রাজ্যে একই দিনে আরও চার জনের মৃত্যুর ঘটনায় এসআইআর-কে দুষল পরিবার এবং শাসকদল। মঙ্গলবার কোচবিহার জেলায় দু’জন এবং জলপাইগুড়ি ও উত্তর ২৪ পরগনায় দু’জনের প্রাণহানি হয়েছে। তবে চার মৃত্যুর কারণ ‘অন্য’ বলে দাবি করেছে বিজেপি।
গণনাপত্র পূরণ করে বিএলও-র কাছে জমা দিয়েছিলেন কোচবিহারের সিতাই বিধানসভার ওকরাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের ৬/২৭২ নম্বর বুথের বড় ফলিমারি এলাকার বাসিন্দা সুচিত্রা বর্মণ। খসড়া তালিকায় দেখা যায় সুচিত্রার বাবার নামের জায়গায় দাদার নাম তোলা হয়েছে। অন্য দিকে, এ পর্যন্ত এসআইআর শুনানিতেও ডাক পাননি তিনি। এ নিয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন সুচিত্রা ও তাঁর স্বামী সুভাষ বর্মণ। স্ত্রীর ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে তাঁকে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়া হবে, এই আতঙ্কে সুভাষ আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি পরিবারের।
মৃতের পরিবার জানিয়েছে, ৪৫ বছরের ওই গৃহশিক্ষক সোমবার রাতে হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। পরে পাশের পাড়ার একটি জায়গায় তাঁকে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। সুভাষ এবং সুচিত্রার দুই সন্তান। এ ছাড়াও পরিবারে আছেন বাবা-মা। পুত্রের মৃত্যু নিয়ে সুভাষের বাবা শচীনচন্দ্র বর্মণ বলেন, ‘‘এসআইআর নিয়ে ছেলে খুবই দুশ্চিন্তার মধ্যে ছিল। সারাদিন আতঙ্কে থাকত। কারণ, বৌমার বাবার নামের পরিবর্তে দাদার নাম উঠেছে খসড়া তালিকায়। স্ত্রীকে ডিটেনশন ক্যাম্প বা বাইরে কোথাও পাঠিয়ে দিলে কী হবে, সেই সব ভাবত। গতকাল রাত ২টো নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর কিছুটা দূরে ওর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করি।’’
মঙ্গলবার খবর পেয়ে দুপুরে মৃতের বাড়িতে যান তৃণমূল সাংসদ জগদীশচন্দ্র বসুনিয়া। তিনি জানান, আগামী ১৩ জানুয়ারি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কোচবিহারে সভা করবেন। প্রয়োজনে সুভাষের পরিবারকে মঞ্চে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হবে। তিনি বলেন, ‘‘বলার মতো কোনও ভাষা নেই। উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উনি দর্শনে স্নাতকোত্তর করে গৃহশিক্ষকতা করে সংসার চালাতেন। স্ত্রীর নামের সামান্যতম ভুল, যা বিএলও অ্যাপের মাধ্যমেই ঠিক হয়ে যাওয়ার কথা, সেই টেনশনই ওঁর জীবন কেড়ে নিল। নির্বাচন কমিশন আর কেন্দ্রীয় সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের প্রাণ যাচ্ছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘এই মৃত্যুর জন্য দায়ী নির্বাচন কমিশন। কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রুজু করা উচিত।’’ পাল্টা বিজেপি জেলার সহ-সভাপতি বিরাজ বসু বলেন, ‘‘যে কোনও মৃত্যুই বেদনাদায়ক। আমরা ওই পরিবারের পাশে আছি। কিন্তু কোচবিহারের সাংসদ যে অভিযোগ করছেন তা ভিত্তিহীন। যে কোনও মৃত্যুতেই দোষ চাপানো হচ্ছে এসআইআর প্রক্রিয়ার উপরে। এক জন সাংসদের মুখে এমন কথাবার্তা শোভা পায় না।’’
আরও পড়ুন:
এর মধ্যে কোচবিহারেই আরও এক মৃত্যুর নেপথ্যে এসআইআরকে দায়ী করেছে শাসকদল। স্থানীয় সূত্রে খবর, হলদিবাড়ির সর্দারপাড়ার বাসিন্দা মলিন রায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁর নাম ছিল না। তাই শুনানিতে ডাক পড়েছিল। পরিবার জানিয়েছে, সমস্ত নথি না থাকার আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন ৬৫ বছরের বৃদ্ধ। মঙ্গলবার ব্রেন স্ট্রোকে মৃত্যু হয় তাঁর। মলিন টোটো চালিয়ে উপার্জন করতেন। দুই ছেলের মধ্যে বড় ছেলে বাসুদেব রায় বলেন, ‘‘২০০২ সালের ভোটার তালিকায় বাবা এবং ঠাকুরদার নাম ছিল না। তা নিয়ে মানসিক চাপে ছিল বাবা।’’
বিকেলে মেখলিগঞ্জের বিধায়ক পরেশচন্দ্র অধিকারী, তৃণমূলের ব্লক কমিটির সভাপতি মানস রায় বসুনিয়া, যুব তৃণমূলের ব্লক কমিটির সভাপতি প্রশান্তকুমার রায় প্রমুখ মৃতের বাড়িতে গিয়েছিলেন। এখানেও তৃণমূলের দাবি উড়িয়ে দেয় বিজেপি।
সোমবার রাত থেকে জলপাইগুড়ির ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ি বিধানসভার ফুলবাড়ি-২ অঞ্চলের পূর্ব ধনতলার চুনাভাটির বাসিন্দা মহম্মদ খাদেমের খোঁজ মিলছিল না। মঙ্গলবার সকালে ৫৭ বছর বয়সি ওই গাড়িচালকের দেহ মেলে বাড়ির পাশের একটি ঝোপে। এই রহস্যমৃত্যুর নেপথ্যেও এসআইআরকে দায়ী করেছে তৃণমূল। খাদেমের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান শিলিগুড়ির মেয়র গৌতম দেব। মৃতের পরিবার সূত্রে খবর , ২০০২ সালে ভোটার তালিকায় নাম ছিল না খাদেমের। শুনানিতে হাজিরা দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার সকালে বাড়ির পাশের একটি ঝোপে গাছ থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়৷ মৃতের ছেলে মহম্মদ সায়েদ বলেন, ‘‘এসআইআর আতঙ্কে ঘুম উড়ে গিয়েছিল বাবার৷ সেই আতঙ্কেই আত্মহত্যা করেছেন তিনি।’’ অন্য দিকে, ডাবগ্রাম-ফুলবাড়ির বিজেপি বিধায়ক শিখা চট্টোপাধ্যায়ের কটাক্ষ, ‘‘হাঁস-মুরগি মারা গেলেও এ বার এসআইআরকে দায়ী করবে তৃণমূল।’’
উত্তর ২৪ পরগনায় এক প্রৌঢ়ার মৃত্যুতেও এসআইআরকে দায়ী করেছে তৃণমূল। মৃতার নাম রত্না চট্টোপাধ্যায়। নৈহাটি বিধানসভার জেটিয়া অঞ্চলের বাসিন্দারা মঙ্গলবারই শুনানিতে গিয়েছিলেন। সেখানে দীর্ঘ ক্ষণ অপেক্ষা করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কল্যাণীর একটি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসক। মৃতার বাড়িতে যান নৈহাটির বিধায়ক সনৎ দে।