রাজ্যের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাই প্রয়োজন জন্ম নিয়ন্ত্রণ। এই বিষয়ে পদক্ষেপ করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে আবেদন জানালেন রাজ্যসভার সাংসদ তথা বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তাঁর এই মন্তব্যের সূত্রে জল্পনা তৈরি হয়েছে, রাজ্যে কি এ বার জন্ম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে পদক্ষেপ করতে পারে সরকার!
বিধাননগর মহকুমা হাসপাতাল থেকে শনিবার জরায়ুমুখের কর্কট রোগের টিকা প্রদান কর্মসূচির সূচনা অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন শমীক। সেখানে উপস্থিত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রীও। সেখানেই শমীক বলেছেন, ‘‘সুস্থ, সুশৃঙ্খল সমাজ গঠনের স্বার্থে পরিবার পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। প্রয়োজনে ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্প তৈরি করে সরকারি প্রচারের মাধ্যমে জন্মনিয়ন্ত্রণের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে আবেদন জানাচ্ছি।’’ শমীক জানান, একটা সময় ছিল, যখন পোলিয়ো প্রতিষেধক দিতে গিয়ে বাধা পেতে হত। একই সঙ্গে তিনি ১৯৯০ সালের ৩০ মে বানতলায় একটি বন্ধ্যাত্বকরণ শিবির করাতে গিয়ে চিকিৎসক অনিতা দেওয়ানের ধর্ষণ ও খুনের প্রসঙ্গও তুলে ধরেন।
শমীক বলেছেন, ‘‘বিভিন্ন ধর্মান্ধ প্রচারের কারণে বিভিন্ন রোগকে আমরা সমাজ থেকে নির্মূল করতে পারিনি।’’ একই সঙ্গে তাঁর দাবি, অন্তত এই টিকাকরণের ক্ষেত্রে যাঁরা সমাজ সচেতক আছেন, যাঁদের সঙ্গে রাজনীতি বা সরকারের কোনও সম্পর্ক নেই, তাঁরা তাঁদের পরিবারে মেয়েরা ও সমাজের সর্ব সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে অংশগ্রহণ করেন, তার জন্য সচেষ্ট হবেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতির আরও বক্তব্য, ‘‘সরকার নতুন তৈরি হয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যেই হয়তো স্বাস্থ্যমন্ত্রী শপথ নেবেন। সেটা অবশ্য সরকারের বিষয়। কিন্তু আমি অত্যন্ত আশাবাদী, রাজ্যের ক্রমবর্ধমান যে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, তা নিয়ন্ত্রণে মুখ্যমন্ত্রী চেষ্টা করবেন।’’ তাঁর মতে, জমির উপরে মানুষের চাপ কমাতে হবে। পরিবার পরিকল্পনা করে মহিলাদের বিকাশ ঘটাতে এবং শিক্ষা ও আর্থ-সামাজিক বিকাশের দিকটিও মাথায় রাখতে হবে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে প্রতি মহিলা পিছু সন্তানের হার বা ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ মাত্র ১.৬। জনসংখ্যা একই জায়গায় ধরে রাখতে, জনসংখ্যায় নবীনদের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যা যাতে বেড়ে না-যায়, তা দেখতে এবং কর্মক্ষম তরুণদের জোগান অব্যাহত রাখতে প্রতি মহিলা পিছু সন্তানের হার বা ‘রিপ্লেসমেন্ট রেট’ ২.১ হওয়া উচিত। কেন্দ্রীয় সরকার শুক্রবারই ষষ্ঠ জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষার রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে দেখা যাচ্ছে, গোটা দেশে ২০২৩-২৪-এ প্রতি মহিলা পিছু সন্তানের হার ছিল ২.০। এর আগে ২০১৯-২১-এর পঞ্চম জাতীয় পরিবার স্বাস্থ্য সমীক্ষাতেও এই হার ২.০ ছিল। পশ্চিমবঙ্গে প্রতি মহিলা পিছু সন্তানের হার আরও কম, মাত্র ১.৬। গ্রামে ১.৭, শহরে মাত্র ১.৩। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যার মাত্রা বজায় এবং নবীনদের তুলনায় প্রবীণদের সংখ্যার ভারসাম্য রাখতে মহিলা পিছু সন্তানের হার যা হওয়া উচিত, গোটা দেশ ও পশ্চিমবঙ্গে এখনই সেই হার তার থেকে যথেষ্ট কম।
এই প্রেক্ষিতেই বিজেপির রাজ্য সভাপতির মন্তব্যে অন্য রকম ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছে বিরোধীরা। বর্ষীয়ান কংগ্রেস নেতা আব্দুল মান্নানের মতে, ‘‘সঞ্জয় গান্ধী যখন প্রথম জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলেছিলেন, তখন সর্বাত্মক বিরোধিতা হয়েছিল। বিজেপির পূর্বসূরি জনসঙ্ঘও বিরোধিতা করেছিল। কিন্তু তার পর থেকে ধারাবাহিক ভাবে দেশের সব সরকারই জন্ম নিয়ন্ত্রণের নীতি মেনে চলেছে। দুই সন্তানের বেশি থাকলে সরকারি স্তরে সুযোগ-সুবিধা না-দেওয়ার নীতিও আছে। এখন এই দেশে ও রাজ্যে জন্মের হার যেখানে অস্বাভাবিক নয়, তখন জন্ম নিয়ন্ত্রণের কথা বলার অর্থ কী? তার মানে কি বিশেষ কোনও উদ্দেশ্য আছে?’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তীরও বক্তব্য, ‘‘জরায়ুমুখের কর্কট রোগের টিকাকরণের সঙ্গে জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রসঙ্গ চলে এল! পশ্চিমবঙ্গে জন্মের হার তো নিয়ন্ত্রণের জায়গায় নেই। বরং, বিজেপি-শাসিত কিছু জায়গায় তার দরকার থাকতে পারে, সে ব্যাপারে শমীক তাঁর দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। এই রাজ্যে হঠাৎ এই প্রস্তাব দেওয়ার পিছনে অন্য কোনও উদ্দেশ্য আছে কি না, সেই প্রশ্ন স্বাভাবিক।’’
যদিও জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা, শিক্ষা ও প্রশাসনিক উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে রাজ্যের সামগ্রিক উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে বলে দাবি শমীকের। তাঁর কথায়, ‘‘পরিবার পরিকল্পনা ও জন্মনিয়ন্ত্রণের মধ্যে দিয়ে আমাদের মহিলাদের আরও সুষম বিকাশ ঘটাতে পারি কি না, শিক্ষায়, আর্থ-সামাজিক উত্তরণের অবস্থায় পৌঁছে দিতে পারি কি না, তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধান্ত নেবেন।’’ তবে ‘সার্ভিস ডক্টরস ফোরামে’র সাধারণ সম্পাদক, চিকিৎসক সজল বিশ্বাস বলছেন, ‘‘জরুরি অবস্থার সময়ে যে ভাবে ‘নাসবন্দি’কে বাধ্যতামূলক এবং জোরপূর্বক করা হয়েছিল, তা যেন না হয়। বরং, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিজ্ঞানসম্মত ভাবে দেখতে হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)