E-Paper

শিল্পের পালে হাওয়া লাগেনি, প্রচারে তরজা

দু’দশক ধরে যে জমি ঘিরে রাজ্যের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে, তিন মাস আগে তার বিস্তীর্ণ অংশের বেনাবন সাফ হয়। মাটি দৃশ্যমান। এরপরে?

প্রকাশ পাল , দীপঙ্কর দে

শেষ আপডেট: ২১ এপ্রিল ২০২৬ ১০:২১
সিঙ্গুরের সেই জমি।

সিঙ্গুরের সেই জমি। —ফাইল চিত্র।

১৮ জানুয়ারি, ২০২৬। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জনসভা। মহাসড়ক উজিয়ে ভিড় ‘টাটার মাঠে’। সেই ভিড় শুনতে চেয়েছিল, শিল্পায়নের ঘোষণা। কিন্তু কোথায় কী!

১০ দিন পরে আরও এক ভিড়। এ বার মুখ্যমন্ত্রীর সভা, কয়েক কিলোমিটার দূরে ইন্দ্রখালিতে। সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনের কথায় ফিরলেন মমতা। শোনালেন সিঙ্গুরের পাশে থাকার কথাও। কিন্তু ‘কাঙ্ক্ষিত বার্তা’ এল কই!

দু’দশক ধরে যে জমি ঘিরে রাজ্যের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে, তিন মাস আগে তার বিস্তীর্ণ অংশের বেনাবন সাফ হয়। মাটি দৃশ্যমান। এরপরে?

দুয়ারে আরও এক বিধানসভা ভোট। কিন্তু সিঙ্গুরে টাটাদের গাড়ি কারখানার জন্য একসময়ে অধিগৃহীত সেই জমির বড় অংশ ‘বন্ধ্যা’! চাষিদের আশঙ্কা, মাটি চাষের উপযোগী না করলে বর্ষায় ফের বেনাবন হবে। তাঁরা জানান, এখনও মাটি খুঁড়লে কারখানার শিকড়ের কংক্রিট বেরোয়। ‘সিঙ্গুর বন্ধ্যা জমি পুনর্ব্যবহার কমিটি’ শিল্পের দাবি তুলছে। ভোটের সিঙ্গুরে বিজেপি ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ গড়ার আশ্বাস বিলোচ্ছে। বিজেপির চিকিৎসক প্রার্থী অরূপকুমার দাসের কথায়, ‘‘ডবল ইঞ্জিন সরকার শিল্প আনবে।’’

‘‘শিল্প নিয়ে কিছু সংবাদমাধ্যম বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। তৃণমূলের আমলে এই বিধানসভার ১৭ কিমি অংশে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ের দু’ধারে অনেক কারখানা হয়েছে। দিল্লি রোডের ধারেও হয়েছে। আরও হবে।’’— দাবি তৃণমূল প্রার্থী তথা বিদায়ী বিধায়ক ও মন্ত্রী বেচারাম মান্নার।

বিরোধীদের প্রশ্ন, ভারী শিল্প কোথায়? হয়েছে মূলত কিছু গুদাম (লজিস্টিক হাব)। ঝুটো গয়না কারখানার কথা শোনা গেলেও, হয়নি। সিপিএম প্রার্থী দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ‘‘ভাতার স্বস্তি সাময়িক। বেকারের দরকার চাকরি।’’

সিঙ্গুরের দরকার আরও অনেক কিছু। ট্রমা কেয়ার হাসপাতাল, গ্রামীণ হাসপাতালের পরিষেবা উন্নতির দাবি রয়েছে। সব বাড়িতে পানীয় জল পৌঁছয়নি। কিছু এলাকায় রাস্তা, পথবাতি, নিকাশির সমস্যাও রয়েছে। তবু, এ সব ছাপিয়ে ভোটের প্রচারে বার বার ফিরে আসছে সিঙ্গুরের ওই ৯৯৭ একর জমি। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে জমি ফিরে পাওয়ার পরে যার একাংশে চাষিরা চাষ করতে পারছেন। কিন্তু তাঁরাও কি স্বস্তিতে?

কারখানা বিদায়ের দায় নিতে চায় না তৃণমূল। দাবি করে, আন্দোলন ছিল বহুফসলি জমি বাঁচানোর। আন্দোলন পর্বে বাজেমিলিয়ার ‘অনিচ্ছুক’ চাষি লক্ষ্মীকান্ত ঘোষের আক্ষেপ, ‘‘মনে হচ্ছে, কারখানা হলেই ভাল হত। মাঠে বেনাবন। তিন বিঘা জমি পড়ে।’’ কাপাসহাড়িয়ার আশরাফ আলি মোল্লাও বলেন, ‘‘কারখানাটা হলে কর্মসংস্থান হত।’’ কেউ সিপিএমকেই দায়ী করেন পরিস্থিতির জন্য। ‘সিঙ্গুর বন্ধ্যা জমি পুনর্ব্যবহার কমিটি’র সভাপতি মহাদেব দাস বলছেন, ‘‘সিঙ্গুরের লাভ হয়নি। আন্দোলনের ফসল তুলে লাভ হয়েছে কিছু নেতার।’’

একই অভিযোগ সিপিএম প্রার্থী দেবাশিস চট্টোপাধ্যায়ের গলাতেও, ‘‘জমি আন্দোলনের কিছু নেতা ফুলেফেঁপে উঠেছেন। কোটি কোটি টাকার মালিক। প্রায় ৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধের মুখে। অথচ, তৃণমূল নেতা বেসরকারি স্কুল খুলছেন।’’ কংগ্রেস প্রার্থী বরুণকুমার মালিকেরও এক অভিযোগ।

দুর্নীতির অভিযোগ মানেনি তৃণমূল। বেচারামের দাবি, উন্নয়নকে আড়াল করতে চাইছেন বিরোধীরা। ওই জমির অধিকাংশেই চাষ হচ্ছে। আগের ভোটের পরিসংখ্যানে পাল্লা তৃণমূলের দিকে ভারী। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে তারা ২৫ হাজার ৯২৩ ভোটে জিতেছিল। ২০২৪-এর লোকসভায় এগিয়ে ১৮ হাজার ৮২৬ ভোটে।

এ বার কী হবে, সময় বলবে। বিরোধীদের দাবি, তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের উপরে যুক্ত হয়েছে আলুর দাম না-মেলার ক্ষোভ। অভিযোগ মানে না তৃণমূল। বেচারাম দাবি করছেন, জিতলে সব হবে। বিজেপি প্রার্থীর আশ্বাস, ‘‘জিতলে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার পরিকাঠামো উন্নত করব। উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা, কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় হবে।’’

বৈশাখী দুপুরে তপ্ত পথে ইতিউতি গাছের ছায়ায় খানিক শীতলতা মিলছে। তবে, শিল্প-কারখানার কোনও ছায়া নেই সেখানে। হা-হুতাশ ফিরছে বার বার।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Singur Narendra Modi Mamata Banerjee

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy