বিজেপির রাজ্য সভাপতি পদে বসার পরে ছ’মাস ধরে নতুন কমিটি ঘোষণা করেননি শমীক ভট্টাচার্য। কিন্তু ঘোষণার পরে বেশি ক্ষোভ-বিক্ষোভের অবকাশ রাখেননি। আদি-নব্য অনুপাত হোক বা দলের বিভিন্ন অংশের পছন্দ-অপছন্দ, ভারসাম্য রেখেই ঘোষিত হয়েছিল শমীকের কমিটি। দলের যুব সংগঠনের নতুন রাজ্য কমিটি ঘোষিত হওয়ার পরে পরিস্থিতি ঠিক বিপরীত। সামনে ভোট। তাই প্রকাশ্য বিক্ষোভ থেকে অনেকে নিজেদের সংযত রেখেছেন। কিন্তু যুবমোর্চার রাজ্য সভাপতি ইন্দ্রনীল খাঁয়ের বিরুদ্ধে দলের অন্দরে ইতিমধ্যেই খড়্গহস্ত অনেকে। এমনকি, নতুন কমিটিতে ইন্দ্রনীল যাঁদের রেখেছেন, তাঁদের মধ্যেও অনেকে অসন্তুষ্ট।
দক্ষিণ কলকাতা বরাবর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে মজবুত ‘গড়’। ২০০৪ সালে তৃণমূলের চরম দুর্দিনে দল সর্বত্র হেরে গেলেও দক্ষিণ কলকাতায় মমতা জিতেছিলেন। ফলে ২০১১ সালে অভূতপূর্ব ফলাফল করে তৃণমূল রাজ্য বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে প্রথম যে মন্ত্রিসভা গঠিত হল, তাতে দক্ষিণ কলকাতার সাত বিধায়কের সাতজনকেই মমতা মন্ত্রী করেছিলেন। না লোকসভা নির্বাচন, না বিধানসভা, কখনও দক্ষিণ কলকাতা বিজেপি-কে সাফল্যের স্বাদ পেতে দেয়নি। কিন্তু সেই সাংগঠনিক জেলা থেকেই সবচেয়ে বেশি সদস্য ইন্দ্রনীলের নতুন রাজ্য কমিটিতে। আর যে সাংগঠনিক বিভাগ থেকে তিন-তিনজন সাংসদ বা যে এলাকা থেকে সর্বাধিক ভোটে জয়, সেখান থেকে যুবমোর্চার রাজ্য কমিটিতে কেউ নেই। অনেকেই বিস্মিত যুবমোর্চার নতুন এই কমিটি দেখে! ক্ষুব্ধও।
যুবমোর্চার রাজ্য সভাপতি ইন্দ্রনীল নিজে দক্ষিণ কলকাতা লোকসভা কেন্দ্র তথা সাংগঠনিক জেলার বাসিন্দা। বিজেপির একাংশের দাবি, তিনি বেহালার একটি আসন থেকে বিধানসভা নির্বাচনে লড়তে চাইছেন। নিজের নির্বাচন উতরে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যথেষ্ট লোকলস্কর ইন্দ্রনীল এখন থেকে তৈরি রাখতে চাইছেন বলে যুবমোর্চার একাংশের দাবি। সেই কারণেই দক্ষিণ কলকাতা এবং যাদবপুর সাংগঠনিক জেলা থেকে সাত জনকে তিনি রাজ্য কমিটিতে নিয়ে নিয়েছেন বলে সংগঠনের ওই অংশ মনে করছে।
ইন্দ্রনীল ছাড়াও দক্ষিণ কলকাতা থেকে রাজ্য কমিটিতে রয়েছেন মুকুন্দ ঝা, শুভঙ্কর চট্টোপাধ্যায়, তমসা চট্টোপাধ্যায়। তিন জনেই রাজ্য সম্পাদক। সমাজমাধ্যম ইনচার্জ বিবেক শর্মাও দক্ষিণ কলকাতা থেকেই। লাগোয়া যাদবপুর সাংগঠনিক জেলা থেকে অঙ্কিত দেব এবং অরুণ শাহকে রাজ্য কমিটিতে রাখা হয়েছে। ইন্দ্রনীলের ‘ঘনিষ্ঠ’ বৃত্তে অঙ্কিত পরিচিত মুখ। ভৌগোলিক ভাবে তিনি যাদবপুর সাংগঠনিক জেলার হলেও বেশির ভাগ সময় কাটান দক্ষিণ কলকাতাতেই। তাঁকে রাজ্য সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে। যাদবপুরেরই আর এক যুবনেতা অরুণ শাহকে করা হয়েছে রাজ্য সহ-সভাপতি। এত দিন তিনি ওই পদেই ছিলেন।
