পাঁচ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ দেখেছিল ‘যোগদান মেলা’। তৃণমূল-বাম-কংগ্রেসের নেতাকর্মীদের বিজেপি-তে গণযোগদানের আয়োজন। রাজ্যের নানা প্রান্তে সে ‘মেলা’ হচ্ছিল। এ বারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে সেই মেলা নেই। কিন্তু তার বদলে আছে অন্য এক মেলা। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এ বার এক নজিরবিহীন মেলা দেখাতে চলেছে। ‘নেতার মেলা’। কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক নাম অবশ্য ‘পরিবর্তন যাত্রার উদ্বোধন’। কিন্তু ১ এবং ২ মার্চ সেই উদ্বোধন ঘিরে একসঙ্গে যত জন ওজনদার বিজেপি নেতা-মন্ত্রী পশ্চিমবঙ্গে আসছেন, তেমন ছবি আগে কখনও তৈরি হয়েছে কি না সন্দেহ!
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক বিভাগের সংখ্যা ১০। তার মধ্যে ন’টি বিভাগেই পরিবর্তন যাত্রা হবে। শুধু কলকাতা মহানগর বিভাগে যাত্রা হবে না। কারণ, গোটা কর্মসূচির পরিসমাপ্তি পর্ব হিসাবে ব্রিগেড সমাবেশ আয়োজনের দায়িত্ব কলকাতা মহানগর বিভাগের উপরে। ১ মার্চ ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র উদ্বোধন হবে পাঁচটি জায়গায়— কোচবিহার, কৃষ্ণনগর, কুলটি, গড়বেতা এবং রায়দিঘি। ২ মার্চ আরও চারটি জায়গায়— ইসলামপুর, হাসন, সন্দেশখালি এবং আমতা। সেই উপলক্ষে দু’দিনে পশ্চিমবঙ্গে আসছেন বিজেপির আট জন কেন্দ্রীয় নেতা বা সর্বভারতীয় স্তরের পরিচিতিসম্পন্ন মুখ। ভোটের আগে ‘নেতার মেলা’।
সোমবার রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী দক্ষিণ ২৪ পরগনার রায়দিঘি বিধানসভা এলাকায় গিয়ে বিজেপির ‘চার্জশিট পেশ’ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। একই দিনে বর্ধমানে মিঠুন চক্রবর্তী, বাঁকুড়ায় অগ্নিমিত্রা পাল, তমলুকে অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় ও সৌমেন্দু অধিকারী, হুগলিতে দিলীপ ঘোষ এবং নদিয়ায় রুদ্রনীল ঘোষও ‘চার্জশিট’ পেশ করতে হাজির ছিলেন। মথুরাপুর, জয়নগর এবং ডায়মন্ড হারবার— এই তিনটি সাংগঠনিক জেলার প্রত্যেক বিধানসভার হালহকিকত এবং দাবিদাওয়া সংক্রান্ত ‘চার্জশিট’ সোমবার রায়দিঘি থেকে প্রকাশ করেছেন শুভেন্দু। বিজেপি সূত্র বলছে, শুধু ‘চার্জশিট’ পেশ করতে শুভেন্দু রায়দিঘি যাননি। অমিত শাহের রায়দিঘি সফরের এক সপ্তাহ আগে সেখানে গিয়ে শুভেন্দু ‘শাহি’-সফরের প্রস্তুতি তরান্বিত করে এলেন। রায়দিঘি থেকে ১ মার্চ ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র সূচনা করবেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা দলের প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি শাহ। আরও দুই প্রাক্তন সর্বভারতীয় সভাপতি ওই দু’দিনে পশ্চিমবঙ্গে আসছেন। একজন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জগৎপ্রকাশ নড্ডা। তিনি ১ মার্চ নদিয়ার কৃষ্ণনগর থেকে ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করবেন। দ্বিতীয় জন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ। তিনি ২ মার্চ হাওড়ার আমতায় ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করবেন।
বিজেপির বর্তমান সভাপতি নিতিন নবীন উদ্বোধন পর্বের দু’দিনই রাজ্যে থাকছেন। তবে দু’দিনই উত্তরবঙ্গে। প্রথম দিন তিনি কোচবিহার শহর থেকে একটি ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করবেন। পরের দিন উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর থেকে আর একটির উদ্বোধন করবেন।
৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শাহ, রাজনাথ, নড্ডা, নিতিনের মতো বিজেপির সর্বোচ্চ নেতৃত্বের প্রায় সকলেই একসঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে থাকছেন, এমন ছবি আগে কখনও দেখা যায়নি। কিন্তু বিজেপি-র এই ‘নেতার মেলা’-য় ওজনদার নামের তালিকা এখানেই শেষ হচ্ছে না। ১ মার্চ পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতা থেকে ‘যাত্রা’ উদ্বোধন করবেন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। একই দিনে আসানসোলের কুলটি থেকে আর একটি ‘যাত্রা’র উদ্বোধন করবেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশুকল্যাণ মন্ত্রী অন্নপূর্ণা দেবী। ২ মার্চ বীরভূমের হাসনে ‘পরিবর্তন যাত্রা’র উদ্বোধনে থাকছেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীস। আর গত কয়েক বছরে রাজ্য রাজনীতিতে বহুচর্চিত সন্দেশখালি থেকে ওই দিনই আর একটি ‘যাত্রা’-র উদ্বোধন করবেন কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান।
বিজেপির তরফে আগেই জানানো হয়েছিল কোন কোন কেন্দ্রীয় নেতা ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র উদ্বোধনে আসবেন। নামের তালিকায় ঈষৎ পরিবর্তন হয়েছে। নিতিন গড়কড়ীর নাম সরে গিয়ে এসেছে শিবরাজের নাম। স্মৃতি ইরানির পরিবর্ত হিসাবে আসছেন অন্নপূর্ণা দেবী। স্মৃতির মতো অন্নপূর্ণাও বাংলা বলতে পারেন। কোন নেতা কোথায় আসছেন, সে তালিকা বিজেপি এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে ঘোষণা করেনি। তবে রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে তা জানানো হয়েছে। কারণ, কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে রাজ্য বিজেপির প্রথম সারির নেতাদেরও ওই দু’দিন কোথাও না কোথাও হাজির থাকতে হবে। কাকে, কোন দিন, কোথায়, কোন কেন্দ্রীয় নেতার সঙ্গে থাকতে হবে, সে বিষয়ে রাজ্যের প্রথম সারির নেতাদের কাছে নির্দেশ পৌঁছে গিয়েছে।
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মাস ছ’য়েক আগে থেকে পশ্চিমবঙ্গ দেখেছিল বিজেপি আয়োজিত ‘যোগদান মেলা’। জেলায় জেলায় সে সব ‘মেলা’ আয়োজন করে অন্য দলের নেতাকর্মীদের অনর্গল শামিল করা হচ্ছিল বিজেপিতে। তাতে বিজেপির রাজনৈতিক লাভ যে তেমন হয়নি, সে কথা ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পরে বিজেপি নেতৃত্ব বুঝতে পেরেছিলেন। তাই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তেমন কোনও কর্মসূচির ধার দিয়েও যাচ্ছে না বিজেপি। কিন্তু ‘পরিবর্তন যাত্রা’-র উদ্বোধন ঘিরে যে বন্দোবস্ত হচ্ছে, তাতে অন্য রকম এক ‘মেলা’র সাক্ষী হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ।