Advertisement
E-Paper

নিজেরই কৌঁসুলির বিরুদ্ধে ১৫ বছরের যুদ্ধে জয়

প্রথমে একটাই আইনি লড়াই ছিল। হাসপাতালের বিরুদ্ধে। তাতে যাঁকে আইনি সহায়ক নিযুক্ত করেছিলেন, শেষ লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালেন নিজের সেই আইনজীবীই! দীর্ঘ ১৫ বছর পরে তাতে জিতলেন ত্রিপুরার এক প্রৌঢ়।

মেহবুব কাদের চৌধুরী

শেষ আপডেট: ০৯ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৪:০০

প্রথমে একটাই আইনি লড়াই ছিল। হাসপাতালের বিরুদ্ধে। তাতে যাঁকে আইনি সহায়ক নিযুক্ত করেছিলেন, শেষ লড়াইয়ে প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ালেন নিজের সেই আইনজীবীই! দীর্ঘ ১৫ বছর পরে তাতে জিতলেন ত্রিপুরার এক প্রৌঢ়।

জোড়া লড়াইয়ে কখনও পশ্চিমবঙ্গ, কখনও ত্রিপুরা, কখনও বা দিল্লির জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে যেতে হয়েছে ওই অসুস্থ প্রৌঢ়কে। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনের আদালত নির্দেশ দিয়েছে, ওই প্রৌঢ়ের ক্ষতি পূরণ করতে হবে তাঁরই এক সময়ের কৌঁসুলিকে। টাকার অঙ্কে সেটা এক লক্ষ। তবে প্রৌঢ়ের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে পাল্টা আবেদন করতে জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে যাচ্ছেন অভিযুক্ত।

কেন তিন রাজ্য জুড়ে ১৫ বছর লড়াই চালাতে হল ওই প্রৌঢ়কে?

১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বরে আগরতলায় একটি পথ-দুর্ঘটনায় জখম হন পূর্ব আগরতলার বাসিন্দা অনুপম ভট্টাচার্য। পেশায় আইনজীবী অনু্পমবাবুকে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর বাঁ পায়ের ‘ফিমার বোন’ ভেঙে গিয়েছে। স্থানীয় চিকিৎসকদের পরামর্শে তাঁকে আগরতলা থেকে এনে দক্ষিণ কলকাতার একটি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। অনুপমবাবু বলেন, ‘‘ওই হাসপাতালে এক হাত লম্বা একটি ইস্পাতের রড বসানো হয় আমার বাঁ পায়ে। কিন্তু এক বছর পরে রডটি ভেঙে যায়।’’ কয়েক দিন পরেই আগরতলার চিকিৎসকের পরামর্শে তিনি আবার কলকাতার ওই হাসপাতালে যান। অনুপমবাবুর অভিযোগ, হাসপাতাল-কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক তাঁর কথা শুনতেই চাননি। উল্টে তাঁরা দুর্ব্যবহার করেন। অনুপমবাবু পরের দিনই ভেলোরে যান। সেখানকার চিকিৎসকেরা তাঁর পা থেকে ভাঙা রড বার করে নতুন রড বসিয়ে দেন।

চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে কলকাতার ওই হাসপাতালের বিরুদ্ধে ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলার প্রস্তুতি শুরু করেন অনুপমবাবু। তিনি জানান, মামলা রুজু করার জন্য বাগুইআটির বাসিন্দা, আইনজীবী শিবশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ফোনে কথা হয় তাঁর। ২০০১ সালের ১৬ মে মামলার খরচ বাবদ ৩০ হাজার টাকা এবং চিকিৎসার যাবতীয় তথ্য (এক্স-রে প্লেট, প্রেসক্রিপশন ইত্যাদি) শিবশঙ্করবাবুর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন তিনি। অনুপমবাবুর অভিযোগ, ‘‘তার এক বছর পরে, ২০০২ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গ ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলাটি নথিভুক্ত করা হয়। কিন্তু শিবশঙ্করবাবু এক দিনও আদালতে হাজিরা না-দেওয়ায় ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে মামলাটি বাতিল হয়ে যায়।’’

হাল ছাড়ার পাত্র নন অনুপমবাবু। ওই বছরেই পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে একসঙ্গে দু’টি মামলা ঠুকে দেন তিনি। কলকাতার সেই হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ ও চিকিৎসকের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনে একটি মামলা করা হয়। অন্য মামলাটি করা হয় পশ্চিমবঙ্গে তাঁর আইনজীবী শিবশঙ্করবাবুর বিরুদ্ধে। চিকিৎসা সংক্রান্ত মামলাটি বাতিল হলেও পশ্চিম ত্রিপুরা জেলা ক্রেতা আদালত ২০০৫ সালে অভিযুক্ত আইনজীবীকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।

কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষা করার পরেও ওই ক্ষতিপূরণের টাকা না-আসায় ত্রিপুরা রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে ফের মামলা করেন অনুপমবাবু। ভিন্ রাজ্যের মামলা হওয়ায় ত্রিপুরা রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালত সেটি বাতিল করে দেয়।

নাছোড় অনুপমবাবু আইনজীবীর বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনে ২০০৭ সালে জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে মামলা করেন। কমিশন জানায়, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সকলেরই বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। কমিশন সুপারিশ করে, এ ক্ষেত্রে অভিযোগকারীকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে মামলা দায়ের করতে হবে।

সেই নির্দেশ মেনে ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতে শিবশঙ্করবাবুর বিরুদ্ধে ফের মামলা করেন অনুপমবাবু। আদালত থেকে স্থগিতাদেশ নেন শিবশঙ্করবাবু। অগত্যা আবার জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশনে যান অনুপমবাবু। একটি অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতকে নির্দেশ দেয় কমিশন। অবশেষে গত ২০ নভেম্বর রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালত শিবশঙ্করবাবুকে নির্দেশ দেয়, এক মাসের মধ্যে ক্ষতিপূরণের এক লক্ষ টাকা মিটিয়ে দিতে হবে।

ওই আদালতের বিচারক সমরেশপ্রসাদ চৌধুরী ও মৃদুলা রায় তাঁদের নির্দেশে জানান, জাতীয় ক্রেতা সুরক্ষা কমিশন এক অসুস্থ ব্যক্তির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া সত্ত্বেও বিরোধী পক্ষ (শিবশঙ্করবাবু) দিনের পর দিন মামলার শুনানিতে অনুপস্থিত ছিলেন। বিরোধী পক্ষ দিনের পর দিন
শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় বাধ্যতামূলক ভাবে এক সময় রাজ্য ক্রেতা আদালত সিদ্ধান্ত নেয়, অভিযোগকারীর একার বক্তব্য শুনেই মামলার নিষ্পত্তি করা হবে। এই সিদ্ধান্তের পরে বিরোধী পক্ষের আইনজীবী এই মামলায় যোগ দেন।

রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের নির্দেশ সত্ত্বেও অনুপমবাবু এখনও ক্ষতিপূরণের টাকা হাতে পাননি। টাকা দেওয়া হয়নি কেন? অভিযুক্ত শিবশঙ্করবাবু বলেন, ‘‘রাজ্য ক্রেতা সুরক্ষা আদালতের রায় পুরোপুরি একতরফা। এই রায়ের বিরুদ্ধে আমি জাতীয় কমিশনে মামলা করব।’’

শিবশঙ্করবাবুর বক্তব্য, তাঁর বাড়ির ঠিকানায় পাঠানো ৩০ হাজার টাকা ও নথিপত্র তিনি হাতে পাননি। তা ছাড়া কলকাতায় মামলা চলাকালীন অনুপমবাবু হাসপাতালের চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগে আগরতলা ক্রেতা সুরক্ষা আদালতেও মামলা করেছিলেন। একই কারণে দু’জায়গায় মামলা চলতে পারে না। তাই তাঁরা মামলা থেকে সরে যান বলে জানান শিবশঙ্করবাবু। তিনি বলেন, ‘‘এক জন বরিষ্ঠ আইনজীবী হয়ে অনুপমবাবু ত্রিপুরার আদালতে মিথ্যা হলফনামা দিয়ে বলেছেন, আমরা কলকাতায় মামলা করিনি।’’ তাঁর দাবি, শেষ দফার মামলায় কোনও কারণে তাঁর আইনজীবী শুনানিতে অনুপস্থিত থাকায় অনুপমবাবু রাজ্য ক্রেতা আদালত থেকে একতরফা রায় নিয়েছেন।

এই সব যুক্তি বা বক্তব্য ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেছেন অনুপমবাবু। তাঁর প্রশ্ন, শিবশঙ্করবাবু এ-সব কথা আদালতে হাজির হয়ে জানাননি
কেন? এর কোনও সদুত্তর দিতে পারেননি শিবশঙ্করবাবু।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy