কাজ গুটিয়ে আনা তো যাচ্ছেই না, বরং তা ক্রমশ বাড়ছে। ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যে শুনানি পর্ব শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু এখনও বেশির ভাগ শুনানিই বাকি। দায় কার, সেই প্রশ্নেও ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী, এই রাজ্যে ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রকাশ পাওয়ার কথা চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। চলতি মাসের অর্ধেক পেরিয়ে গিয়েছে। কিন্তু যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে নির্ধারিত সময়সীমা বজায় রাখা যাবে কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে কমিশন এবং জেলা প্রশাসনগুলির মধ্যে। এখন একটি বিধাসনভায় এক জন ইআরও এবং ১০ জন এইআরও এই শুনানি করছেন। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতর আরও ১৬০০ এইআরও নিয়োগের জন্য কমিশনের অনুমোদন চেয়েছে। স্বাভাবিক ভাবেই শুনানির গতি বাড়ানো জরুরি। কিন্তু অভিযোগ, কমিশন যে ভাবে নিত্য নতুন নিয়ম চালু করছে, একই ভোটারকে একাধিক বার তলব করছে, তাতে কাজের গতি এমনিতেই শ্লথ হচ্ছে। উপরন্তু, যাঁরা এক বা একাধিক বার নথি জমা দিচ্ছেন, তাঁদের জমা দেওয়ার প্রমাণও দেওয়া হচ্ছে না। ফলে তাঁদের আরও যে ডাকা হবে না, তার নিশ্চয়তা নেই। কেন বার বার ডাকা হচ্ছে, সে বিষয়টিও স্পষ্ট নয় সব ক্ষেত্রে। পাশাপাশি, নাম বাতিলের জন্য ফর্ম-৭ জমা দেওয়ার শেষ দিনও পিছিয়ে ১৯ জানুয়ারি করা হয়েছে।
কমিশন-সূত্রের খবর, তেমন পরিস্থিতি তৈরি হলে কয়েক দিন সময় বাড়ানোর আবেদন বিবেচনা করে দেখা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের সময় হেরফের হলে, তার প্রভাব ভোট ঘোষণার সময়ের উপরেও পড়তে পারে। কোনও কোনও মহলের আশঙ্কা, এই ভাবে প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হলে শেষে না বিধানসভার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করার সুযোগ পেয়ে যাবে কেন্দ্রীয় সরকার।
গত মঙ্গলবার পর্যন্ত যে তথ্য জানা গিয়েছিল, তাতে ৭৪ লক্ষ নোটিস বার হওয়া বাকি ছিল। অর্থাৎ, সেই নোটিস জারি হবে, তা ভোটারের হাতে পৌঁছবে, তার ভিত্তিতে ভোটার আসবেন শুনানিতে, নথি তিনি জমা করবেন, সেই নথি পুনর্যাচাইয়ের জন্য যাবে জেলাশাসকের কাছে, পুনর্যাচাই হওয়ার পরে সেই রিপোর্ট পাবেন ইআরও বা এইআরও, তার ভিত্তিতে সেই ভোটার তালিকাভুক্ত হবেন বা বাদ যাবেন। এখনও পর্যন্ত প্রায় ২৫ লক্ষ শুনানি করা গিয়েছে বলে খবর। ফলে বিপুল সংখ্যক শুনানি এখনও বাকি। এক জেলা-কর্তা বলেন, “একটি পার্ট বা অংশে কমবেশি ১৫০ জন ভোটার থাকলে, তাঁদের শুনানির জন্য মাথাপিছু দু’মিনিট করে বরাদ্দ হলেও, তিন ঘণ্টার বেশি লেগে যাচ্ছে। ফলে পরিস্থিতি ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠেছে।”
জেলা-কর্তাদের অনেকে জানান, ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা তথ্যগত গরমিলের আওতায় থাকা ভোটারদের সংখ্যা আগের থেকে বাড়ছে বিধানসভা কেন্দ্র অনুযায়ী। ফলে নতুন করে শুনানিও বাড়ছে। এর উপর নানা ধরনের নথি বাতিল হওয়ার কারণে সেই আবেদনগুলি নতুন করে খতিয়ে দেখতে হচ্ছে। বহু জায়গায় ডমিসাইল শংসাপত্র দাখিল করা হয়েছিল। কিন্তু রাজ্য স্বরাষ্ট্র দফতর যখন রিপোর্ট দিয়ে জানিয়ে দেয়, সেই শংসাপত্র সবার জন্য নয়, শুধু তা সেনা-আধাসেনায় অবাঙালি চাকুরিপ্রার্থীদের জন্য, তখন তা আর গ্রাহ্য করা যায়নি। আচমকা মাধ্যমিকের অ্যাডমিট কার্ড বাতিলে সমস্যা অনেকটাই বেড়েছে। অনেকে এই নথিগুলি দাখিল করেছিলেন ইতিমধ্যেই। সংশ্লিষ্টদের কাছে আর কী নথি রয়েছে, তার খোঁজ করতে হচ্ছে। ছোটখাটো ভুলত্রুটি বিএলও স্তরে মিটিয়ে দেওয়ার কথা কমিশনের তরফে আগে বলা হলেও, সেই সব ক্ষেত্রেও ভোটারেরা শুনানির নোটিস পাচ্ছেন। ফলে বোঝা যাচ্ছে, কমিশন সেই অবস্থান থেকেও সরে এসেছে।
জেলা প্রশাসনগুলি জানাচ্ছে, কমিশনের নির্দেশ ছিল, শুনানিতে জমা পড়া নথি সংশ্লিষ্ট দফতর বা বিভাগে পাঠিয়ে বৈধতা পৃথক ভাবে যাচাই করতে হবে। একটি নথি কোনও দফতরে পাঠালে সঙ্গে সঙ্গে তারা বৈধতার রিপোর্ট দেবে, এমন ভাবার কারণ নেই। কোনও কারণে এক-দু’দিন সে কাজে লেগে গেলে পুনর্যাচাইয়ের নথির পাহাড় জমছে। তা হাতে না পাওয়া পর্যন্ত ভোটারের যোগ্যতা যাচাইও অসম্পূর্ণ থেকে যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলাশাসকদের স্তরে বকেয়া পুনর্যাচাইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৪ লক্ষ। পুনর্যাচাই করা গিয়েছিল মাত্র ৪৭ হাজারের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)