শুধু দক্ষিণ কলকাতা অবশ্য নয়, আরও একটি জেলার ‘দাপট’ দেখা যাচ্ছে যুবমোর্চার নতুন রাজ্য কমিটিতে। যে জেলায় বিজেপি কোনও বিধানসভা আসন বা লোকসভা আসনে কখনও জেতেনি। সেটি হল হাওড়া। শহর ও গ্রামীণ মিলিয়ে হাওড়ায় বিজেপির দু’টি সাংগঠনিক জেলা। দুই হাওড়া থেকে মোট চার জন রাজ্য কমিটিতে জায়গা পেয়েছেন। অমিত সামন্ত এবং প্রিয়ঙ্কা শর্মা সহ-সভাপতি হয়েছেন। অভিমন্যু বর্মা এবং সুপ্রাণ বর্মণ যথাক্রমে আইটি ইনচার্জ এবং মিডিয়া ইনচার্জ হয়েছেন।
পাশের জেলা হুগলি থেকে সুরঞ্জন সরকার এবং অপূর্ব দত্ত নামে দু’জন জায়গা পেয়েছেন রাজ্য কমিটিতে। কিন্তু তাঁদের দু’জনের কেউই আরামবাগ লোকসভা কেন্দ্র থেকে নন, গোটা হুগলির মধ্যে যে আরামবাগে বিজেপি এই মুহূর্তে সবচেয়ে শক্তিশালী।
রাজ্য কমিটিতে উত্তরবঙ্গের প্রতিনিধিত্ব খুঁজতে গেলে নেতা-কর্মীরা আরও বিস্মিত হচ্ছেন। বিজেপির মালদহ সাংগঠনিক বিভাগে চারটি লোকসভা কেন্দ্র— দক্ষিণ মালদহ, উত্তর মালদহ, বালুরঘাট এবং রায়গঞ্জ। এর মধ্যে তিনটিতেই বিজেপি লাগাতার দু’বার জয়ী। কিন্তু গোটা এলাকা থেকে একজনও যুবমোর্চার রাজ্য কমিটিতে স্থান পাননি। গত লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে জিতেছিল দার্জিলিং আসনে। সেখান থেকে কেউ রাজ্য কমিটিতে জায়গা পাননি। লাগাতার দু’বার বিজেপির পক্ষে থাকা আলিপুরদুয়ার লোকসভা আসন থেকেও কারও ঠাঁই হয়নি যুবমোর্চার রাজ্য কমিটিতে।
মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব বর্ধমান, দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম জেলা পুরোপুরি ব্রাত্য। যুবমোর্চার প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি তথা বর্তমানে বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক পদে থাকা সৌমিত্র খাঁয়ের ‘খাসতালুক’ বিষ্ণুপুর থেকেও কেউ জায়গা পাননি রাজ্য কমিটিতে।
ইন্দ্রনীলের নতুন কমিটির এই সদস্য-বিন্যাসকে অনেকে ‘বিস্ময়কর’ আখ্যা দিচ্ছেন বিজেপি-তে এবং যুবমোর্চায়। নির্বাচনের মুখে প্রকাশ্যে কেউ তোপ দাগেননি নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। তবে বাঁকুড়া, পশ্চিম বর্ধমান, পূর্ব বর্ধমানের বেশ কিছু লড়াকু তরুণ মুখ কেন রাজ্য কমিটিতে স্থান পেলেন না, সে প্রশ্ন নতুন কমিটির একাধিক সদস্য তুলছেন। যে দক্ষিণ কলকাতা আর যাদবপুর বিজেপি-কে বার বার খালি হাতে ফেরায়, রাজ্য কমিটিতে কেন সেখানকারই রমরমা, তা নিয়ে আরও বড় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হচ্ছে।
এ নিয়ে বিশদে মুখ খুলতে চাননি ইন্দ্রনীল নিজে। তাঁর সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, ‘‘কোনও মন্তব্য করব না।’’