কোভিড হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়েছিলেন বৃদ্ধ। তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় হাসপাতালই। কিন্তু যে অ্যাম্বুল্যান্সে বৃদ্ধকে পাঠানো হয়েছিল, তার চালক বাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে রাস্তার পাশে বৃদ্ধকে নামিয়ে রেখে চলে যান বলে অভিযোগ। বাড়ির লোক রাতের দিকে জলকাদা মাখা অবস্থায় বৃদ্ধের খোঁজ পান। অ্যাম্বুল্যান্স চালক কেন এমন কাণ্ড ঘটালেন, তা খতিয়ে দেখছে স্বাস্থ্য দফতর।
করোনা-আবহে রাজ্য জুড়ে অ্যাম্বুল্যান্স পেতে নাজেহাল হতে হচ্ছে অনেককেই। চালকদের ব্যবহার নিয়েও বহু অভিযোগ উঠছে। অশোকনগরের ঘটনাও সে দিকে ইঙ্গিত করছে। প্রশ্ন উঠেছে, করোনা রোগীর প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার জন্য রাজ্য জুড়ে নানা ভাবে যে প্রচার চলছে, তা আদৌ কতটা কাজে আসছে, তা নিয়েও। করোনা-আক্রান্ত হলে রোগী ও তাঁর পরিবারকে কার্যত একঘরে করে রাখার বহু অভিযোগ উঠেছে। হেনস্থার মুখে পড়তে হয়েছে করোনা-যুদ্ধে সামনে থেকে লড়াই করা পুলিশ, চিকিৎসক, প্রশাসনিক কর্মীদেরও।
অশোকনগরে ঠিক কী ঘটেছিল? আটষট্টি বছরের নির্মল দাসের বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ১৯ নম্বর কাঁকপুল এলাকায়। তিনি প্রাক্তন কাউন্সিলর। ১৬ জুলাই তাঁর করোনা রিপোর্ট পজ়িটিভ আসে। ১৮ তারিখ ভর্তি করা হয় বারাসত জেএনআরসি কোভিড হাসপাতালে।
শুক্রবার সেখান থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি আসার পথেই এই কাণ্ড। নির্মলের ছেলে মলয় বলেন, ‘‘বিকেল সাড়ে ৫টার সময়ে হাসপাতালে কন্ট্রোল রুম থেকে ফোনে বলা হয়, বাবাকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা জানাই, হঠাৎ গাড়ি জোগাড় করা মুশকিল। তখন হাসপাতাল থেকে জানানো হয়, তাঁরাই ব্যবস্থা করছেন।’’
মলয়ের দাবি, সন্ধে সাড়ে ৭টা নাগাদ হাসপাতালের কন্ট্রোল রুমে ফোন করেন। জানানো হয়, অ্যাম্বুল্যান্স বৃদ্ধকে নিয়ে রওনা দিয়েছে। নির্মলের কাছে ফোন না থাকায় অ্যাম্বুল্যান্স চালকের নম্বর জানতে চেয়েছিলেন মলয়। তা দেওয়া হয়নি বলেই তাঁর দাবি। রাত ১০টার পরেও নির্মল বাড়ি না ফেরায় চিন্তিত হয়ে পড়েন বাড়ির লোকজন। ইতিমধ্যে লোকমুখে তাঁরা জানতে পারেন, ৩ নম্বর রেলগেট এলাকায় রাস্তার ধারে নির্মলকে শুয়ে থাকতে দেখা গিয়েছে।
খবর পেয়ে পুরসভার প্রাক্তন দুই কাউন্সিলর সঞ্জয় রাহা এবং অনুপ রায়ের তৎপরতায় পুরসভার অ্যাম্বুল্যান্স গিয়ে নির্মলকে উদ্ধার করে বাড়ি পৌঁছে দেয়। সঞ্জয় অ্যাম্বুল্যান্স চালকের বিরুদ্ধে অশোকনগর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছেন। সঞ্জয় বলেন, ‘‘নির্মলদার শরীর খুবই দুর্বল। ভাল ভাবে কথা বলতে পারছেন না। এই অবস্থায় ওঁকে যে ব্যবহার পেতে হল, তা সত্যিই অমানবিক।’’
স্বাস্থ্য দফতরের একটি সূত্র জানাচ্ছে, কোভিড রোগীর ছুটির পরে বাড়ির লোক অনেক সময়ে গৃহনিভৃতবাসে থাকেন। ফলে তাঁরা ছুটির সময়ে আসতে পারেন না। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই অ্যাম্বুল্যান্সে করে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। এ ক্ষেত্রেও তা-ই করা হয়েছিল। কিন্তু চালকের কোনও নম্বর কেন পরিবারের কাছে দেওয়া হল না, হাসপাতালের কোনও কর্মীকে কেন বৃদ্ধের সঙ্গে পাঠানো হল না, সে প্রশ্নও করছে পরিবার।
নির্মল ভাল ভাবে কথা বলার মতো অবস্থায় নেই। তবে জানাতে পেরেছেন, চালকের পিপিই কিট পরা ছিল। অ্যাম্বুল্যান্স থেকে নেমে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, এটা তাঁর বাড়ির এলাকা নয়। সে কথা চালককে জানিয়েছিলেন। কিন্তু তার পরেও তাঁকে অন্ধকার রাস্তার ধারে দাঁড় করিয়ে চলে যান চালক। এক সময়ে দুর্বল বোধ করতে থাকায় পথের ধারেই শুয়ে পড়েন নির্মল।
চালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন মলয়। জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক তাপস রায় বলেন, ‘‘তদন্ত চলছে। দোষ প্রমাণ হলে কঠোর পদক্ষেপ করা হবে।’’