Advertisement
E-Paper

শরীর ছেড়েও মৃত্যুজুজু হয়ে ডেঙ্গি সোজা গেড়ে বসছে মনে

• ধাঁই-ধাঁই করে নেমে যাচ্ছিল প্লেটলেট। অণুচক্রিকা। তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রাণ বাঁচল ঠিকই। কিন্তু শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরেও মৃত্যুভয় গেল না বড়িশার তন্ময় সরকারের। • প্লেটলেট সে-ভাবে কমেনি। কিন্তু মাথা সোজা রাখতে পারছিলেন না। ভুলে গিয়েছিলেন নিজের পদবি।

দেবদূত ঘোষঠাকুর

শেষ আপডেট: ২১ ডিসেম্বর ২০১৫ ০৩:৫২

• ধাঁই-ধাঁই করে নেমে যাচ্ছিল প্লেটলেট। অণুচক্রিকা। তড়িঘড়ি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে প্রাণ বাঁচল ঠিকই। কিন্তু শারীরিক ভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পরেও মৃত্যুভয় গেল না বড়িশার তন্ময় সরকারের।

• প্লেটলেট সে-ভাবে কমেনি। কিন্তু মাথা সোজা রাখতে পারছিলেন না। ভুলে গিয়েছিলেন নিজের পদবি। দেড় মাস পরেও ভবানীপুরের সুচরিতা দাসের ভয় কাটেনি। তিনি সব ঠিকঠাক বলছেন কি না, সংশয় গেড়ে বসেছিল নিজেরই মনে। ‘ঠিক বলছি তো, ঠিক বলছি তো’— তাঁর প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার ঘরের লোকজন থেকে বন্ধুবান্ধব সকলেই।

• মশা দেখলেই ছটফটিয়ে ওঠেন সিঁথির জীবন দে। মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না। সেই মশা না-মারা পর্যন্ত হিস্টিরিয়া রোগীর মতো আচরণ করতে থাকেন ওই যুবক।

শুধু তন্ময়, সুচরিতা বা জীবন নয়। রোগ সেরে যাওয়ার দেড় থেকে দু’বছর পরেও ‘ডেঙ্গি-ভয়’ কাটছে না অনেকেরই। অনেক ক্ষেত্রে সেটা হয়ে দাঁড়াচ্ছে মৃত্যুভয়ও। কোথাও ডেঙ্গি সংক্রমণের খবর পেলেই তাঁদের মস্তিষ্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে, যা ধরা পড়ছে তাঁদের আচার-ব্যবহারে।

ডেঙ্গি থেকে সেরে ওঠার পরেও এ-হেন মানসিক সমস্যা হচ্ছে কেন?

মনোবিদ জয়রঞ্জন রাম জানাচ্ছেন, ডেঙ্গির পরে শারীরিক দুর্বলতা থাকে। অনেকের ক্ষেত্রে সেটা দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাতেই দেখা দেয় মানসিক সমস্যা। ‘‘খুব কর্মঠ লোকেরও তখন কাজ করতে ইচ্ছে করে না। শারীরিক অবসাদ ধীরে ধীরে মানসিক অবসাদে পরিণত হয়,’’ বলেন জয়রঞ্জনবাবু।

ডেঙ্গি বা এই ধরনের জ্বর শরীরের গঠনতন্ত্রকে বড় ধাক্কা দেয় এবং তার জেরে অনেকেরই মানসিক সমস্যা হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন মনোবিদ জ্যোতির্ময় সমাজদার। তিনি বলেন, ‘‘এমন অনেক রোগী পাচ্ছি, যাঁরা ভুল বকছেন বা কোনও কিছুতে অকারণ ভয় পাচ্ছেন। মাস কয়েক চিকিৎসা করালে এটা সেরে যায়।’’

মনোবিদ শান্তনু গোস্বামীর মতে, শুধু ডেঙ্গি নয়, ফ্যালসিপেরাম ম্যালেরিয়া, মেনিনজাইটিসের মতো যে-সব রোগে মস্তিষ্ক বা স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হয়, সেখানে রোগ নিরাময়ের পরে এমন সমস্যা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। ‘‘ওই সব রোগীর মনে একটা ভয় কাজ করে। ডিপ্রেশন তা থেকেই,’’ পর্যবেক্ষণ শান্তনুবাবুর।

সরকারি হাসপাতালের সঙ্গে যুক্ত এক মনোবিদও জানান, আশপাশের কাউকে এই ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে দেখলে বহু ক্ষেত্রে অনেকের আশঙ্কা হয়, তাঁরও ফের রোগটি হতে পারে। স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের প্রাক্তন অধিকর্তা, পরজীবী বিশেষজ্ঞ অমিতাভ নন্দীর অভিজ্ঞতা, যে-সব ডেঙ্গিরোগী হাসপাতালে বেশ কয়েক দিন ভর্তি থাকেন, তাঁদের অনেকেই খিটখিটে হয়ে যান। অনেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ওই সব রোগীর ভয় কাটাতে পরিবার এবং বন্ধুবান্ধবের সাহায্যই যথেষ্ট বলে মনে করেন অমিতাভবাবু। সেই সঙ্গেই বলেন, ‘‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনোবিদের সাহায্য প্রয়োজন।’’

ডেঙ্গিরোগীদের মানসিক অবস্থা খতিয়ে দেখতে তাঁরা হাসপাতালে নির্দেশিকা পাঠান হয় বলে জানালেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রকের এক কর্তা। দিল্লির ইউনিভার্সিটি অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসের মনোবিদ্যা বিভাগ এবং গুরু তেগবাহাদুর হাসপাতালের এক সমীক্ষা-রিপোর্টের উল্লেখ করে ওই স্বাস্থ্যকর্তা জানান, হাসপাতালে ভর্তি থাকা ৮০% ডেঙ্গিরোগীর মানসিক সমস্যা ধরা পড়েছে। কয়েক জন থ্যানাটোফোবিয়া বা মৃত্যুভয়ের শিকার। তাঁদের জন্য বিশেষ কাউন্সেলিংয়ের সুপারিশ করা হচ্ছে।

কেন্দ্রীয় সমীক্ষকেরা জানাচ্ছেন, বহু ডেঙ্গিরোগীর মানসিক সমস্যায় শারীরবৃত্তীয় কাজকর্মও প্রভাবিত হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে হরমোন নিঃসরণের অস্বাভাবিকতা, ঘুমের ছন্দ নষ্ট হয়ে যাওয়া, দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস, ওজন বেড়ে যাওয়া। ঠিক সময়ে এই সব অস্বাভাবিকতা ধরা না-পড়লে এবং তার কারণ নির্ণয় না-হলে ভবিষ্যতে সমস্যা জটিলতর হতে পারে।

রাজ্য কী করছে? রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তার কথায়, ‘‘ডেঙ্গির প্রকোপ রুখতেই আমরা এতটা ব্যস্ত থেকেছি যে, পরবর্তী প্রভাব সম্পর্কে সমীক্ষা চালানোর সুযোগ হয়নি। এই কাজ সরকারের বদলে বেসরকারি সংস্থার পক্ষে করাটাই সুবিধাজনক।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy