Advertisement
E-Paper

নির্বাচন ঘোষণার দিন থেকে শুরু করে ৪৪ দিনে ৬৮ বার ইডির তল্লাশি চলল রাজ্যে! কোন কোন মামলায় এবং কোথায় কোথায়?

ভোট ঘোষণার আগেও রাজ্যে অভিযান জারি ছিল ইডির। জানুয়ারিতে আই-প্যাকের অফিসে অভিযান চালায় ইডি। যা নিয়ে মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। তার পরেও সহারা মামলায় ভিন্‌ রাজ্যে তল্লাশি চালায় ইডি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ১৭:৫৮

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

ভোট ঘোষণার পর দিন থেকে রাজ্যে তল্লাশি অভিযানে নামে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। প্রসঙ্গত, গত ১৫ মার্চ পশ্চিমবঙ্গে ভোট ঘোষণা হয়। তার পর গত ৪৪ দিনে বিভিন্ন দুর্নীতি মামলায় ৬৮টি তল্লাশি চালিয়েছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী ওই সংস্থা, এমনই জানা গিয়েছে তাদের প্রকাশিত তথ্য থেকে। মূলত সাইবার প্রতারণা, রেশন দুর্নীতি, জমি দুর্নীতি, সোনা পাপ্পু মামলা— সব ক’টি মামলাতেই ইডির কলকাতার দফতর থেকে অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ভোটের আগেও ইডির অভিযান জারি ছিল। কিন্তু ভোট ঘোষণার পর অল্প সময়ের মধ্যে যে পরিমাণ তল্লাশি চালানো হয় তা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

সাইবার প্রতারণা মামলা—

১৬ মার্চ: ভোট ঘোষণার পরের দিন থেকেই রাজ্যে বিভিন্ন দুর্নীতি মামলার তদন্তে নামে ইডি। ১৬ মার্চ কলকাতায় প্রথম তল্লাশি অভিযানে নামে তারা। টেকনোসোলিস কলসেন্টার দুর্নীতি মামলায় কলকাতা, হাওড়া, শিলিগুড়ি এবং দুর্গাপুর-সহ ১৬টি তল্লাশি অভিযান চালিয়েছিল কেন্দ্রীয় সংস্থাটি। এই তল্লাশি অভিযানে স্থায়ী আমানত, সোনার কয়েন, ক্রিপ্টোকারেন্সি মিলিয়ে মোট আড়াই কোটির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন তদন্তকারী আধিকারিকেরা। এ ছাড়াও হোটেল, জমি, রিসর্ট-সহ ২০ কোটির স্থাবর সম্পত্তিরও হদিস পান তাঁরা। যাোর সঙ্গে বিভিন্ন অপরাধের যোগসূত্র মিলেছে বলে ইডি সূত্রের খবর। ওই অভিযানেই শিলিগুড়ি থেকে দু’টি বাংলাদেশি পাসপোর্ট, চারটি দামি গাড়ি এবং ৮৮টি বিদেশি মদের বোতল বাজেয়াপ্ত করা হয়।

জমি দখল মামলা—

২৮ মার্চ: কলকাতার সাতটি জায়গায় তল্লাশি অভিযানে গিয়েছিল ইডি। ২০২৩ সালে জমি দখল, প্রতারণা, ভুয়ো নথির অভিযোগে ব্যবসায়ী অমিত গঙ্গোপাধ্যায়ের নামে দক্ষিণ ২৪ পরগনা-সহ রাজ্যের বেশ কয়েকটি থানায় ২০টি এফআইআর দায়ের করে পুলিশ। সেই এফআইআরের ভিত্তিতে আলাদা করে মামলা করে তদন্ত শুরু করে ইডি। ঘটনাচক্রে, এই মামলায় রাসবিহারীর তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস কুমারকে তলব করে ইডি। দু’বার গিয়েছিলেন তৃণমূল প্রার্থী দেবাশিস। এর পর ১৭ এপ্রিল দেবাশিসের বাড়িতে আয়কর দফতর হানা দেয়। তবে এই মামলার সঙ্গে আয়কর হানার কোনও যোগসূত্র নেই।

সোনা পাপ্পু মামলা—

১ এপ্রিল: দক্ষিণ কলকাতার ব্যবসায়ী বিশ্বজিৎ পোদ্দার ওরফে সোনা পাপ্পুর বাড়িতে তল্লাশি অভিযান চালায় ইডি। সোনা পাপ্পুর বাড়ি, বালিগঞ্জের একটি সংস্থা-সহ মোট আট জায়গায় তল্লাশি চালানো হয়। সোনা পাপ্পুর সূত্র ধরে বেহালার ব্যবসায়ী জয় কামদারের বাড়িতেও যায় ইডি। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ওই দিনের তল্লাশিতে ১.৪৭ কোটি নগদ পাওয়া যায়। সোনা ও রুপো মিলিয়ে ৬৭.৬৪ লক্ষ টাকার গয়না বাজেয়াপ্ত হয়। এ ছাড়াও বিভিন্ন নথি, সোনা পাপ্পুর বাড়ি থেকে একটি রিভলভার, গাড়ি উদ্ধার করা হয়। বন্দুকটি পুলিশের হাতে তুলে দেয় ইডি। অস্ত্র মামলা-সহ একাধিক ধারায় সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে একাধিক এফআইআর ছিল। তার ভিত্তিতে তদন্ত হয় বলে দাবি ইডির। তোলাবাজি, জমি-বাড়ি দখল, বেআইনি নির্মাণের মাধ্যমে টাকা আয়ের অভিযোগ রয়েছে সোনা পাপ্পুর বিরুদ্ধে, দাবি ইডির। প্রসঙ্গত, গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে গোলপার্কের কাঁকুলিয়ায় গুলি চলার ঘটনা ঘটে। সেই ঘটনায় নাম জড়ায় সোনা পাপ্পুর। তার পর থেকে তিনি পলাতক।

১৯ এপ্রিল: সোনা পাপ্পুর মামলায় এই দিন কলকাতা, ব্যারাকপুর মিলিয়ে ছ’জায়গায় তল্লাশিতে যায় ইডি। তারম মধ্যে ছিল কলকাতার ডেপুটি পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শান্তনু সিন্‌হা বিশ্বাস এবং জয়ের বাড়িও। ওই দিন জয়কে গ্রেফতার করে ইডি। তদন্তে উঠে এসেছে, সোনা পাপ্পুর সঙ্গে জয়ের বিপুল আর্থিক লেনদেন হয়। হাওয়ালার মাধ্যমে বিদেশে টাকা লেনদেন করতেন জয়। তাঁর সঙ্গে শান্তনু-সহ পুলিশ আধিকারিকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগ ছিল বলে দাবি ইডির। এক পুলিশকর্তাকেও তলব করা হয়েছে বলে ইডি সূত্রে খবর। আতশকাচের তলায় জয়ের সংস্থাও। বিভিন্ন পুলিশকর্তাদের সঙ্গে সম্পর্ক, উপহার দেওয়ারও তথ্য পাওয়া গিয়েছে। পুলিশ অফিসারদের সঙ্গে যোগ থাকার সুবিধা নিয়ে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে জয়েরর বিরুদ্ধে।

২৬ এপ্রিল: কলকাতার তিন জায়গায় তল্লাশি অভিযানে যায় ইডি । তার মধ্যে ছিল আলিপুর, আনন্দপুরের ব্যবসায়ী কল্যাণ শুক্ল এবং সঞ্জয় কুমার কানোরিয়ার ঠিকানাও। জয়ের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া ডিজিটাল ডিভাইসের তথ্যের সূত্র ধরে তল্লাশি করে ইডি। তল্লাশিতে ওই ১০ লক্ষ নগদ, গয়না, নথি উদ্ধার হয়েছে।

রেশন মামলা—

১০ এপ্রিল: ইডি তল্লাশি চালায় কলকাতা, বনগাঁ, মুর্শিদাবাদ, রানিগঞ্জ, হাবড়ার ১৭ জায়গায়। ইডি দাবি করে, এটি একটি সংগঠিত চক্র। এই অভিযানে ৩০.৯ লক্ষ টাকা উদ্ধার হয়। প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে বসিরহাট থানায় মামলা দায়ের করে শুল্ক দফতর। রেশনের গম বাংলাদেশে পাচার করার চেষ্টার অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। সেই সময় তিন জনকে গ্রেফতার করে পুলিশ। চার্জশিটও দেয় তারা। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ইডি একটি আলাদা মামলা করে তদন্ত শুরু করে। ২০২০ সালে অভিযোগ হয়, ৫১০১ মেট্রিক টন গম ১৭৫ ট্রাকে পাচার করার সময় ধরা হয়েছিল বিভিন্ন জায়গা থেকে। বেশির ভাগ নথিগুলি ভুয়ো ছিল।

২৫ এপ্রিল: এই মামলায় ১১টি জায়গায় তল্লাশি চালায় ইডি। কলকাতা, হাবড়া, বর্ধমানে তল্লাশি চলে। এই অভিযানে ১৮.৪ লক্ষ টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়। ১৭ এবং ২৫ এপ্রিলের তল্লাশি মিলিয়ে মোট ৪৯.৩ লক্ষ উদ্ধার হয়।

গত ৮ জানুয়ারি আই-প্যাক কর্তা প্রতীক জৈনের বাড়ি এবং অফিসে অভিযান চালায় ইডি। যা নিয়ে মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। সেই মামলা এখনও চলছে। ইডির প্রকাশিত তথ্য় থেকে জানা গিয়েছে, ফেব্রুয়ারিতে সহারা মামলায় অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক এবং ওড়িশায় তল্লাশি হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে কয়লা পাচার মামলায় দুর্গাপুর, আসানসোলে তল্লাশি চালায়। তার পর গত মার্চে বুদবুদের প্রাক্তন ওসি মনোরঞ্জন মণ্ডলের বাড়িতে ইডি তলবের নোটিস সেঁটে দিয়ে আসে।

তার পর এপ্রিলে রিয়েল এস্টেট সংস্থা সংক্রান্ত মামলায় তল্লাশি চালায় ইডি। এ ছাড়াও নিয়োগ দুর্নীতি মামলাল প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় এবং প্রসন্ন রায়ের বাড়ি যায়। পার্থের বাড়ি গিয়ে তাঁর বয়ান নেন তদন্তকারীরা। তৃণমূলের দুই বিদায়ী মন্ত্রী সুজিত বসু এবং রথীন ঘোষকেও পুর নিয়োগ মামলাতেও এপ্রিলে তলব করে ইডি। অন্য দিকে, তৃণমূলের প্রাক্তন সাংসদ নুসরত জাহানকে ফ্ল্যাট প্রতারণা মামলায় তলব এ মাসেই করেছিল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাটি।

প্রসঙ্গত, ভোট ঘোষণার পরে ইডি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠায় শাসকদল তৃণমূল কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলে। বিভিন্ন নির্বাচনী সভা থেকে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ইডি তদন্ত নিয়ে বার বার আক্রমণ শানাতে শোনা গিয়েছে। তৃণমূল বার বারই অভিযোগ তুলেছে, যখনই ভোট আসে, তখনই ইডি, সিবিআইকে কাজে লাগায় কেন্দ্র। বিরোধী দলগুলিকে চাপে রাখতে এই কৌশল নেয় তারা। ভোটের মধ্যে ইডির তদন্ত নিয়ে শাসকদল অভিযোগের আঙুল তুলেছে, কিন্তু ইডির দাবি, যখন যে রকম তদন্ত হচ্ছে, সে রকম ভাবে তল্লাশি চলছে।

ED
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy