‘লাল গাঁজা’! দুধে চুবিয়ে বিভিন্ন ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে সাধারণ গাঁজার নেশাকে আরও তীব্র করা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা সূত্রে দাবি। বাজারে ওই গাঁজার পোষাকি নাম ‘লালা গাঁজা’। সাধারণ গাঁজার থেকে দাম বেশি। নেশার তীব্রতা অনেক বেশি।
বছর দুয়েক আগেও ২৫ থেকে ৩০ টাকায় গাঁজার ছোট প্যাকেট পাওয়া যেত। কিন্তু এখন বাজারে প্রায় সর্বত্রই 'লাল গাঁজা'। পরিমাণ অনুযায়ী প্রতি প্যাকেট ৫০, ১০০, ১৫০ ও ২০০। আর ওই লাল গাঁজার নেশায় বুদ মাদকাসক্ত স্কুল-কলেজ পড়ুয়া সহ তরুণ যুবক।
গোয়েন্দা কর্তাদের কথায়, করোনা কালে মদের দাম বেড়ে যাওয়ায় মদ্যপায়ীদের একটি বড় অংশ গাঁজার নেশায় চলে গিয়েছে। আর গত পাঁচ বছরে গাঁজার চাহিদা রকেটের গতিতে বেড়ে চলেছে। সিকিম, গ্যাংটক, মনিপুর ও গুয়াহাটি থেকে বিপুল পরিমাণ গাঁজা এরাজ্যে মূলত সড়ক পথে পাচার হয়ে বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে যাচ্ছে। ভিন রাজ্যের সাধারণ গাঁজা কিনে নেওয়ার পর দুধ ও ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ‘প্রসেসিং’করে মাদক কারবারিরা লাল গাঁজা বাজারে বিক্রি করছে। বিপুল চাহিদার পাশাপাশি প্রায় ২০০ শতাংশ মুনাফা।
গোয়েন্দা কর্তাদের কথায়, কলকাতা ও রাজ্য পুলিশের এসটিএফ, জেলা পুলিশ ও সিআইডি তদন্তকারীরা তল্লাশি অভিযান চালিয়ে বছরে গড়ে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ হাজার কেজি গাঁজা বাজেয়াপ্ত করেন বলে পরিসংখ্যান রয়েছে। কিন্তু আঁটোসাঁটো নজরদারি পরও বিপুল পরিমাণে গাঁজা চোরাই পথে এ রাজ্যে প্রবেশ করছে। কিছুতেই তা আটকানো যাচ্ছে না।"
এক গোয়েন্দা কর্তা বলেন,“ভিন রাজ্য থেকে এ রাজ্যে আসা শাকসবজি, ডিম, মাছ, মুদিখানার সামগ্রী চাল, গম, আটার লরিতে গাঁজা পাচার হচ্ছে। অতিরিক্ত সময় এবং যানজট এড়াতে সর্বত্র রাজ্যের চেকপোষ্টে বড় বড় লরি তল্লাশি অভিযান সম্ভব হয় না। আর ওই নজরদারির অভাবের সুযোগ নিয়েই ফাঁক দিয়ে বিভিন্ন লরি ও গাড়িতে বেরিয়ে যাচ্ছে বিপুলপরিমাণ গাঁজা।”
গোয়েন্দা কর্তাদের কথায়, একদিকে ভিন রাজ্য থেকে গাঁজা পাচার হয়ে এ রাজ্যে চলে আসছে। আবার এ রাজ্যের মাদক কারবারিরা ভিন রাজ্যে জমি কিনে গাঁজার চাষ করা শুরু করেছে সম্প্রতি। ওখান থেকে সরাসরি নিজেরাই গাঁজা এরাজ্য নিয়ে আসছে বলে সম্প্রতি একাধিক সূত্র পাওয়া গিয়েছে। বছরের প্রায় ৪০০ থেকে ৫০০ জন গাঁজা পাচারকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও গাঁজার রমরমা আটকানো যাচ্ছে না।
এর এসটিএফ কর্তার কথায়, ‘‘মূল মাদক কারবারিরা সবসময়ই পর্দার আড়ালে থেকেই কলকাঠি নেড়ে চলেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে কঠোর আইন রয়েছে। মাদক আইনের ধারায় সহজে জামিন মঞ্জুর হয় না। হেফাজতে রেখেই বিচার প্রক্রিয়া হয়। তারপর শাস্তি। ন্যূনতম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। আর এক দিকে মাদক কারবারিকে শনাক্ত করা গেলে তার 'প্যান কার্ডের'সূত্র ধরে আয়ের সঙ্গে সঙ্গতিহীন সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এত কিছু কঠোর আইন থাকা সত্বেও গাঁজা পাচার বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।"
ওই কর্তার কথায়, ‘‘গত ১০ বছরে মাদক কারবারীদের অন্যতম আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের একাংশ। রাজনৈতিক নেতাদের তহবিলে মোটা টাকা দিয়ে নিজেদের ব্যবসা সুরক্ষিত রাখছে মাদক কারবারিরা। ওই সব ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মাদক কারবারিদের গ্রেফতার করতেও নানা ধরনের বাধা-বিপত্তি ও সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে তদন্তকারীদের। এর ফলেই রমরমিয়ে গাঁজা পাচার ও বিক্রি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না।”
লাল গাঁজা নিয়ে চিন্তিত চিকিৎসক মহলও। দিনের পর দিন ঘুমের ওষুধ মেশানো গাঁজার ধোঁয়ায় জীবনের চরম পরিণতি অর্থাৎ মৃত্যুর পথে চলে যাওয়ার প্রভূত আশঙ্কা রয়েছে বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।
চিকিৎসক অরিন্দম বিশ্বাস বলেন, “এক দিকে গাঁজা পাতার প্রাকৃতিক নেশা আরেক দিকে নানা ধরনের ঘুমের ওষুধের রাসায়নিক প্রভাব। দুটি একত্র হয়ে গুরুতর শারীরিক সমস্যার সৃষ্টি করাটা স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে হৃদযন্ত্র, লিভার, কিডনির ধীরে ধীরে বিকল হয়ে যায়। এবং দ্রুত ব্রেন স্ট্রোকের আশঙ্কা তো রয়েছেই। এক মারাত্মক শারীরিক জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মৃত্যুর আশঙ্কা ধীরে ধীরে বাস্তবে পরিণত হতে থাকে।"
মনোরোগ চিকিৎসক সুজিত সরখেল বলেন,“প্রথম অবস্থায় ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি লোপ পেতে থাকে। পরে নানা জটিল উপসর্গ দেখা দেয়।”
ওই চিকিৎসকের কথায়, “গাঁজার নেশা ছাড়ানো কিছুটা হলেও সহজ। ওই নেশার সাধারণত ‘উইথড্রয়াল সিনড্রোম’ থাকে না। কিন্তু দীর্ঘদিন ঘুমের ওষুধে ব্যবহার করা হলে নেশা ছাড়ানো যায় না। আচমকা ছাড়ানো হলে নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়। সে ক্ষেত্রে লাল গাঁজা সেবনকারী মাদকাসক্তের চিকিৎসায় জটিলতা সৃষ্টি হয়। তাছাড়া কোন ধরনের ঘুমের ওষুধ ব্যবহার করা হয়েছিল, তা জানা যায় না। চিকিৎসা পদ্ধতি জটিল হয়ে ওঠে। সব ক্ষেত্রে নিরাময় করা সম্ভব নাও হতে পারে।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)