E-Paper

দুর্বল বর্ষায় প্রবল দুর্যোগ, রাজ্যে মৃত ৫

আবহবিদদের বড় অংশই এই দুর্যোগের পিছনে দুর্বল বর্ষাকে দায়ী করছেন। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের এক উচ্চপদস্থ বিজ্ঞানী বলছেন, মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার কারণে উত্তর-পশ্চিম থেকে শুষ্ক ও তুলনামূলক ঠান্ডা বাতাস বায়ুমণ্ডলের মধ্যস্তরে বইছে।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ২৬ জুন ২০২৬ ০৬:১৭

—প্রতীকী চিত্র।

আকস্মিক গোলার মতো যেন ছুটে এল মেঘ! তার পরেই শুরু হল তুমুল বৃষ্টি এবং বজ্রপাত। বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই এই দুর্যোগ শুরু হয়েছিল কলকাতা-সহ গাঙ্গেয় বঙ্গের একাধিক জেলায়। সাময়িক বিরতি নিয়ে দফায়-দফায় চলেছে বৃষ্টি। জল জমেছে কলকাতা-সহ বিভিন্ন এলাকায়। বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে জনজীবন। মৌলালিতে একটি গাছ ভেঙে পড়েছে। ভাঙড়ের পোলেরহাটে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ ঝড়-বৃষ্টি শুরু হয়। খেতে চাষের কাজ করার সময়ে আচমকা বজ্রপাতে মৃত্যু হয় সাদ্দাম মোল্লা (৩০) নামে এক কৃষকের। পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামেও বাজ পড়ে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। রাতে শ্যামবাজারের কাছে ভিজে ট্রাম রাস্তায় পিছলে পড়ে দু’জন বাইক আরোহী বাসের চাকার নীচে পিষে যান। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁদের নাম নীরজ কুমার (৩৫) এবং উত্তম মালি (৪০)। তাঁরা সম্ভবত পেশায় গিগ কর্মী। আলিপুর আবহাওয়া দফতর জানিয়েছে, বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত কলকাতায় ৮৪.৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। তবে বৃষ্টির থেকেও এ দিন ভয় দেখিয়েছে ঘনঘন তীব্র বজ্রপাত! যা আষাঢ় মাসে গাঙ্গেয় বঙ্গের পরিচিত ছবি নয়। আলিপুর হাওয়া অফিস সূত্রের খবর, আগামী ক’দিন গাঙ্গেয় বঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় এমন পরিস্থিতির আশঙ্কা থাকছে। উত্তরবঙ্গে ভারী বৃষ্টির আশঙ্কা আছে।

আবহবিদদের বড় অংশই এই দুর্যোগের পিছনে দুর্বল বর্ষাকে দায়ী করছেন। কেন্দ্রীয় আবহাওয়া দফতরের এক উচ্চপদস্থ বিজ্ঞানী বলছেন, মৌসুমি বায়ু দুর্বল হওয়ার কারণে উত্তর-পশ্চিম থেকে শুষ্ক ও তুলনামূলক ঠান্ডা বাতাস বায়ুমণ্ডলের মধ্যস্তরে বইছে। এ দিকে বঙ্গোপসাগরে একটি ঘূর্ণাবর্ত থাকায় বঙ্গে জলীয় বাষ্প ঢুকছে। তা বায়ুমণ্ডলের মধ্য ও উচ্চ স্তরে থাকা শুষ্ক এবং অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসেই এমন মেঘপুঞ্জ তৈরি করেছে। এ দিন বজ্রপাতের তীব্রতা ও হার ‘স্বাভাবিক’ নয় বলে জানান কেন্দ্রীয় আবহাওয়া বিভাগের প্রাক্তন ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল গোকুলচন্দ্র দেবনাথ। তাঁর মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে এবং এত তীব্র বজ্রপাত স্মরণাতীত কালে দেখা যায়নি। গোকুলচন্দ্র বলেন, “বাতাসে অতিরিক্ত এরোসলের (ভাসমান কণা) পরিমাণের সঙ্গে তীব্র বজ্রপাতের সম্পর্ক আছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এ দিনের ঘটনা তেমন কিছুর ফল কি না, দেখা প্রয়োজন।”

এ দিন বৃষ্টিতে কলকাতার নানা হাসপাতাল চত্বর জলমগ্ন হয়। এসএসকেএমের স্ত্রী-রোগ বিভাগের বহির্বিভাগ ও অন্তর্বিভাগে জল ঢুকে যায়। চেয়ারের উপরে পা তুলে বসে কাজ সারতে হয় বহির্বিভাগের টিকিট কাউন্টারের কর্মীদের। অর্ন্তবিভাগের ভিতরেও প্রায় হাঁটু জল জমে। ওয়ার্ডে জল ঢুকে নানা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সামগ্রী নষ্টের শঙ্কা করছেন ডাক্তারেরা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানান, স্ত্রী-রোগ বিভাগের বিল্ডিংয়ের বেসমেন্ট সামনের রাস্তা থেকে অনেক নিচু। বেশি বৃষ্টি হলেই জলমগ্ন হয়। রোনাল্ড রস বিল্ডিং চত্বর ও কার্ডিয়োলজি ব্লকের সামনে জল জমে ভোগান্তি হয়। জমা জলে স্ট্রেচারে রোগী নিতে গিয়ে আটকে যেতে হয়েছে। মেন ব্লকের নীচের বেসমেন্টেও জল ঢুকেছিল। পূর্ত দফতর ও দমকল পাম্প চালিয়ে জল পাশের নিকাশি নালায় ফেলেছে। তবে সেখানেও জল ভর্তি থাকায় জল হাসপাতালে ফিরে এসেছে।

কলকাতার পুরসভা সূত্রে খবর, দক্ষিণের নিউ আলিপুর, আলিপুর, এক্সাইড মোড়, ক্যামাক স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট, যাদবপুর, টালিগঞ্জে জল জমেছিল। মধ্য ও উত্তর কলকাতার চিত্তরঞ্জন অ্যাভিনিউ, এম জি রোড, আমহার্স্ট স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, সুকিয়া স্ট্রিট, শ্যামবাজার, হাতিবাগানেও রাস্তা ডোবে। বাদ যায়নি বি টি রোড, ই এম বাইপাস। উত্তর শহরতলির বিধাননগর, সেক্টর ফাইভ, রাজারহাট-নিউ টাউন, দমদমের তিন পুর এলাকায় পাম্প করে জল নামানোর চেষ্টা করেন পুরকর্মীরা। কেষ্টপুর, বাগজোলা, নোয়াই-সহ খালগুলি ভরে থাকায় জল বেরোতে সময় লাগছে। উত্তর দমদম পুর এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেহাল নিকাশির জন্য এই দশা। পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, “করুণাময়ী বাসস্ট্যান্ডে নিকাশির সমস্যা রয়েছে। পরিবহণমন্ত্রীকে জানানো হয়েছে। পুরসভা পাম্প বসিয়ে জল বার করছে। এখনই নিকাশির আমূল পরিবর্তন সম্ভব না-হলেও নালা পরিষ্কার এবং খাল সংস্কার হচ্ছে।”

পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনির ভাতমোড়ে চাষের কাজ করার সময়ে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় কিঙ্কর নন্দীর (৬২)। ঝাড়গ্রামের দুধকুন্ডির ডিহিবাদিনা গ্রামে বজ্রপাতে মৃত্যু হয় সঞ্জয় সিং (২০)-এর। উত্তর ২৪ পরগনার থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ঝড়বৃষ্টির দাপট বেশি ছিল। দীর্ঘ ক্ষণ বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন ছিল অনেক এলাকা। উলুবেড়িয়া মেডিক্যালের সামনে জমা জল নামতে অনেক সময় লাগে। বর্ধমান-সহ কিছু এলাকায় বিকেল পর্যন্ত প্রবল বৃষ্টি ও বজ্রপাত হয়। রাস্তায় জল জমে।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Death Strom

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy