Advertisement
E-Paper

কালীঘাটে স্বামীর ভিটের জন্য লড়াই ফরাসি বৃদ্ধার

প্রথম যে বার স্বামীর হাত ধরে মাদেলিন এই শহরে পা রেখেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫। তার এক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছে বাঙালি বিজ্ঞানী সমীর দালালের সঙ্গে।

সুনন্দ ঘোষ

শেষ আপডেট: ০৩ জুন ২০১৬ ০৩:৫০
মাদেলিন দালাল

মাদেলিন দালাল

প্রথম যে বার স্বামীর হাত ধরে মাদেলিন এই শহরে পা রেখেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ২৫। তার এক বছর আগে তাঁর বিয়ে হয়েছে বাঙালি বিজ্ঞানী সমীর দালালের সঙ্গে।

১৯৭০ সালের সেই কলকাতার সঙ্গে ২০১৬-র কলকাতার অনেকখানি তফাৎ। কিন্তু এই ৪৬ বছর ধরে মাদেলিন কত বার যে ছুঁয়ে গিয়েছেন এই শহর, তার ইয়ত্তা নেই। সেই ভালবাসা আর অদম্য জেদ নিয়েই স্বামী মারা যাওয়ার সাত বছর পরেও মাদেলিন এখন নিজের অধিকার ফিরে পেতে লড়াই চালাচ্ছেন। লড়াই চালাচ্ছেন এই কলকাতার আদালতেই।

মাদেলিন জন্মসূত্রে ফরাসি। সেখান থেকে কানাডা গিয়ে আলাপ হয় সমীরের সঙ্গে। বিয়ের পরে ইউরোপের বেশ কয়েকটি শহর ঘুরে শেষমেশ থিতু হন আমেরিকায়। কিন্তু মাদেলিন একবারও ভুলে যাননি, তিনি শহরেরই পুত্রবধূ। শর্তহীন ভাবে ভালবেসেছেন কলকাতাকে। তেমনই এই শহর আর এই শহরের মানুষ উজাড় করে ভালবেসেছে তাঁকেও। মনুমেন্ট, ভিক্টোরিয়া, কালীঘাট, টালিগঞ্জ, নিউ মার্কেট— আরও কত শত অলিগলি মাদেলিন ঘুরে বেড়িয়েছেন স্যাম-এর (সমীরকে এই নামেই তিনি ডাকতেন) হাত ধরে।

এত দিন পরে তবে আইনি লড়াই কীসের? মামলার সূত্রপাত সমীরের একটি বাড়ির মালিকানাকে ঘিরে। কালীঘাটের কাছে নকুলেশ্বর ভট্টাচার্য লেনে ওই বাড়িতে নাসা-র বাঙালি বিজ্ঞানী সমীরের বাবা-মা থাকতেন। ফণীন্দ্র ও অন্নপূর্ণা দালাল। ১৯৭৬ সালে ফণীন্দ্র মারা যান। ২০০৫ সালে অন্নপূর্ণা। তার পরে এই শহরের সঙ্গে মাদেলিনদের সমস্ত সম্পর্ক চুকে-বুকে যাওয়ারই কথা ছিল। কারণ, সমীর ছিলেন একমাত্র সন্তান। সে অর্থে এই শহরে তাঁর নিকটাত্মীয় বলতে আর কেউই নেই। কিন্তু স্বামীর শহর, স্বামীর ভিটের সঙ্গে এত সহজে সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলতে চান না মাদেলিন। তাই বৃদ্ধ বয়সে কলকাতায় ছুটে এসে দিনের পর দিন গেস্ট হাউসে থেকে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মাদেলিনের নিজের কথায়, ‘‘আমেরিকায় আমাদের বাড়ি রয়েছে। আমার দুই মেয়ে চাকরি করে। আমার কিছুর অভাব নেই। এই শহরে আমার নিজের জন বলতেও আর কেউ নেই। তবু শহরটা আছে। আমার ও স্যামের অনেক স্মৃতি আছে।’’ তাই নিজের অধিকারটুকু ছাড়তে নারাজ ৭১ বছরের বিদেশিনি। কলকাতার এই বাড়িটার মূল্য তাঁর কাছে টাকাকড়ির নয়।

ঘটনাটা কী? মাদেলিনের আইনজীবী অদিতি ভট্টাচার্য জানাচ্ছেন, অন্নপূর্ণা মারা যাওয়ার আগে ফণীন্দ্রবাবুর জ্যাঠতুতো দাদার পরিবারকে ওই বাড়িতে থাকতে দেওয়া হয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পরে সমীরবাবু বেশ কয়েক বার কলকাতায় এসে বাড়ি ফেরত চেয়েছেন। কিন্তু আত্মীয়েরা দখল ছাড়েননি। বাধ্য হয়ে সমীরবাবুকে আদালতে দ্বারস্থ হতে হয়। কিন্তু মামলার মাঝপথেই ২০০৯ সালে ৭৬ বছর বয়সে মারা যান সমীর। কলকাতার এই পৈতৃক বাড়িতেই মৃত্যু হয় তাঁর। খবর পেয়ে ছোট মেয়েকে নিয়ে ছুটে এসেছিলেন মাদেলিন। শেষকৃত্যের পরে চিতাভস্মের কিছুটা নিয়ে গিয়েছিলেন আমেরিকায়, বড় মেয়ের জন্য।

মাদেলিন বরাবরই লড়াই করতে অভ্যস্ত। নিজেই জানালেন, ২০০৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়ায় এক মেক্সিকান মহিলা ঠুকে দিয়েছিলেন তাঁর গাড়িকে। যে সংস্থার পক্ষ থেকে ক্ষতিপুরণ দেওয়ার কথা ছিল, তারা কথা রাখেনি। তাদের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমে পড়েছিলেন তিনি। মাদেলিনকে অনেকেই বারণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি শোনার বান্দা নন। আমেরিকার আদালতে সাত বছর ধরে মামলা লড়ে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছিলেন।

আইনজীবী অদিতির কথায়, ‘‘এ বারেও মাদেলিন বদ্ধপরিকর। প্রতি বছর আমেরিকা থেকে কলকাতায় এসে থানা থেকে আদালত ছোটাছুটি করছেন। গত বছর পাঁচ মাস ছিলেন। এ বারও ১৬ জানুয়ারি থেকে ২৫ এপ্রিল শহরের এক গেস্ট হাউসে কাটিয়ে সবে ফিরেছেন আমেরিকায়।’’

লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে আড়াই ঘণ্টা দূরে যে জায়গায় মাদেলিন এখন বড় মেয়েকে নিয়ে থাকেন, তার নাম ইন্ডিও। বৃদ্ধা হেসে বললেন, ‘‘ইন্ডিয়ার জায়গায় ইন্ডিও-তে থাকি। এখন পায়ে অস্ত্রোপচার করাতে হবে। কিন্তু আবার ফিরব কলকাতায়। আমার অধিকার ছাড়ব কেন?’’

French woman husband property
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy