নদীমাতৃক সভ্যতা। ছোটবেলায় স্কুলে কথাটা বহু বার শুনেছেন নুরুদ্দিন হালদার। এখন তাঁর ছাত্রদেরও বলেন বছর ছাব্বিশের তরুণ। আর বার বারই উত্তর কলকাতার বিখ্যাত খালধারে নিজের বাড়ির ইমারত চোখে ভেসে ওঠে।
ত্রিপলের চালে বাঁশ, দরমার ঘরের সঙ্গে মানায় না ইমারত শব্দটা। তবু তা বড় প্রিয় নুরুদ্দিনের। “একটা সময়ে কোনওমতে মাথা গোঁজার জায়গা ছিল! এখন ১০-১২ ফুট উপরে চাল, দেওয়ালে তেরছা করে বসানো টেবিল ফ্যানও! ত্রিপলের ঢাল-খাওয়া চালে রুখে দেয় বৃষ্টির জল! ইমারতই তাই বলতে ভাল লাগে!”
সেই ইমারতের গা ঘেঁষে খালের গায়ে বাঁশের পথ বেয়ে চটে মোড়া খোপটুকুও নুরুদ্দিনদের জীবন। খোপে ঢুকে নিজেরা হালকা হন, হালকা হয় পাড়াপ্রতিবেশী পরিবার। শৌচাগার, কী বিষম বস্তু হাড়ে হাড়ে জানেন খালপাড়ের বাসিন্দারা। উড়ালপুল, রাজপথ, বহুতলে ঝকঝকে শহরের মূল স্রোতে ঠাঁই নেই তাঁদের। এই নিকাশি খালের সৌজন্যে কলকাতার বর্জ্যস্রোতে মিশে যায় ক্যানাল ইস্ট ও ক্যানাল ওয়েস্ট রোডের জগৎ। খালধারে উনুন খোঁড়া হয়েছে বেঁচে থাকার ভাত জোগাতে। শীতে উত্তাপের খোঁজেও। সেই উনুনের পাশেই চট-বাঁশের খোপটুকুতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেওয়ার আয়োজন। শরীর বা সংসারের যাবতীয় উদ্বৃত্ত, উচ্ছিষ্টের গতি খালের জলেই। গোটা শহরের ক্লেদ বয়ে খাল মিশছে পূর্ব কলকাতার জলাভূমিতে। ভোটার, আধার, রেশন কার্ডধারী খালধারের বাসিন্দারা ভারত রাষ্ট্রের নাগরিক। কলকাতা পুরসভার ২৯ নম্বর ওয়ার্ড। রাজাবাজার, নারকেলডাঙার ঠিক উত্তরে ৩০ নম্বর ক্যানাল ইস্ট রোড। ঝোপঝাড়ের না-মানুষ বেজি, ইঁদুরদের সঙ্গে সপরিবার নুরুদ্দিনদের বাস। দক্ষিণে জয়নগর থেকে আসা মা, বাবার সন্তান নুরুদ্দিন, পটনার গায়ত্রী দেবীর কন্যা জ্যোতি দাস ও তাঁর ছেলেপুলেরা, আরও শয়ে শয়ে ঝুপড়িবাসী বৈধ ভোটারের পচা খাল নির্ভর জীবন।
“কারা খালপাড়ে গিয়ে বসে? ক্যানাল ইস্ট বা ওয়েস্ট রোডের ধারে তো আমরা সবার জন্য জল, আলোয় ভরপুর অজস্র পাকা পায়খানা বানিয়েছি! সেই বাথরুমের নর্দমা আলাদা। খালে মেশে না”, প্রতিবাদ করেন কলকাতা পুরসভার মেয়র পারিষদ স্বপন সমাদ্দার। সেই সঙ্গে বলেন, “আজকাল তো সব বস্তিতেই পাকা ঘরের ব্যবস্থা। কিছু পাকা ঘর হয়তো ভাঙাচোরা। তবে নেই বলা যাবে না!"
মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে বস্তি শব্দটাই বাংলা শব্দ ভাঁড়ার থেকে বাতিল হতে বসেছে। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডেই নুরুদ্দিনদের ঝুপড়ি ঘরের উল্টোদিকে উত্তরে কয়েক পা হাঁটলে নীল-সাদার ফলক। তাতে লেখা, উত্তরণ। খালের উপরে চিলতে সেতু পেরিয়ে ও-পারে গেলে হরিনাথ দে রোডেও লেখা ‘উত্তরণ’! বস্তির নতুন নাম। খুপরি ঘর থেকে সর্বত্র সরকারি-বেসরকারি হাতে ফ্ল্যাটবাড়িতে উত্তরণ ঘটছে সাবেক বস্তিবাসীর। এ তল্লাটে ক্ষোভ, কোথাও বিদ্যুতের লাইন নেই, বা বাথরুমে জল ঢোকে না।
ক্যানাল ইস্টের খালপাড়বাসীদের ‘নেই-রাজ্যে’ও কয়েকটা কল রয়েছে। টাইমের কল। দফায় দফায় সকাল থেকে সন্ধে ছ’টা জল আসে। জলের টানে এত প্রতিযোগিতা, এক মুহূর্ত কলতলা ফাঁকা থাকে না। কোথাও নিজেরা খরচা করে কলপাড় বাঁধিয়েছেন স্থানীয়রাই। এসআইআর-পর্বে রাজ্য জুড়ে উৎকণ্ঠায় কিন্তু অদ্ভুত নিশ্চিন্তি খালপাড়ের ঝুপড়িবাসীদের। ভোটার, রেশনকার্ড, আধার, গাড়ি চালানোর লাইসেন্স, ঘরে বিদ্যুৎ মিটার মজুত রয়েছে সবই। তানজিলা বিবির মেয়ে সদ্য তরুণী সন্ধ্যা হালদার শুধু অস্বস্তিতে। কী নামে ভোটার কার্ড করাবেন সেই দুশ্চিন্তা! বরের নাম সাজিদ আলম। যদি পদবির ফারাকে ভুল বোঝাবুঝি হয়। রুখসানা বিবির দুশ্চিন্তা অন্য। গত বছর খালের ও-পারে ক্যানাল ওয়েস্ট রোডে আগুন লাগার সময়ে ভয়ে এ-পারেও ঝুপড়ি ফাঁকা করে সব জিনিস বের করেছিলেন ওঁরা। তখনই স্বাস্থ্যসাথীর কার্ডটা হারিয়েছে। লক্ষ্মীর ভান্ডারও করানো যায়নি।
সরকারি চাকরির দুরাশা অসম্ভব ঠেকে খালপাড়ের দু’ধারেই। উত্তরণের পাকা বাড়ি আর ঝুপড়ির কাঁচা ঘরে ভেদ নেই। সল্টলেকে আয়ার ডিউটি সেরে শীতের দুপুরে ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঘরে ফেরা মধ্যবয়সিনি ঝাঁঝিয়ে ওঠেন, চাই না লক্ষ্মীর ভান্ডার! ছেলেটার একটা চাকরির আশা নেই।
খালপাড়ের দু’ধারে পটুয়াপাড়ায় মূর্তি গড়া কিংবা টিন কারখানা, ছাতা কারখানা, কাগজের কার্টন কারখানাই রুটিরুজি সংসারী পুরুষের। সেই সঙ্গে বাজারে আনাজ বিক্রি, ভ্যান থেকে অটো, ট্যাক্সি চালনা, অ্যাপের জিনিস সরবরাহেও জীবনধারণ। মেয়েরা সেন্টারের আয়া থেকে বাবুর বাড়ি খেটে হয়রান। শুধু রেশনের চাল বা লক্ষ্মীর ভান্ডারে জীবন চলে না। সার বুঝেছেন সকলেই।
ভোটের হাওয়ায় খালপাড়েও আনাগোনা বাড়ে শাসক দলের জনপ্রতিনিধির। সেতুর ও-পাশে ক্যানাল ওয়েস্ট রোডে বিজেপির মণ্ডল অফিসেও হালকা তৎপরতা। কিছুই তত খেয়াল করার ফুরসত মেলে না নুরুদ্দিন বা তাঁর দিদি তানজিলার জীবনযুদ্ধে!
ভোটার কার্ড থাকলেও লক্ষ্মীর ভান্ডার হয়নি স্বামী বিচ্ছিন্না তানজিলার। মধ্য ত্রিশেই দিদিমা হয়ে গিয়েছেন। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেন না। ছেলেকে স্কুলে পাঠিয়ে বাবুদের বাড়ি-বাড়ি কাজ। বিকেলে ঘরে ফিরে জল-কলের কাজ সেরে বসে যান খাতা, বই কারখানার বাতিল কাগজের টুকরো গোছাতে। সেই কাগজ আবার কাজে লাগবে খাতা তৈরির কারখানায়। কাগজের স্তূপের মধ্যে বসেই নাতনি মুসকানের সঙ্গে আদর-আহ্লাদ নানিমার।
তানজিলার ছেলে সুলতান কাছেই গড়পারের সুবিখ্যাত এথিনিয়াম স্কুলের ক্লাস সেভেন। সত্যজিতের লেখায় এথিনিয়ামের বিখ্যাত প্রাক্তনী জটায়ুকে অবশ্য এখনও চেনা হয়নি তার। ঝুপড়ির ঘর থেকেই দু’টো লেটার নিয়ে মাধ্যমিক পাশ করেছিলেন নুরুদ্দিন। তখন আলো, পাখা কিছু ঢোকেনি ঝুপড়িতে। তিনিও এথিনিয়ামের প্রাক্তনী। সত্যজিৎ রায়, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীদের মূর্তি উন্মোচন অনুষ্ঠানে এক বার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখেছিলেন।
রবীন্দ্রভারতীতে বাংলায় এমএ করে বজবজ লাইনে আলআমিন মিশনের স্কুলে সামান্য বেতনের চাকরি করেন নুরুদ্দিন। কয়েক বছর হল ভাষা ও চেতনা সমিতির পাঠশালা বসছে এ তল্লাটে। বই, কাগজ, কানাকানিতে কদাচিৎ এই খালধারে আছড়ে পড়ে বৃহত্তর দেশ। ভিন রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকের নিগ্রহ, বাঙালি না বাংলাদেশি প্রমাণের সঙ্কট ভাবায় নুরুদ্দিনদের। খাল ধারের দম চাপা বাতাস থেকে মুক্তির খোঁজে শ্বাস নিতে তবু চোয়াল শক্ত হয়। হাতছানি দেয় অন্য জীবন খোঁজার স্বপ্ন।
( চলবে)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)