রাজ্যে এখন যে সব জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চালু রয়েছে, তা কোনও ভাবেই বন্ধ হবে না। তবে সে সব সরকারি প্রকল্পের সুবিধা যাতে সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির কাছে পৌঁছোয়, নতুন সরকার সে বিষয়টা নিশ্চিত করবে। সোমবার বাজেট পেশ করার সময় এমন ঘোষণাই করল শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। বিজেপি সরকার এ-ও স্পষ্ট করল যে, সমাজের দুর্বল শ্রেণি যাতে প্রকল্পের সমস্ত রকম সুবিধা পায়, সে জন্য সেগুলির প্রয়োজনীয় পরিবর্তনও ঘটানো হবে। আর তা থেকেই এক প্রকার স্পষ্ট যে, রাজ্য সরকারের প্রকল্পগুলির সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এ বার থাকবে নতুন মাপকাঠি। প্রায় সব প্রকল্পের ক্ষেত্রেই জুড়েছে কিছু শর্ত।
অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা পাবেন রাজ্যের বাসিন্দা ‘যোগ্য’ মহিলারা। যোগ্য কারা, তা প্রকল্পের বিজ্ঞপ্তি ঘোষণার সময়েই স্পষ্ট করেছিল বিজেপি সরকার। শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্যও প্রতি মাসে বিশেষ সুবিধার কথা সোমবার বাজেটে ঘোষণা করেছে শুভেন্দুর সরকার। স্নাতক করা বেকার যুবকেরা অক্টোবর থেকে মাসে মাসে ৩,০০০ টাকা করে পাবেন। তবে সকলে নয়। জনজাতিদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেওয়া হবে চাল, ডাল, নুন, তেল। তবে বায়োমেট্রিক দিয়ে তবে তা গ্রহণ করতে হবে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর কথায়, ‘‘মাঝপথে যাতে খাবারের জিনিসপত্র হাপিস না হয়ে যায়, সে জন্যই এই ব্যবস্থা।’’
বাজেট পড়ার সময় অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত বলেন, ‘‘রাজ্যে বর্তমানে চালু সকল সামাজিক প্রকল্প অব্যাহত থাকবে। আমরা মানবসম্পদ উন্নয়নে গভীর ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। কিন্তু সরকারি প্রকল্পগুলির সুবিধা সমাজের সবচেয়ে দুর্বল শ্রেণির কাছে পৌঁছে দেওয়া সুনিশ্চিত করতে এই প্রকল্পগুলির প্রয়োজনীয় পরিবর্তন ঘটানো হবে।’’ অর্থমন্ত্রী এ-ও জানান, সরকারি প্রতিষ্ঠাগুলিকে ‘দুর্নাম’ পর্যুদস্ত করেছিল। তা বিবেচনা করেই এই সরকার স্বচ্ছতার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
প্রসঙ্গত, পূর্বতন তৃণমূল সরকারের আমলে ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’-সহ বিভিন্ন প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। সেই আবহেই নতুন সরকার নিজেদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেটে স্পষ্ট করেছে, সরকারের উপরে জনগণের আস্থা ফেরাতে সব রকম পদক্ষেপ করা হবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘অনেক দুর্নীতি হয়েছে। বিধবাভাতা পেয়েছে পুরুষেরা। লক্ষ্মীর ভান্ডারও পেয়েছেন তাঁরা। এ ভাবে সরকারি টাকা দেওয়া যায় না। একটা দল ৩৪ বছরে পার্টির ক্যাডারদের চাকরি দিয়েছে। অন্যেরা ১৫ বছরে সাদা খাতায় চাকরি দিয়েছে।’’ তাঁর সরকার যে তা করবে না, তা স্পষ্ট করে দিয়েছেন শুভেন্দু। বুঝিয়ে দিয়েছেন, এ বার থেকে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাওয়ার জন্য থাকবে নতুন মাপকাঠি।
বেকার ভাতা
বাজেট অনুসারে, রাজ্যের বাসিন্দা, ২১ থেকে ৪৫ বছর বয়সি শিক্ষিত বেকার যুবকদের জন্য অক্টোবর থেকে চালু হবে ‘ভরসা কর্মসূচি’। যে যুবকেরা স্নাতক করেছেন, তাঁরা পাবেন মাসে ৩,০০০ টাকা। অন্যদের মাসে ২,০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হবে। যে বেকার যুবকদের পরিবার অন্য সামাজিক প্রকল্পের সুবিধা পাচ্ছে না, যাঁদের পরিবারের মাসিক আয় ১ লক্ষ টাকার কম, কেবল তাঁদেরই দেওয়া হবে এই ভাতা।
অন্নপূর্ণা যোজনা
বাজেটে বলা হয়েছে, নারীর ক্ষমতায়নে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সি যোগ্য মহিলাদের মাসে ৩,০০০ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। এই আর্থিক সহায়তা উপভোক্তার আধারযুক্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানো হবে। এই প্রকল্পে চলতি বাজেটে ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। শুভেন্দু জানান, চলতি মাসে যোজনার সুবিধা ২৮ লক্ষ মহিলা পেয়েছেন। ১ জুলাই ১ কোটি ৫ লক্ষ মহিলার অ্যাকাউন্টে টাকা পৌঁছে যাবে।
পড়ুয়াদের জন্য
বাজেটে জানানো হয়েছে, সরকারি এবং সরকার পোষিত কলেজের যে পড়ুয়ারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের এককালীন ৩০ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হবে। এ জন্য বাজেটে ৩০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে।
যে সব ছাত্রছাত্রী বিশ্বের সেরা ১০০টি (কিউএস ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাঙ্কিং অনুসারে) বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবেন, তাঁদের সম্পূর্ণ টিউশন ফি এবং স্বাস্থ্য বিমার খরচ বহনের জন্য ‘স্বামী বিবেকানন্দ স্কলারশিপ’-এর প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে। জাতীয় স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তরে যে সব ছাত্রছাত্রী ভর্তি হবেন, তাঁদের টিউশন ফির জন্য আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে বাজেটে।
মহিলাদের জন্য
কলেজেছুট হওয়ার প্রবণতা আটকাতে সরকারি, সরকার পোষিত কলেজে অবিবাহিত ছাত্রীদের এককালীন ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হবে। কেন্দ্রীয় সরকার ‘প্রধানমন্ত্রী মাত্রুবন্দনা যোজনা’ চালু করেছে। তার সুবিধা এ বার পাবেন এ রাজ্যের মায়েরাও। গর্ভবতী এবং স্তন্যদানকারী মায়েদের মজুরির ক্ষতিপূরণ, উন্নত স্বাস্থ্য পরিষেবার জন্য এককালীন ২১ হাজার টাকা দেওয়া হবে। গর্ভবতী মায়েরা ছ’টি স্বাস্থ্য কিট পাবেন। ১ জুন থেকে মহিলারা সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াতের সুযোগ পাচ্ছেন। এই খাতে ৫৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, পিঙ্ক কার্ড শীঘ্র চালু হবে, যাতে প্রকৃতরাই সুবিধা পান।
জনজাতিদের জন্য
মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, জনজাতিদের জন্য ভাইব্র্যান্ট ভিলেজ, একলব্য স্কুল, আদিবাসী বিশ্ববিদ্যালয় চালু করা হবে। লোধা, শবরদের প্রতি সপ্তাহে খাবারের প্যাকেট পৌঁছে দেওয়া হবে। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, লবণ, আলু, চিনি প্রতি সপ্তাহে জনজাতিদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। খাবারদাবার যাতে মাঝরাস্তায় ‘হাপিস’ না করা হয়, তাই বায়োমেট্রিক চালু হচ্ছে। খাবার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ছবি, ভিডিয়ো পাঠাতে হবে সরকারকে। বাজেটে বলা হয়েছে, চলতি অর্থবছরে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় করে ১,৫০০ থেকে ২,০০০টি গ্রামকে প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত করা যাবে বলে আশা। প্রধানমন্ত্রী অনুসূচিত জাতি অভ্যুদয় যোজনার অধীনে তফসিলি অধ্যুষিত গ্রামগুলিকে ‘আদর্শ গ্রাম’ গড়ে তোলা হবে।
রোগীদের জন্য
