এখন লোকসভায় পশ্চিমবঙ্গের আসন সংখ্যা ৪২টি। উত্তরপ্রদেশের ৮০টি। দুই রাজ্যের মধ্যে লোকসভা আসনের ফারাক ৩৮টি। মোদী সরকার ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনেই মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করতে জনগণনার আগেই, এখন লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস করতে চাইছে। মোদী সরকারের সূত্র হল, লোকসভার মোট আসন, সব রাজ্যেরই লোকসভা আসন ৫০ শতাংশ করে বাড়িয়ে দেওয়া হবে। সেই অনুযায়ী পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসন ৪২টি থেকে বেড়ে হবে ৬৩টি। উত্তরপ্রদেশের লোকসভা কেন্দ্রের সংখ্যা ৮০ থেকে বেড়ে ১২০টি হবে। ফলে উত্তরপ্রদেশের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের লোকসভা আসনের ফারাক ৩৮টি থেকে বেড়ে ৫৭টি হবে।
এর ফলে লোকসভায় বিভিন্ন রাজ্যের তুলনামূলক প্রতিনিধিত্বের ভারসাম্য নষ্ট হবে বলে বিরোধী শিবির মনে করছে।
নরেন্দ্র মোদী সরকার স্পষ্ট করে দিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে ভোটগ্রহণের আগেই, ১৬ এপ্রিল থেকে তিন দিনের সংসদ অধিবেশন ডেকে মহিলা সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী বিল পাশ করানো হবে। যে বিলের মাধ্যমে ২০২৭-এর জনগণনার ফলপ্রকাশ ও তার ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাসের অপেক্ষা না করেই, এখনই আসন পুনর্বিন্যাস সেরে ফেলা হবে। তার ভিত্তিতে ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে এক-তৃতীয়াংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করা হবে।
এই ভাবে তাড়াহুড়ো করে আসন পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা করলেও, বিরোধী শিবিরের মুশকিল হল, এর বিরোধিতা করতে গেলে বিজেপি অভিযোগ তুলবে, বিরোধীরা মহিলা সংরক্ষণেরও বিরোধিতা করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, আরজেডি-র মতো দলগুলির কৌশল হল, লোকসভায় মহিলাদের জন্য যে এক-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষিত হবে, তার এক-তৃতীয়াংশ আসন ওবিসি-মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করার দাবি তোলা। সংসদীয় রণকৌশল ঠিক করতে দিল্লিতে ৮ বা ৯ এপ্রিল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা বৈঠক বসবেন। তার পরে ১৬ এপ্রিলের আগে সমস্ত বিরোধী দলের বৈঠক ডাকবে কংগ্রেস। যাতে সংসদে বিরোধীদের সম্মিলিত রণকৌশল তৈরি করা যায়।
শুক্রবার কংগ্রেসের প্রধান মুখপাত্র জয়রাম রমেশ অভিযোগ তুলেছেন, “নির্বাচনী আদর্শ আচরণবিধি লঙ্ঘন করে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে এখনই মহিলা সংরক্ষণ কার্যকর করার ধুয়ো তুলতে চাইছে। গত লোকসভা ভোটের আগে মোদী সরকার একবার মহিলা সংরক্ষণ আইন পাশ করিয়ে কৃতিত্ব নিয়েছে। তখনই কংগ্রেস দাবি তুলেছিল, চব্বিশের ভোটেই মহিলা সংরক্ষণ আইন কার্যকর করা হোক। মোদী সরকার তা করেনি। এখন ৩০ মাস পরে ঘুম থেকে উঠে মোদী সরকার ফের মহিলা সংরক্ষণ নিয়ে সক্রিয়। যাতে নরেন্দ্র মোদী মহিলা ভোটের জন্য পশ্চিমবঙ্গের ভোটে এ নিয়ে প্রচার করতে পারেন।”
কংগ্রেসের অভিযোগ, মোদী সরকারের পরিকল্পনা হল, লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩টি থেকে ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে ৮১৬টি করা হবে। সব রাজ্যের লোকসভা ও বিধানসভার আসন সংখ্যাও ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হবে। এর ফলে দক্ষিণ ভারত, উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ছোট রাজ্যগুলির তুলনামূলক প্রতিনিধিত্ব বাড়বে। যেখানে বিহারের লোকসভা আসন ৪০টি থেকে বেড়ে ৬০টি হবে, সেখানে হিমাচলের লোকসভা আসন ৪টি থেকে বেড়ে মাত্র ৬টি হবে। মণিপুরের লোকসভা আসন ২টি থেকে বেড়ে ৩টি হবে।
মোদী সরকার মহিলা সংরক্ষণ আইনে সংশোধনী বিলের মধ্যেই ২০২৭-এর বদলে ২০১১-র জনগণনার ভিত্তিতে লোকসভার আসন পুনর্বিন্যাস নিয়ে জন্য সংবিধান সংশোধনের বিষয় আনতে পারে। সে ক্ষেত্রে আসন পুনর্বিন্যাসের বিরোধিতা করলেও, মহিলা সংরক্ষণের বিরোধিতা করা কঠিন। তৃণমূল শিবির মনে করছে, এসআইআর-এর ফলে বাংলার বিপুল সংখ্যক মহিলা ভোটারের নাম কাটা গিয়েছে। যা আসলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট। এ বার মহিলা সংরক্ষণের ধুয়ো তুলে বিজেপি মহিলা ভোট নিজেপের ঝুলিতে টানতে চাইছে। সে ক্ষেত্রে তৃণমূল কী অবস্থান নেবে? তৃণমূলের রাজ্যসভার দলনেতা ডেরেক ও’ব্রায়েন বলেন, “তৃণমূলের দলীয় ব্যবস্থা রয়েছে। চেয়ারপার্সন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে সর্বভারতীয় ওয়ার্কিং কমিটি রয়েছে। সেখানে নীতিগত সিদ্ধান্ত হবে। মোদী-শাহ মনে করেন, সংসদটা গুজরাতের জিমখানা ক্লাব। মোদী সরকার যে বিল আনতে চায়, তার খসড়া কোথায়?”
বিরোধীদের একাংশের কৌশল হল, মোদী সরকারকে চাপে ফেলতে ‘কোটার মধ্যে কোটা’-র দাবি তোলা হবে। আরজেডি সাংসজ মনোজ ঝা-র বক্তব্য, “আমরা চাইব, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের মধ্যে ওবিসি-মহিলাদের জন্যও আসন সংরক্ষণ করা হয়।” জয়রাম রমেশ বলেন, ৮১৬ আসনের লোকসভা হলে মহিলাদের জন্য ২৭২টি আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হবে। এর মধ্যে তফসিলি জাতি, জনজাতির মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষিত হবে। তেমনই ওই ২৭২টি আসনের তিন ভাগের এক ভাগ ওবিসি-মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত করতে হবে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)