এমন ছিল না পাঁচ বছর আগের ভোট। সঙ্গে তখন নতুন বন্ধু। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই।
পাঁচ বছর পরে সেই বন্ধুরাই চলে গিয়েছেন উল্টো দিকে। সমানে ছোট-বড় আক্রমণের নিশানা করছেন তাঁকে। কখনও সভামঞ্চ থেকে বক্তৃতায় আক্রমণ। কখনও তাঁর প্রচার পুস্তিকা হাতে তাঁকেই পাল্টা প্রশ্নের মুখে ফেলে দেওয়া। কখনও মারধরের চেষ্টা। পুরনো ‘শত্রু’রা তো ছিলেনই। তাঁরাও বাঁকা কথায় বিদ্ধ করতে ছাড়ছেন না।
পাঁচ বছর পরে এমনই এক অদ্ভুত নিঃসঙ্গতা ঘিরে ধরেছে তরুণ মণ্ডলকে। জয়নগর লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ এবং এসইউসি-র প্রার্থী।
এপ্রিলের শেষাশেষি এক সকালে, চড়া রোদ আর রাজনৈতিক ধাক্কাধাক্কিতে যখন হাওয়া গরম, ক্যানিং পশ্চিম বিধানসভা কেন্দ্রের ধোওয়াঘাটায় এক বাজার চত্বরে বক্তৃতায় তিনি নিজেই তুলেছেন এই প্রসঙ্গ। বলেছেন, “যাঁরা বলেন, আপনি তো একা, একা হয়ে কী কাজ করবেন? তাঁদের জিগ্গেস করতে চাই, আপনাদের তো এত সাংসদ, কী করেছেন এত জন নিয়ে?” তা হলে কি মেনে নিচ্ছেন, আপনি একা? একটু পরে একান্ত আলাপচারিতায় অবশ্য প্রবল ভাবে ঘাড় নাড়লেন এই প্রশ্ন শুনে, “কে বলল একা? এত মানুষ আছে আমার সঙ্গে!”
বাজার এলাকায় তখনও চাপা উত্তেজনা। হানিফ শেখ, মকবুলরা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছেন, “ক’দিন আগে কত ভাই-ভাই বলে ডাক দিচ্ছিল তৃণমূল। আর এখন ওঁর (তরুণবাবুর) দেওয়াল লেখার উপরেই রং করে নিজেরা দেওয়াল লিখেছে।” জানতে চাইলে প্রবল উৎসাহে দেখিয়েও দিচ্ছেন সেই দেওয়াল (যাকে পরে ‘ছোট ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেছেন তৃণমূল নেতারা)।
কিছু ক্ষণ পরে ঘুটিয়ারি শরিফের অলিগলিতে ঘুরতে ঘুরতে তরুণবাবু বলছিলেন, “গত বার হয়েছিল মানুষের মহাজোট। পরিস্থিতির দাবি ছিল বামফ্রন্টকে হারানো। তখনও কিন্তু আমরা বলেছিলাম, ক্ষমতায় এলে বিরোধী আসনেই থাকব।”
বিকেল সাড়ে তিনটে। আর কিছু ক্ষণের মধ্যেই বাসন্তীতে জনসভা, যেখানে হাজির থাকবেন সুপারস্টার দেব। সে দিকে ছুটে চলেছে তৃণমূল প্রার্থী প্রতিমা মণ্ডলের ইনোভা। প্রশ্ন শুনে শান্ত গলাতেই প্রায় ঝেঁঝে উঠলেন প্রতিমাদেবী, “মানুষের মহাজোট! ওঁদের সঙ্গে তো কংগ্রেসের জোট হয়নি। শুধু তৃণমূলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন ওঁরা। কেন জানেন? জেতার জন্য।”
ইতিহাস বলছে, জয়নগর কেন্দ্রে এর আগে এক বারই জিতেছিল এসইউসি। ১৯৬৭ সালে। সে বারে যুক্তফ্রন্টের হাওয়ায় তরী পার করেন চিত্ত রায়। একার ক্ষমতায় আর কখনও জয়ের ধারেকাছে আসেননি তাঁরা।
এ বারে কি পারবেন তরুণবাবু? রাজ্যের প্রান্তিক কেন্দ্র জয়নগর, যাকে সুন্দরবনে ঢোকার দরজাও বলা যেতে পারে, সেখানে রাজনৈতিক অঙ্কটা এ বার যথেষ্ট জটিল। এক মাত্র এখানে লড়াইটা পাঁচমুখী। সঙ্গে যোগ করুন বিজেপির উত্থান, বামেদের জমি পুনরুদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা, তৃণমূলের শক্তিবৃদ্ধি এবং অবশ্যই এসইউসি-র শক্তিক্ষয়। তরুণবাবুর শক্ত ঘাঁটি এখনও জয়নগর বিধানসভা কেন্দ্র। আর সেখানেই হারানো জমি ফিরে পাওয়ার চেষ্টায় মরিয়া বামেরা। ফলে টক্কর হবে সমানে সমানে। পাশের কেন্দ্র কুলতলি তো ২০১১ সালের প্রবল বামফ্রন্ট-বিরোধী হাওয়াতেও হাতছাড়া হয়েছে এসইউসি-র। তরুণবাবু একে ‘কম মার্জিনের আসন’ বললেও স্থানীয় সিপিএম নেতা-কর্মীরা বলছেন, বিধানসভা ভোটের আগেই এসইউসি-কে ভিতর থেকে ভাঙতে শুরু করেছিল তৃণমূল। তার রেশ রয়েই গিয়েছে (তরুণবাবুর রোড শো-ও তথৈবচ। তিনটে গাড়িতে দলের লোক, আর তাকে পাহারা দিতে চারটে পুলিশের গাড়ি!)। বাকি রইল যে সব বিধানসভা কেন্দ্র, ক্যানিং পূর্ব, ক্যানিং পশ্চিম, মগরাহাট পূর্ব, বাসন্তী এবং গোসাবা— কোনওটিতেই তরুণবাবু একা বিশেষ দাঁত ফোঁটাতে পারবেন না বলে অন্য প্রায় সব দলেরই দাবি।
পরের দৃশ্য কুলতলি, বেলের মোড়। প্রচারের ফাঁকে লুঙ্গি আর ফতুয়া পরে ঘরোয়া মেজাজে সুভাষ নস্কর বোঝাচ্ছিলেন, তরুণ মণ্ডল কেন লড়াইয়ে নেই। বামফ্রন্টের প্রার্থী এবং বাসন্তীর সাত বারের বিধায়ক বলছিলেন, “সংগঠন কোথায় ওদের? সংগঠনের জোর ছাড়া এই লড়াই জেতা যায় নাকি?”
বিভিন্ন জায়গায় প্রথমে বড় সভা, তার পরে ছোট ছোট রোড শো করে চলেছেন সুভাষবাবু। অনেকটা পোড় খাওয়া ব্যাটসম্যানের মতো মাটি কামড়ে পড়ে টেস্ট ইনিংস খেলছেন। হতে পারে, সিপিএমের সঙ্গে তাঁর দল আরএসপি-র পুরনো ঝগড়া এখনও চোরা স্রোত হয়ে রয়ে গিয়েছে (তাঁর ভাইপোর স্ত্রীর খুনের ঘটনায় অভিযোগের আঙুল সিপিএমের দিকেই। ২০০৮ সালের সেই গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের কথা এখন প্রচারে পুরোদমে তুলে আনছে তৃণমূল)। হতে পারে, বাসন্তী, গোসাবা, ক্যানিং-এর দুই বিধানসভা কেন্দ্র— নিজেদের পুরনো এই ঘাঁটিগুলিতে এখনও পূর্ণ শক্তি দেখাতে পারছেন না তাঁরা (এর বড় কারণ এক সময় ডাকাবুকো বাম নেতা, বর্তমানে জেলায় তৃণমূলের অন্যতম স্তম্ভ সওকত মোল্লার ভয়)। তবু কিছুটা সিপিএমের সংগঠনের জোরে, কিছুটা তৃণমূল-বিরোধী হাওয়ায় ভর করে আশায় রয়েছেন তিনি। এবং মনে করছেন, তরুণ মণ্ডলের সাংগঠনিক শক্তি ক্ষয় তাঁকে এগিয়ে দেবে।
তবে বাম নেতা-কর্মীরা যা-ই বলুন, এসইউসি-কে শুধু যে তৃণমূল ভেঙেছে তা নয়। ভাঙছে বিজেপিও।
চলুন জীবনতলার হাট। জয়নগরের কাছে মহাহাউড়ী পঞ্চায়েতের এই এলাকায় বরাবরই বিজেপির শক্তি ভাল। কারণ, আরএসএসের সংগঠন। এই অঞ্চলে একাধিক ক্যাম্প চালায় তারা। সকালে এখানে চার-পাঁচশো লোকের রোড শো সেরে হাটে নিজেদের দোকানঘরে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তাপস সর্দার, জয়ন্ত সর্দাররা। তাঁদেরই কেউ কেউ জানালেন, আগে এসইউসি করতেন, এখন চলে এসেছেন বিজেপিতে। বছর তিরিশের তাপস সর্দারের কপালে তখনও তিলক। বলছিলেন, “আগে কখনও আরএসএস বলেনি, তাই বিজেপির হয়ে খাটাখাটনি করতাম না। শুধু ভোটটা দিতাম। এ বার সঙ্ঘের নির্দেশ, মোদীকে জেতাও। তাই আমরাও নেমে পড়েছি।” জানালেন, তরুণ প্রজন্মের কাছ থেকে বিপুল সাড়া মিলছে।
এই হাটের খুব কাছে আনন্দপুর গ্রামের এক মন্দিরের সামনে ১৯৯২ সালে রামশিলা পুজো হয়েছিল ঘটা করে। সেখানে যাওয়ার পথে গ্রামের সরু রাস্তা দু’ভাগ হয়ে গিয়েছে। মুখটায় দাঁড়িয়ে বাঁ হাতের রাস্তা দেখিয়ে তাপসবাবুর বক্তব্য, ও দিকটা সংখ্যালঘুদের এলাকা। ফেরার পথে সেখানেই এক বৃদ্ধের সঙ্গে দেখা। মাথায় ফেজ টুপি। সাদা দাড়ি। মাথাটা নুয়ে এসেছে। বললেন, “আমরা কিন্তু ভোটটা তৃণমূলেই দেব।”
সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে বিজেপি প্রার্থী কৃষ্ণপদ মজুমদারের অঙ্ক খুব স্পষ্ট, “এখানে প্রায় ৪০ শতাংশ সংখ্যালঘু ভোট আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা চার ভাগ হবে। তখন আর এক একটা ভাগে কী পড়ে থাকবে! হিন্দু তথা তফসিলি ভোটের (জয়নগর তফসিলি কেন্দ্র) অর্ধেকই আমি পাব। তা হলেই আমার জয় নিশ্চিত।”
সভায় লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উৎসাহিত কংগ্রেস প্রার্থী অর্ণব রায়ও। তাঁর কথায়, “সংখ্যালঘুরা কংগ্রেসকেই ভোট দেবেন। রোড শো-এ এত ভিড় হচ্ছে যে সেটা পথসভা-ই হয়ে দাঁড়াচ্ছে এখন!” প্রদেশ সভাপতি অধীর চৌধুরী এর মধ্যেই সভা করে গিয়েছেন। তাতেও জমায়েত কিছু কম হয়নি!
বড় দলগুলি যখন এ ভাবে সংগঠন, তরুণ প্রজন্ম অথবা শীর্ষ নেতাদের জোরে কোমর বাঁধছেন, তরুণবাবু তখন কিন্তু একাই দৌড়ে বেড়াচ্ছেন। যাঁকে দেখিয়ে ধোওয়াঘাটা বাজারের এক প্রৌঢ়র সংক্ষিপ্ত মন্তব্য, “জয়নগরের একা কুম্ভ!”