মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই দেশপ্রিয় পার্কে ঢুকলেন তিনি। শহিদদের স্মৃতিসৌধে সম্মানও জানালেন। তার পরে মমতার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ভাষা দিবসের মঞ্চে উঠলেন রাজ্যসভার বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ। তাঁর আসনও ছিল মমতার ঠিক ডান পাশেই। ওই মঞ্চেই অনন্তকে বঙ্গবিভূষণে সম্মানিত করলেন মমতা। রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিজেপির সাংসদের প্রচেষ্টার কারণেই তাঁকে সম্মানিত করল রাজ্য সরকার। রাজনীতির কারবারিদের মতে, বিধানসভা নির্বাচনের মুখে এই ঘটনা বিড়ম্বনায় ফেলেছে পদ্মশিবিরকে।
প্রতি বছরেই ২১ ফেব্রুয়ারি রাজ্য সরকারের তরফে ভাষা দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। সেই অনুষ্ঠানে সমাজের নানা ক্ষেত্রে অবদানের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে বঙ্গবিভূষণ এবং বঙ্গভূষণ সম্মান দেয় রাজ্য সরকার। এ বারের তালিকা দীর্ঘ ছিল। তবে সেই তালিকায় থাকা প্রথম নামটিই ছিল কোচবিহারের অনন্ত মহারাজের! রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য তাঁর কাজকর্ম এবং অবদানকে সম্মান জানাতেই রাজ্য সরকার তাঁকে বঙ্গবিভূষণ দিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। মমতা তাঁকে উত্তরীয় পরিয়ে হাতে বঙ্গবিভূষণ সম্মান তুলে দেন।
অনুষ্ঠানে বেশি ক্ষণ থাকেননি অনন্ত। সম্মান প্রদানের পালা শেষ হতেই মমতা জানান, বিমান ধরার তাড়া থাকায় অনুষ্ঠানে থাকতে পারছেন না অনন্ত মহারাজ। তাঁর অন্য কাজও আছে। রাজ্য সরকারের আমন্ত্রণে তিনি এসেছেন, তার জন্য অনন্তকে কৃতজ্ঞতা জানান মমতা। এর পরে তাঁকে কিছু বলার জন্য অনুরোধ করেন মুখ্যমন্ত্রী। মমতাকে ধন্যবাদ দিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করেন অনন্ত মহারাজ। রাজবংশী ভাষায় একটি কবিতাও বলেন তিনি। তার পরেই মঞ্চ ছাড়েন।
আরও পড়ুন:
অনুষ্ঠানে বেশি কিছু না-বললেও পরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভপ্রকাশ করেন অনন্ত। তিনি জানান, ১৯৪৭ সালে ‘ডোমিনাল’ সরকারের সঙ্গে মিলে ভারতের অংশ হয়েছিলেন তাঁরা। অর্থাৎ রাজবংশীরা। অনন্তের অভিযোগ, সেই থেকে এখনও পর্যন্ত বঞ্চনা, লাঞ্চনা, তিরস্কারের শিকার হয়েছেন তাঁরা। এখনও বঞ্চনা রয়ে গিয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘বিজেপি সাংসদ হলে কী হবে? আমাদের জন্য তো কিছু করেনি।’’
সামনেই বিধানসভা নির্বাচন। সেই ভোটে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘কোমর বেঁধে’ লড়াইয়ে নেমেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজ্যে এসে ‘তৃণমূল হটাও’ স্লোগানে শান দিচ্ছেন। বিধানসভা ভোট জিতে সরকার গড়ার চেষ্টায় যখন বিজেপি, তখন তাদেরই সাংসদ মমতার মঞ্চে! অনেকের মতে, অনন্ত মহরাজের এই পদক্ষেপ বিজেপির অন্দরেই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। কেউ কেউ আবার দলবদলের জল্পনায় শান দিচ্ছেন। তবে রাজ্য বিজেপি নেতৃত্ব এই বিষয়টিকে ‘গুরুত্ব’ দিতে নারাজ।
অনন্ত মহারাজের বিষয়ে বিজেপির প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার বলেছেন, ‘‘রাজ্য সরকার বঙ্গবিভূষণ দিয়েছে, উনি নিয়েছেন।’’ আর রাজ্য বিজেপির বর্তমান সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, ‘‘ভালই তো।’’ তার পরেই তিনি বলেন, ‘‘রাজ্যসভায় উনি (অনন্ত মহারাজ) আমার সহকর্মী। সম্মান পেয়েছেন, ভালই তো। আমার ভীষণ ভাল লাগছে। আমার সহকর্মী যে সম্মানই পান আমার ভাল লাগে।’’
অতীতেও মমতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে দেখা গিয়েছে অনন্তকে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর জুন মাসে উত্তরবঙ্গে গিয়েছিলেন মমতা। সেই সফরের ফাঁকেই অনন্তের ‘প্রাসাদে’ হাজির হয়েছিলেন তিনি। কিছু ক্ষণ কথা হয় তাঁদের মধ্যে। ওই সাক্ষাতকে সেই সময় অনেকেই কোচবিহার জেলার রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত হিসাবে দেখতে শুরু করেছিলেন। অনেকে এ-ও বলতে শুরু করেন, বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দেবেন অনন্ত। তবে সেই জল্পনা সত্যি হয়নি। সেই সাক্ষাতের পর শনিবার আবার মমতা-অনন্তকে একসঙ্গে দেখা গেল।
প্রসঙ্গত, গত বৃহস্পতিবার কার্শিয়াঙের বিধায়ক বিষ্ণুপ্রসাদ শর্মা বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলে যোগ দিয়েছিলেন। যদিও সেই দলবদলকে আমল দিতে চায়নি বিজেপি। তার পরেই শনিবার মমতার মঞ্চে অনন্ত!