শুভেন্দু জানিয়েছেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীদের তিন বেলার খাবারের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫৬ টাকা। এ বার তা বৃদ্ধি করে রোগী পিছু বরাদ্দ ১১০ টাকা করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, হাসপাতালে রোগীরা যাতে পুষ্টিকর খাবার পান। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘সরকারি হাসপাতালে গরিব মানুষ চিকিৎসার জন্য যান। পিজি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। ডাক্তারেরা বলছেন, দুপুরেও কুমড়োর তরকারি দেওয়া হয়, রাতেও কুমড়ো। ঠিকাদারেরা কী করবেন, বরাদ্দ মাত্র ৫৬ টাকা। আমি জিজ্ঞাসা করি, কত বরাদ্দ করলে ঠিকঠাক হবে? চিকিৎসকেরা বলেন, রোগী পিছু ১০৪ টাকা করলে হবে। আমি স্বপনদাকে বললাম, ১১০ টাকা করুন বরাদ্দ।’’
সাংবাদিকদের ভাতা
বাজেট জানানো হয়েছে, সাংবাদিকেরা অবসরের পরে ভাতা পাবেন। শুভেন্দু জানান, পূর্বতন সরকারের আমলে ১৫৬ জন সেই ভাতা পেতেন। বর্তমান সরকারের আমলে প্রামাণ্য নথি দিয়ে আবেদন করতে হবে। শুভেন্দুর কথায়, ‘‘চিঠি দেবেন। ৫,০০০ টাকা করে পেনশন পাবেন।’’ জরুরি অবস্থার সময়ে যে সাংবাদিকেরা জেলে গিয়েছিলেন, তাঁরা ১০,০০০ টাকা সাম্মানিক পাবেন। চালু হবে সংগ্রামী ভাতা। যে বিজেপি কর্মীদের বিগত সরকারের ত্রুটি উল্লেখের জন্য জেল পাঠানো হয়েছে, তাঁদের ভাতা দেওয়া হবে। গাইডলাইন প্রকাশ করা হবে।
আরও পড়ুন:
-
‘বিরোধীদের কিছু আর বলার রয়েছে বলে মনে হয় না’! বাজেট নিয়ে উচ্ছ্বসিত শুভেন্দু, উল্লেখ করলেন সরকারি দিশার
-
সরকারি চাকরিতে এক লক্ষ শূন্যপদে নিয়োগ হবে, অর্ধেক শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই! ৩৩% মহিলা সংরক্ষণ, ঘোষণা স্বপনের
-
নতুন পাঁচটি জেলা! কলকাতার কাছে আরও একটি বিমানবন্দর! ব্যবসাকে সিন্ডিকেট-মুক্ত করতে নতুন আইন, ঘোষণা স্বপনের
অন্যান্য সুবিধা
পশ্চিমবঙ্গের প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার সম্প্রসারণের জন্য চলতি বছরে ১৩ হাজার কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। চলতি অর্থবর্ষে ২৫ লক্ষ নতুন উপভোক্তা সুযোগ পেতে চলেছেন।
কলকাতা শহরে ৪০০টি মা আধার কেন্দ্র হবে। সেখানে পাঁচ টাকার বিনিময়ে ডিম, মাছ, সব্জি, ভাত মিলবে। ভবিষ্যতে আরও ২১০টি কেন্দ্র চালু করা হবে।
বয়স্ক, বিধবা, বিশেষ ভাবে সক্ষমদের মাসিক পেনশন ৫০০ টাকা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
২৪ ঘণ্টা জনসাধারণের নিরাপত্তা সুরক্ষার জন্য ‘ডায়াল ১১২’ হেল্পলাইন চালু করা হবে রাজ্যে। নাগরিকদের জরুরি আবেদনে সাড়া দিতে প্রতিটি থানায় একটি করে গাড়ি নির্দিষ্ট থাকবে। ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে।
প্রাথমিক স্কুলে মিড ডে মিলে পড়ুয়া প্রতি বরাদ্দ ১০ টাকা করা হচ্ছে। আগে ছিল ৬.৭৮ টাকা। ইসকনের সহযোগিতায় কলকাতা পুরসভা এলাকায় স্কুলে পুষ্টিকর রান্না করে মিড ডে মিল দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
আয়ুষ্মান প্রকল্পের জন্য ৩,১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। আশা কর্মী, ৭০ বছরের বেশি বয়সি প্রায় ৭ কোটি মানুষ ওই প্রকল্পের আওতায় আসবেন। যাঁরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না, তাদের সিএম রিলিফ ফান্ড থেকে সাহায্য করা হবে।
উত্তরবঙ্গে হবে এমস। সুন্দরবন, পুরুলিয়া, দার্জিলিঙে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল হবে। প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় জনৌষধি পরিযোজনা চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজ্য সরকার।