এসএসসি-র নিয়োগে চিহ্নিত ‘দাগি’-দের কাছ থেকে বেতনের টাকা ফেরত নিতে জেলাশাসকদের (ডিএম) নির্দেশ দিয়েছে শিক্ষা দফতর। আদালত অবমাননার মামলায় সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে এ কথা জানিয়েছে শিক্ষা দফতর। সূত্রের খবর, গত ৩১ ডিসেম্বর সব জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে বলা হয়েছে যে ‘দাগি’ হিসেবে চিহ্নিত শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের কাছ থেকে বেতনের টাকা ফেরত নিতে হবে। এ ব্যাপারে জেলাশাসকেরা নিজের জেলার স্কুল পরিদর্শককে (ডিআই) ওই শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের চিহ্নিত করবেন এবং পরবর্তী পদক্ষেপ করবেন। অনেকের পর্যবেক্ষণ, কত দিনের মধ্যে এই পদক্ষেপ করা হবে, তা নিয়ে কোনও স্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই। রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে আদৌ প্রশাসন এই পদক্ষেপ করতে কতদূর সক্রিয় হবে, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে।
প্রসঙ্গত, পরিকল্পিত দুর্নীতি ও সামগ্রিক অনিয়মের জেরে ২০১৬ সালের স্কুলশিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী (গ্রুপ-সি ও গ্রুপ-ডি) নিয়োগ বাতিল করেছিল সুপ্রিম কোর্ট। তার মধ্যে দাগি হিসেবে চিহ্নিতদের কাছ থেকে বেতনের টাকা পুনরুদ্ধার করতেও বলেছিল। সেই নির্দেশ কার্যকর না-হওয়ায় আদালত অবমাননার মামলা দায়ের করেছিলেন বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীরা। সেই মামলাতেই হলফনামা দিয়েছে শিক্ষা দফতর।
বুধবার সুপ্রিম কোর্টে এই মামলার শুনানি ছিল। বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের আইনজীবীরা শিক্ষা দফতরের পাল্টা হলফনামা দেওয়ার জন্য সময় নিয়েছেন। পরবর্তী শুনানি ২৫ মার্চ। বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের আইনজীবী সুদীপ্ত দাশগুপ্ত বলেন, “এই হলফনামায় দেওয়া তথ্যে অসঙ্গতি আছে। তাই পাল্টা হলফনামা দেওয়া হবে।” তাঁর বক্তব্য, ‘দাগি’ তালিকাই পুরো প্রকাশ করেনি এসএসসি। কারণ, ওয়েটিং লিস্টেও অনেকে ‘দাগি’ ছিলেন। সেই নাম তো সামনে আসেনি। তাঁদের নাম এ বারের নিয়োগ তালিকায় আছে। তাই কোন তালিকার ভিত্তিতে টাকা ফেরত নেওয়া হবে, সেটাই তো প্রশ্ন। পাশাপাশি তাঁর আরও যুক্তি, সুপ্রিম কোর্ট পরীক্ষার উত্তরপত্র (ওএমআর শিট) প্রকাশ করতে বলেছিল। তা-ও প্রকাশ করা হয়নি।
অনেকের অবশ্য পর্যবেক্ষণ, গোড়া থেকেই রাজ্য সরকার যেন ‘কিছুই দুর্নীতি হয়নি’ এই মনোভাব নিয়ে চলছিল। এই মামলায় প্রথমে হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় প্রায় সাড়়ে পাঁচ হাজার (পরবর্তী সময়েও যাঁরা ‘দাগি’ হিসেবে চিহ্নিত) শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই নির্দেশের বিরুদ্ধে ডিভিশন বেঞ্চে যায় রাজ্য ও এসএসসি এবং সওয়াল-জবাব শেষে পুরো নিয়োগ বাতিল করে ডিভিশন বেঞ্চ এবং ‘দাগি’-দের কাছ থেকে টাকা উদ্ধারের নির্দেশ দেয়। পরবর্তী কালে সুপ্রিম কোর্টও কার্যত সেই রায় বহাল রাখে। সেই টাকা উদ্ধারে গোড়াতেই অবশ্য রাজ্যকে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। এ বার অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, ২০২৫ সালের এপ্রিলে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে ডিসেম্বরের শেষে জেলাশাসকদের দেওয়া শিক্ষা দফতরের এই চিঠি কি আদৌ সক্রিয়তার লক্ষণ? নাকি আদালতের রোষ থেকে বাঁচতে সাময়িক পদক্ষেপ? এই প্রসঙ্গেই বঞ্চিত চাকরিপ্রার্থীদের অন্যতম আইনজীবী ফিরদৌস শামিম বলেন, “কোর্টের নির্দেশ কার্যকর করার দায়িত্ব এ বার জেলাশাসকদের ঘাড়ে কার্যত ঠেলে দিয়েছে শিক্ষা দফতর। নির্দেশ পালিত না-হলে জেলাশাসকেরা দায়বদ্ধ হবেন।”
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)