E-Paper

জেরবার উদ্ভট ম্যাপিং জটে, দাবি কমিশনের

এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রকাশিত তথ্য বলছে, কারও সন্তানের সংখ্যা তিনশোর বেশি, কারও শতাধিক। কারও বা ১৯-২০ জন! বিচিত্র এই সব তথ্য ধরা পড়ায় জারি হচ্ছে শুনানির নোটিস।

চন্দ্রপ্রভ ভট্টাচার্য

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৩

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

‘এত সন্তানের কথা তো জানা ছিল না!’ গত কয়েক দিনে অনেকটা এই ধাঁচে পর পর ফোনে নাজেহাল হওয়ার কথা বলছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের (সিইও) দফতর। শুনানিতে লাখো লোককে ডাকাডাকির নেপথ্যে বিভিন্ন ব্যক্তির সন্তান সংখ্যা বা পিতৃপরিচয় সংক্রান্ত তথ্যে বিচিত্র গরমিল উঠে আসার কারণ কমিশন সূত্রে মেলে ধরা হচ্ছে। তবে বাস্তবে এমন ফোনের সংখ্যা কতগুলি, তা এখনও পুরোটা স্পষ্ট হয়নি।

এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রকাশিত তথ্য বলছে, কারও সন্তানের সংখ্যা তিনশোর বেশি, কারও শতাধিক। কারও বা ১৯-২০ জন! বিচিত্র এই সব তথ্য ধরা পড়ায় জারি হচ্ছে শুনানির নোটিস। আর তা হাতে পেয়েই সংশ্লিষ্টদের একাংশ বিএলও, ইআরও, এইআরও এমনকি সিইও দফতরেও যোগাযোগ করছেন।

কমিশনের এক কর্তার মোবাইলে একটি ওয়টসঅ্যাপ-বার্তা প্রথম ঢোকে দিন কয়েক আগে। তাতে এক ব্যক্তি সবিনয় জানিয়েছেন, তাঁর মায়ের তিন সন্তান। অথচ যুক্তিগ্রাহ্য গরমিলের (লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি) আওতায় নোটিস পাওয়ার পরে দেখা যাচ্ছে, মায়ের সন্তান-সংখ্যা ছয়ের বেশি! এই মোবাইল বার্তাটি পাঠানো হয়, কমিশনের যথাযথ বিভাগে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের কাছে। খতিয়ে দেখা যায়, ওই মহিলা ভোটারের নাম-তথ্য ব্যবহার করেছেন আরও অন্তত তিন জন। একই ভাবে বহু সন্তানের বাবার তথ্য খতিয়েও দেখা যায়, একাধিক জেলা থেকে তাঁর ‘সন্তানের’ উদয় হয়েছে।

কমিশনের পর্যবেক্ষকেরা কেউ জেলার ডিভিশনে, কেউ রাজ্য স্তরে পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। প্রত্যেকের মতামত এবং অভিজ্ঞতা শুনে কমিশনের পর্যবেক্ষণ, হয় অসাধু মতলবে উদ্ভট ‘ম্যাপিং’ করা হয়েছে, নয়তো ভোটারের তথ্য নথিবদ্ধ করতে গিয়ে গোলমাল হয়েছে। তবে প্রথমটির সম্ভাবনা এ ক্ষেত্রে তুলনায় বেশি বলে কমিশনের সূত্র মারফত দাবি করা হচ্ছে। জেলার এক কর্তার কথায়, ‘‘এক জনের সন্তান ১৯ জন। তাঁকে এবং তাঁর সন্তানদের নোটিস দেওয়া হয়েছিল। দেখা গিয়েছে, পিতার সব নথি থাকলেও, বাবার নামের ম্যাপিং ছাড়া সন্তানদের কাছে আর কিছুই দেখানোর মতো নেই। এমনকি, পিতার সঙ্গে সন্তানদের বয়সের ফারাকও ১০-১৫ বছরের মধ্যে। ওই ১৯ জনের আবেদন গ্রহণ করা যায়নি। কমিশনকে সেই তথ্য পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’’

কমিশনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, এ রাজ্যে আগেও ভুয়ো পিতৃপরিচয় দিয়ে ভোটার কার্ড তৈরি করানোর তথ্য মিলেছিল। মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলাদেশি জঙ্গির গ্রেফতারির পরে গোয়েন্দা তদন্তে উঠে আসে— সে প্রহরা এড়িয়ে সীমান্ত পেরিয়ে ঢুকে কেন্দ্রীয় সরকারি দফতর মারফত আধার কার্ড করায় এবং পরে বিভিন্ন বিধানসভা এলাকায় সাজানো পিতৃপরিচয় দিয়ে একাধিক ভোটার কার্ড বানিয়ে নেয়। এই সব কারণেই ‘লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি’-তে ছয়ের বেশি সন্তান, বাবা-ঠাকুরদার সঙ্গে ছেলে বা নাতির বয়সের ব্যবধান ইত্যাদি বিবেচনায় আনা হচ্ছে বলে কমিশনের সূত্রের যুক্তি। তবে এই কার্যকলাপকে মাথায় রেখে রাজ্যে হাজারো হিন্দু, মুসলিম, জনজাতি, রাজবংশী জনতাকে নোটিস পাঠিয়ে শুনানির লাইনে দাঁড় করানো কতটা যুক্তিগ্রাহ্য, সেই প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

শুনানির নোটিস পেয়ে বৈধ ভোটারেরা অনেকেই বিরক্ত হচ্ছেন। কমিশনের সূত্রের দাবি, এর কারণ তাঁরা নিজেরাই জানেন না, তাঁদের অগোচরে কত জন তাঁর সন্তান পরিচয়ে নিজেদের নথি জমা দিয়েছেন। সেই ব্যক্তির প্রকৃত সন্তানও জানেন না, কত জন নথিতে তাঁর সহোদর হয়ে উঠেছেন! অনেকে মনে করছেন, এ ক্ষেত্রে নোটিসে যথাযথ কারণ ব্যাখ্যা করা থাকতে পারত। তবে অজান্তে এক ব্যক্তির নাম বহু ব্যক্তির সঙ্গে ‘ম্যাপ’ হয়ে থাকাও বিপজ্জনক প্রবণতা বলে কমিশন সূত্রের দাবি। ফলে সেই জট কাটানোও এখন কমিশনের কাছেবড় চ্যালেঞ্জ।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Special Intensive Revision SIR hearing West Bengal SIR

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy