এ বার সুপ্রিম কোর্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে ঘুঁটি সাজাতে শুরু করল নির্বাচন কমিশন। পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এর জন্য নির্বাচন কমিশনের কাজে নিযুক্ত আধিকারিকদের ‘প্রাণের ভয়’-এর মুখে পড়তে হচ্ছে বলে কমিশনের আর্জি, বিভিন্ন গ্রামে পঞ্চায়েত ভবনের বদলে নিরাপদ স্থানে শুনানি সরানো হোক। গত ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট পঞ্চায়েত ভবনে এসআইআর-এর শুনানির যে নির্দেশ দিয়েছিল, তা বদলানো হোক।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর নিয়ে প্রশ্ন তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিলেন। সোমবার সেই মামলার ফের শুনানি। গত বুধবার মমতা নিজে সুপ্রিম কোর্টে এসে নির্বাচন কমিশনকে তোপ দেগে সওয়াল করে গিয়েছেন। শুনানির পরবর্তী পর্যায়ে আইনজীবীরাই সেই দায়িত্ব পালন করবেন। মামলার আইনি দিক এবং পরিস্থিতি বিবেচনা করে এ বার মমতার দিল্লি যাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ বলেই শনিবার রাত পর্যন্ত খবর। তবে সোমবারের শুনানির আগে নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে হলফনামা দিয়ে অভিযোগ তুলেছে, পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর-এ নির্বাচন কমিশনের কাজে নিযুক্তরা কাজ করতে গিয়ে প্রাণের ভয় পাচ্ছেন। এমনই পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তার ফলে অনেকেই এসআইআর-এর কাজ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
এই প্রাণের ভয়ের যুক্তিতেই নির্বাচন কমিশন সুপ্রিম কোর্টে আর্জি জানিয়েছে, পঞ্চায়েত ভবনের বদলে নিরাপদ স্থানে এসআইআর-এর শুনানি সরাতে দেওয়া হোক। গত ১৯ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছিল, নির্বাচন কমিশন রাজ্যের প্রায় ১ কোটি ৩৬ লক্ষ মানুষকে তথ্যগত অসঙ্গতির (লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি) জন্য যে নোটিস পাঠাচ্ছে, তার শুনানি পঞ্চায়েত ভবনে হোক। একই সঙ্গে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করার জন্যও সুপ্রিম কোর্টে রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছিল।
কমিশনের যুক্তি, রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে গ্রামের পঞ্চায়েত ভবন শুনানির উপযুক্ত নয়। সুপ্রিম কোর্টের ১৯ জানুয়ারির নির্দেশের পরেই ২২ জানুয়ারি ইটাহার থেকে অভিযোগ মিলেছে, এসআইআর-এর শুনানির সময় হামলা হয়েছে। ফরাক্কা, চাকুলিয়াতেও ব্লক অফিসে হামলা হয়েছে। ফরাক্কায় হামলার জেরে মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা গুরুতর আহত হয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট রাজ্য পুলিশকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বললেও ঘটনাস্থলে কোনও পুলিশ ছিল না। কোনও প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সহায়তাও মেলেনি। মাইক্রো অবজ়ার্ভাররা বাধ্য হয়ে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
তাৎপর্যপূর্ণ হল, বুধবার যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সুপ্রিম কোর্টে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক সওয়াল করছিলেন, সে সময় কেন্দ্রীয় সরকারের হয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা দাবি তোলেন, এই সব মামলার সঙ্গে সনাতনী সংসদের মামলাটিরও শুনানি হওয়া প্রয়োজন। সেই মামলায় নির্বাচন কমিশন রাজ্যে এসআইআর-কে ঘিরে হিংসার পরিস্থিতি সম্পর্কে জানিয়েছে। সনাতনী সংসদ নামের একটি সংগঠন সুপ্রিম কোর্টে বিএলও-দের উপরে হামলা-হুমকির বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেছিল।
এই মামলাতেই নির্বাচন কমিশন হলফনামা দিয়ে সুপ্রিম কোর্টে অভিযোগ জানিয়েছিল, বিএলও-সহ নির্বাচনী আধিকারিকরা পশ্চিমবঙ্গে হামলা, হুমকির মুখে পড়ছেন। হলফনামায় কমিশন লিখেছে, এ জন্য মমতার ‘উস্কানিমূলক’ বিবৃতি দায়ী। তিনি সাংবাদিক সম্মেলন করে আতঙ্ক তৈরি করেছেন। এসআইআর প্রক্রিয়া নিয়ে বিভ্রান্তিকর ও ভুলে ভরা তথ্য ছড়িয়েছেন। নির্বাচন আধিকারিকদের নিশানা করেছেন, প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন এবং ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরির চেষ্টা করেছেন। এক জন মাইক্রো অবজ়ার্ভারকে নির্দিষ্ট ভাবে চিহ্নিত করে নিশানা করেছেন। ফলে অবাধ, নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা সংশোধনের জন্য কাজের পরিবেশ বিষিয়ে উঠছে।
সোমবার সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের বেঞ্চে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কবি জয় গোস্বামী, তৃণমূলের ডেরেক ও’ব্রায়েন, দোলা সেন, প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারের মামলা শুনানির তালিকাভুক্ত হয়েছে। তার সঙ্গে সনাতনী সংসদের মামলাও তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই মামলায় কমিশন হলফনামা দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ করেছে, তা সোমবার নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে বলে আইনজীবীদের মত। কারণ, এই মামলায় কেন্দ্রীয় সরকারকেও অংশীদার করা হয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)