ার পর থেকে দু’বার দীর্ঘ সময়ের জন্য কাটোয়া আদালতে ফাস্ট ট্র্যাক বিচারক ছিলেন না। তার ফলে সাক্ষ্যগ্রহণ পর্ব শেষ হতে দেরি হয়েছে। এ ছাড়াও ট্রেনের গার্ড ও পুলিশ আধিকারিকেরা নির্দিষ্ট তারিখে সাক্ষ্য দিতে আসেননি। এমনকী ডাকাতির ঘটনার তদন্তকারী অফিসার, কাটোয়া রেল পুলিশের তৎকালীন ওসি তুষার সর্দারের বিরুদ্ধে আদালতকে গ্রেফতারি পরোয়না জারি করতে হয়েছিল। আইনজীবীরা জানান, গত মার্চ মাসে কাটোয়া আদালতের ফাস্ট ট্র্যাক বিচারক পরেশকুমার কর্মকার পদোন্নতি হওয়ায় চলে যান। তার প্রায় পাঁচ মাস পরে ওই আদালতের বিচারক পদে যোগ দিয়েছেন কাজী আব্দুল আনসারি। সরকারি আইনজীবী কাঞ্চন মুখোপাধ্যায় বলেন, “মূল তদন্তকারী অফিসারের সাক্ষ্যগ্রহণই শুধু বাকি রয়েছে। বিচারক না থাকায় এই মামলা বারেবারে পিছিয়ে যাচ্ছে। এক জন বিধবা মহিলার বিচার পেতে দেরি হচ্ছে। আদালতের কাছে আমাদের আবেদন বিচার প্রক্রিয়া তাড়াতাড়ি শেষ হোক।” একই দাবি জানিয়েছেন অভিযুক্তদের অন্যতম আইনজীবী ধীরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “গত তিন মাসে ছ’বার আমার মক্কেলদের আদালতে নিয়ে এসেছে পুলিশ। কিন্তু বিচারক না থাকায় বিচারের কাজ হয়নি। বিচার শেষ হচ্ছে না বলে, মিথ্যা মামলায় তিন বছর ধরে জেলে আটকে রয়েছে মক্কেলরা।”

মুখ্যমন্ত্রী এই ঘটনায় ‘রাজনৈতিক রং’ দেখেছিলেন। ‘সাজানো ঘটনা’ এবং ‘ওর স্বামী সিপিএম করে’ বলে মন্তব্যও করেছিলেন। সে কথা আজও ভুলতে পারেন না অভিযোগকারিণী। তিনি বলেন, “মেয়ের সামনে যে ঘটনা ঘটেছে, সেটা কী করে মিথ্যা হয়। তা ছাড়া নিজের নামে কেউ অপবাদ দিতে পারে?” কিছুটা থেমে ফের বলেন, “শয়তানগুলোর শাস্তি না হলে মেয়েদের নিয়ে বাঁচব কী ভাবে? সমস্ত লড়াই শেষ হয়ে যাবে!”

তিন বছর পার করেও এখনও আতঙ্কে দিন কাটে ওই পরিবারের। হাইকোর্টের নির্দেশে এখনও বাড়ির সামনে পুলিশের পাহারা রয়েছে। নির্যাতিতার মেজ জা বলেন, “আমরা ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাই নি বলে, দুষ্কৃতীরা নতুন করে আমাদের আর কোনও ক্ষতি করতে পারেনি। তবে সব সময় চিন্তাতেই থাকি।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy