মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যতই দাবি করুন, এসআইআর-এর শুনানি কক্ষে তৃণমূল বা অন্য কোনও দলেরই বুথ স্তরের এজেন্ট বা বিএলএ-২-দের ঢুকতে দেওয়া হবে না। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন নিজের অবস্থান থেকে নড়ছে না। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, যদি বিএলএ-দের প্রবেশাধিকার দিতে হয়, তা হলে পশ্চিমবঙ্গে আটটি রাজনৈতিক দল থেকে এক জন করে বিএলএ-কে ঢোকার অনুমতি দিতে হবে। কারণ, পশ্চিমবঙ্গে ছ’টি জাতীয় ও দু’টি রাজ্য স্তরে স্বীকৃত রাজনৈতিক দল রয়েছে। যদি শুনানি কক্ষে ভোটারদের সঙ্গে আরও আট জন ঢুকে যায়, তা হলে ইআরও-দের পক্ষে কাজ করাই সম্ভব হবে না।
একই ভাবে নির্বাচন কমিশন মনে করছে, তৃণমূলের দাবি মেনে যে সব ষাট বছরের বেশি বয়স্ক বা গুরুতর অসুস্থ ভোটারের ক্ষেত্রে তথ্যের অসঙ্গতি মিলেছে, তাঁদের সকলের বাড়ি গিয়ে তথ্য-নথি যাচাই করা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই ৮৫ বছরের বেশি বয়সিদের জন্য বাড়ি গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বুধবার তৃণমূল নেতৃত্ব দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের কাছে দাবি তুলেছিলেন, ষাট বছরের বেশি বয়সি ও গুরুতর অসুস্থদের ক্ষেত্রেও এই সুবিধা দেওয়া হোক। কমিশন সূত্রের যুক্তি, ৮৫ বছরের বেশি বয়সিদের ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে ভোটগ্রহণ করানো হয়। কিন্তু ষাটোর্ধ্ব সকলের ক্ষেত্রে বাড়ি গিয়ে শুনানির ব্যবস্থা করতে যে লোকবল দরকার, তা নেই। কে গুরুতর অসুস্থ, কে নয়, তার মাপকাঠি নির্ধারণ করাও কঠিন। তবে একান্তই কেউ শুনানিতে আসতে না পারলে, ইআরও প্রয়োজন মাফিক ব্যবস্থা নেবেন। প্রয়োজনে বিএলও-দের খোঁজ করতে পাঠানো হবে। যদিও নিয়ম অনুযায়ী নোটিস পেয়েও না এলে নাম বাদ যাওয়ার কথা।
তৃণমূলের দাবি ছিল, পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রে তথ্যের অসঙ্গতিতে নোটিস জারি হলে তাঁদের রুটিরুজি ছেড়ে রাজ্যে ফিরতে হবে। তাঁরা না এলে নাম বাদ চলে যাবে। সে ক্ষেত্রে বাড়ির অন্য কাউকে শুনানিতে ডাকা হোক বা অনলাইনে শুনানির ব্যবস্থা হোক। কমিশন সূত্রের বক্তব্য, বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য অনলাইনে শুনানি ও তথ্য যাচাই করা মুখে বলা যতটা সহজ, বাস্তবে ততটাই কঠিন।
বুধবার তৃণমূলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনারদের আড়াই ঘণ্টা বৈঠকে তৃণমূলের তরফে কমিশনের কাছে যে সব দাবিদাওয়া ও অভিযোগ তোলা হয়েছিল, নির্বাচন কমিশন তা খতিয়ে দেখেছে। যেমন, অভিষেকের অভিযোগ ছিল, যে সব ক্ষেত্রে ভোটারের তথ্যের ধোঁয়াশা দেখা গিয়েছে, সেখানে, এইআরও-দের সামনে চারটি বিকল্প থাকছে। এক, নোটিস জারি করা। দুই, ডিইও বা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া। তিন, ‘ফাউন্ড ওকে’ বা তথ্যের ধোঁয়াশা নেই জানানো। চার, অযোগ্য বলে দাগানো। অভিষেকের অভিযোগ ছিল, ‘ফাউন্ড ওকে’ বলে নথিবদ্ধ করা হলেও সেখানে নোটিস জারি হচ্ছে। কমিশন সূত্রের খবর, তৃণমূলের দেওয়া ১০ পৃষ্ঠার চিঠিতেও এই অভিযোগ ছিল। তার পরে নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি দফতরের বিশেষজ্ঞদের বলা হয়, কোনও প্রযুক্তিগত ত্রুটি রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে। কিন্তু কোনও ত্রুটি মেলেনি।
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যে একাধিক বার নির্বাচন কমিশনকে নিশানা করে প্রশ্ন তুলেছেন, কোন আইনে শুনানি কক্ষে বিএলএ-দের ঢুকতে দেওয়া হবে না? বুধবার অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রতিনিধি দল দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কাছে এই দাবি তোলে। তৃণমূল সূত্রের খবর,অভিষেক এই দাবি তোলার সময়ই মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে তাঁর উত্তপ্ত বাক্য-বিনিময় হয়। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনার তখনই ব্যাখ্যা করে জানিয়ে দেন, বিএলএ-দের শুনানি কক্ষে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের বক্তব্য, বাংলার খসড়া তালিকায় ৫৮ লক্ষ নাম বাদের পরেও ৭ কোটির উপরে ভোটারের নাম রয়েছে। অথচ রাজনৈতিক দলগুলির থেকে এখনও মাত্র ৮টি অভিযোগ-দাবি জমা পড়েছে। তৃণমূল তিনটি, সিপিএম দু’টি, বিজেপি, বিএসপি, ফরোয়ার্ড ব্লক একটি করে অভিযোগ জমা দিয়েছে। যে দলের বিএলএ-রা শুনানিতে থাকতে চাইছেন, তাঁরা ভুলক্রমে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়া মানুষের সাহায্যে অভিযোগ জমা দিচ্ছেন না কেন?
অভিষেক কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন, সব রাজ্য বাদ দিয়ে শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গে মাইক্রো অবজ়ার্ভার নিয়োগ করা হয়েছে। যদিও পশ্চিমবঙ্গে খসড়া তালিকায় নাম বাদের হার অন্য রাজ্যেরতুলনায় কম। এটা রাজ্যকে কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা বলেও অভিষেকের অভিযোগ ছিল। নির্বাচন কমিশন সূত্রের বক্তব্য, নিয়ম মাফিক মহকুমা শাসকদের ইআরও নিয়োগ করার কথা। কিন্তু রাজ্য সরকার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার নিচু স্তরের রাজ্য সরকারি আধিকারিকদের নিয়োগ করেছে। এইআরও-দের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। তাই কমিশনকে কেন্দ্রীয় সরকারি আধিকারিকদের মাইক্রো অবজ়ার্ভার হিসেবে নিয়োগ করতে হয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ইআরও, এইআরও-রাই নেবেন। তবে কোথাও বেনিয়ম দেখলেমাইক্রো-অবজ়ার্ভাররা নির্বাচন কমিশনের কাছে লিখিত ভাবে রিপোর্ট জমা দেবেন।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)