Advertisement
E-Paper

ঝাঁপ বন্ধ, বিপন্ন বিড়ি মহল্লা

মাটিমাখা কোদাল পাশে রেখে রাস্তার ধারে বসেছিলেন নারায়ণী হালদার। এই প্রথম শীতেও বিনবিন করে ঘামছেন। আঁচলে মুখ মুছে নিয়ে বললেন, ‘‘কোনও দিন যা করতে হয়নি, আজ তা-ও করতে হচ্ছে !’’

বিমান হাজরা

শেষ আপডেট: ০১ ডিসেম্বর ২০১৬ ০৪:২১
কী ভাবে চলবে! মুর্শিদাবাদের অরঙ্গাবাদে। ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়।

কী ভাবে চলবে! মুর্শিদাবাদের অরঙ্গাবাদে। ছবি: অর্কপ্রভ চট্টোপাধ্যায়।

মাটিমাখা কোদাল পাশে রেখে রাস্তার ধারে বসেছিলেন নারায়ণী হালদার। এই প্রথম শীতেও বিনবিন করে ঘামছেন। আঁচলে মুখ মুছে নিয়ে বললেন, ‘‘কোনও দিন যা করতে হয়নি, আজ তা-ও করতে হচ্ছে !’’

নারায়ণী বিড়ি শ্রমিক। বাড়িতে অসুস্থ স্বামী আর তিন ও এক বছরের দুই ছেলেমেয়ে। নোট বাতিলের জেরে তাঁর কারখানা ঝাঁপ ফেলেছে। লক্ষ্মীর ভাঁড়ে ছিল ৭০ টাকা। তাতে দিন চারেক চলেছে। আর চলছে না। তাই একশো দিনের প্রকল্পে রাস্তা তৈরির কাজে নেমেছেন। ‘‘ক’দিন টানব এ ভাবে?” বলতে বলতে কান্নায় গলা বুজে আসে তাঁর।

নারায়ণী একা নন। এই অসহায়তা আর আতঙ্ক পাক খাচ্ছে মুর্শিদাবাদে গোটা বিড়ি মহল্লা জুড়েই। অরঙ্গাবাদ, সুতি, ধুলিয়ান, সমশেরগঞ্জ জুড়ে দেশের বৃহত্তম এই বিড়ি মহল্লা— যেখানে অন্তত ছ’লক্ষ অসংগঠিত শ্রমিক কাজ করেন। দৈনিক উৎপাদন ৪০ কোটি বিড়ি। সপ্তাহান্তে মজুরি নিদেনপক্ষে ৩৫ কোটি টাকা।

নোট বাতিলের পরে প্রথম সপ্তাহান্তে মজুরি দেওয়া হয়েছিল পুরনো ৫০০-১০০-এর নোটে। দ্বিতীয় সপ্তাহে ছ’টি কারখানা বসে যায়। লাখখানেক শ্রমিক বেকার হয়ে যান। সোমবার বন্ধ হয় অন্যতম বড় কারখানা ‘পতাকা বিড়ি’। আরও দু’লাখ শ্রমিক বসে যান। আর একটি বড় কারখানা ‘শিব বিড়ি’ও বুধবার ঝাঁপ ফেলেছে। বসে গিয়েছেন আরও এক লাখ শ্রমিক। যেগুলি চলছে, সেগুলিতেও মালিকেরা জানিয়েছেন, আগামী তিন সপ্তাহ মজুরি হবে না। এই শর্তেই কাজ দেওয়া হবে।

এ দিনই তৃণমূলের ডাকে জঙ্গিপুরে শ্রমিকদের নিয়ে সমাবেশ করা হয়। আইএনটিটিইউসি-র রাজ্য সভানেত্রী দোলা সেন ছাড়াও তৃণমূলের জেলা সভাপতি মান্নান হোসেন ও রাজ্যের শ্রম প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন সভায় ছিলেন। এই জাকিরই শিব বিড়ির মালিক। তাঁর মতে, ‘‘মালিকেরা চান শ্রমিকদের কাজ দিতে। টাকার জোগান না থাকায় তা পারছেন না। কিছু দিন কারখানা বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় নেই।’’

বুধবার দিনভর বিড়ি মহল্লায় ঘুরে শুধু হাহাকারই শোনা গিয়েছে। অরঙ্গাবাদের ইন্দ্রনগর কলোনির বিএ পড়ুয়া রিনা হালদার, তার মাধ্যমিক পড়ুয়া বোন ও মা মিলে বিড়ি বাঁধেন। রিনা বলেন, “রবিবার বিকেলে শেষ বিড়ি জমা দিয়েছি। বাবা একা ভ্যান চালিয়ে কি টানতে পারবেন?’’ গরিব শ্রমিকদের অনেককেই রেশন দোকান থেকে যে দু’টাকা কিলোয় চাল-গম দেওয়া হচ্ছিল, এ সপ্তাহে তা অর্ধেক করে দেওয়া হয়েছে। ফলে এলাকার মুদি বা সব্জির দোকানে ধার বাড়ছে অনেকের।

কিন্তু এত ধার দেবেই বা কে?

ইন্দ্রনগরে মুদির দোকান দীনবন্ধু হালদারের। বললেন, “পরের হপ্তায় টাকা পেলে ধার দিতে অসুবিধা নেই। কিন্তু মাসখানেক ধরে ধার দিলে না খেয়ে মরতে হবে!” হরিপুরের মুদি সানাউল শেখও বলেন, “শ্রমিকেরা যদি বসে যান, ধার শুধবেন কী করে?’’

এ অবস্থায় এখন মজুরি মিলবে না জেনেও অনেকে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। যাতে দোকানে ধার অন্তত বন্ধ না হয়। শেরপুরের ফরিদা বিবির আর্জি, “মালিকেরা আমাদের মজুরি না দিক, কারখানা অন্তত চালু রাখুক। কারখানা বন্ধ হলে তো আর ধারও দেবে না দোকানদারেরা!”

কারখানা খোলা রাখার আর্জি নিয়ে মঙ্গলবারই বিড়ি মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করে জেলা প্রশাসন। যে সব শ্রমিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে, সেই অ্যাকাউন্টে মজুরির টাকা জমা করতে বলা হয়। যাঁদের তা নেই, তাঁদের অ্যাকাউন্ট খোলানোর জন্য শিবির করা হবে বলেও জানানো হয়। কিন্তু বিড়ি মালিকেরা জানান, বিপুল সংখ্যক শ্রমিকের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট বা অন্য কোনও তথ্য তাঁদের কাছে নেই। জাকিরের মতে, ‘‘এ প্রস্তাব কার্যকর করা সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। তত দিন কারখানা চালু রাখা সম্ভব নয়।’’

তত দিন শ্রমিক পরিবারগুলো কী ভাবে চলবে, তার উত্তর কে দেবে?

Demonetisation Bidi industry
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy