E-Paper

জনবিন্যাসের হিসাব কষে কোথাও অস্মিতা-প্রচার, কোথাও সংযমী

বিভাজন ও মেরুকরণের রাজনীতির প্রতিস্পর্ধী হিসাবে বাঙালি পরিচিতির সংহতির রাজনীতি কতটা কার্যকর? খোঁজ নিল আনন্দবাজার।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:৪৭

—প্রতীকী চিত্র।

জন্মের শংসাপত্র পেতে কী করতে হবে? পুরপ্রতিনিধির অফিসে ঢুকে ভাঙা ভাঙা বাংলা আর হিন্দি মিশিয়ে জানতে চেয়েছিলেন এক প্রৌঢ়। হিন্দি বা বাংলা নয়, আগাগোড়া গুজরাতিতে উত্তর দিতে শুরু করলেন কলকাতার শাসকদলের পুরপ্রতিনিধি। বেশ কয়েক মিনিট ঝাড়া গুজরাতিতে কথা চলল দু’পক্ষের। তার মাঝেই পারিষদদের উদ্দেশ্যে পুরপ্রতিনিধির মন্তব্য, ‘‘বাংলা বাংলা করলে এখানে হবে না। অস্মিতা-গরিমা সব পরে দেখা যাবে, এখানে ওঁদের ভাষায় কথা বললেই বেশি মন পাওয়া যায়।’’

প্রৌঢ় বেরিয়ে যাওয়ার পরে যিনি পুরপ্রতিনিধির ঘরে প্রবেশের সুযোগ পেলেন তাঁর আদিবাড়ি বিহারে। কিন্তু ২৫ বছর কলকাতায় আছেন। বাংলা ভাষায় কথা চালানোর ক্ষেত্রে কোনও রকম জড়তা দেখে মালুম হয় না। তাঁর সঙ্গেও অবশ্য পুরপ্রতিনিধি বাংলা ভাষায় কথা বললেন না। নিজেই বললেন, ‘‘কিছুটা মৈথিলি, কিছুটা ভোজপুরি ভাষায় সারলাম।’’ বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই কৌশলই বেশি কার্যকর বলে মনে করেন শাসকদলের সেই পুরপ্রতিনিধি।

কিন্তু নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে শেষ একটি বিধানসভা ও লোকসভা ভোটের মতো এ বারও ‘বাংলা এবং বাঙালি’ লাইনে প্রচারের অভিমুখ ঠিক করে ফেলেছে রাজ্যের বর্তমান শাসকদল। ভারতের নানা প্রদেশে পরিযায়ী বাঙালি শ্রমিকদের বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে ধরপাকড়, অত্যাচার ও সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে চালান করে দেওয়ার আবহে রাজ্য জুড়ে অস্মিতা-তাড়িত এই প্রতিবাদ বিশেষ কার্যকরী হবে বলেই মনে করছে তারা। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই কি মেরুকরণের রাজনীতির প্রতিস্পর্ধী হিসাবে বাঙালি পরিচিতির সংহতির রাজনীতি করছে শাসকদল? প্রশ্ন উঠছে, তাদের এলাকাভিত্তিক কর্মসূচির ধরন দেখে।

নির্বাচনের আগের এই সময়ে শহরের নানা প্রান্তে ঘুরে দেখা যাচ্ছে, বাঙালি অস্মিতা-কেন্দ্রীক প্রচার অনেকাংশেই নির্ধারিত হচ্ছে জনবিন্যাসের সমীকরণের উপরে। প্রচুর অবাঙালি ভোটার রয়েছেন যে সমস্ত এলাকায়, জনবিন্যাসের হিসাব কষে সেখানে বাংলা এবং বাঙালিকেন্দ্রীক প্রচারের উপরে ততটা জোর দিয়ে ‘ফোকাস’ করা হচ্ছে না। উল্টে সেখানে কিঞ্চিৎ ‘সংযমী’ হয়ে থেকে প্রচার চালানো হচ্ছে নবরাত্রি উৎসবে কী কী করা হয়েছিল বা ছটের অনুষ্ঠানে কী ভাবে সকলকে নিয়ে চলার ব্যবস্থা হয়েছিল, সে সমস্ত ব্যাপারে। কোথাও কোথাও আবার ‘লিট্টি চোখা’ উৎসবও হয়েছে সাড়ম্বরে। সেখানেশাসকদলের নেতা-নেত্রীর উজ্জ্বল উপস্থিতিও চোখে পড়েছে। যা নিয়ে শাসকদলের অন্দরেই একাংশ প্রশ্ন তুলছেন। এতে আখেড়ে বাঙালি ভাবাবেগে ধাক্কা লাগারও আশঙ্কা করছেন তাঁরা।

‘পূর্বাঞ্চল লিট্টি-চোখা উৎসব’ অনুষ্ঠিত হয়েছিল যে ওয়ার্ডে, বড়বাজারের সেই ২২ নম্বরের এক শাসকদলের নেতাই বলছেন, ‘‘এই ধরনের অনুষ্ঠান নিয়ে দলের অনেকেই খুশি নন। বাঙালি আবেগকে সঙ্গে নিয়ে চলার প্রস্তুতির মধ্যে এমন অনুষ্ঠানে নেতাদেরউপস্থিতি দ্বিচারিতার মতো মনে হতে পারে অনেকের কাছে। বিষয়টি নিয়ে দলের মধ্যেই আলোচনা উঠেছে।’’ মধ্যে কলকাতার শাসকদলের আর এক প্রতিনিধির মন্তব্য, ‘‘এক দিকে বাঙালি আবেগকেসামনে রেখে পয়লা বৈশাখ পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালন করার কথা বলা হচ্ছে, অন্য দিকে এমন অনুষ্ঠানে নেতাদের দেখা যাচ্ছে। দু’নৌকায় পাদিয়ে চলতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত তরী না ডোবে।’’

দক্ষিণ কলকাতায় বালিগঞ্জ, ভবানীপুর, বন্দর-সহ বিভিন্ন এলাকায় প্রচুর অবাঙালি ভোটার রয়েছেন। ভবানীপুরের শাসকদলের এক নেতার দাবি, ‘‘আমরা তো আবার চানিয়া চোলি, কেদিয়া পরে গরবা বা ডান্ডিয়ায় অংশ নিই। রাজনৈতিক সমীকরণের নিরিখে বাইরে দলের তরফে যা-ই বলা হোক, ব্যক্তিগত ভাবে নেতৃত্ব আমার কাজের প্রশংসাই করেন। আসলে সবটাই রাজনৈতিক সমীকরণ আর কৌশলের ব্যাপার। এখানে এটা চলে।’’ বালিগঞ্জের বাসিন্দা এক ব্যক্তি আবার প্রশ্ন তুলে দিলেন, এমন সব কৌশলের কার্যকারিতা নিয়ে। তাঁর কথায়, ‘‘রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরে আসার জন্য বলা হচ্ছে। এ রাজ্যে নাকি যথেষ্ট কাজ আছে! সত্যিই কি আছে যথেষ্ট অর্থপূর্ণ কাজ? একশো দিনের প্রকল্পে মাটিকাটার কাজ নয়, এমন কাজ যা ভিন্ রাজ্যের কাজের সমান না হলেও, অন্তত কাছাকাছি বেতন দিতে পারে? রাজ্যবাসী এইপ্রশ্নের যে উত্তর জানেন, তাতে ঘরে ফেরার আহ্বানে সাড়া দিতে সাহস পাওয়া মুশকিল।’’

উত্তর কলকাতার শোভাবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা আর এক জনের মন্তব্য, ‘‘বাঙালি অস্মিতার প্রচার হতেই পারে। কিন্তু খেয়াল করে দেখতে হবে, ভারতের যে রাজ্যগুলিতে গত তিন-চার দশকে প্রাদেশিক অস্মিতার রাজনীতি সফল হয়েছে, তার প্রতিটিই আর্থিক ভাবে সফল। গুজরাত বা মহারাষ্ট্রে কেন অস্মিতার রাজনীতি বলীয়ান, আর বিহার বা মধ্যপ্রদেশে কেন নয়, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজলেই বাঙালি অস্মিতা তথা জাত্যাভিমানের রাজনীতির সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে যাবে।’’

বন্দর এলাকার এক বাসিন্দা আবার মনে করালেন, বাঙালি হওয়ার প্রবল প্রচেষ্টা চলছে সব পক্ষের মধ্যেই। প্রধানমন্ত্রীর ‘বঙ্কিমদা’ সম্বোধন মনে করিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘‘তিনি কেন বঙ্কিমদা বললেন, প্রশ্ন করার পরে বলা হল, এত বাঙালি-বাঙালি করছে! বাংলা পড়তে পারা,লিখতে পারার কথা বলছে। ওদের কীর্তি আজ়াদ, ইউসুফ পাঠানেরা কি বাংলা লিখতে, পড়তে শিখে গিয়েছেন?’’

(চলবে)

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

West Bengal Assembly Election 2026 Bengali Language West Bengal Politics Bengali Culture Non-Bengali culture West Bengal government

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy