তিলজলার পরে এ বার বেআইনি নির্মাণ ভাঙতে বুলডোজ়ার নামতে চলেছে হাওড়ায়। কলকাতার পরেই বেআইনি নির্মাণে এগিয়ে হাওড়া। রাজ্য সরকার গত শনিবার হাওড়া পুরসভাকে নোটিস দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে, শহরে পুর আইন না মেনে যে সমস্ত নির্মাণকাজ হয়েছে, তা চিহ্নিত করে দ্রুত ভেঙে ফেলতে হবে।
পুর ও নগরোন্নয়ন দফতর থেকে এই নির্দেশ পাওয়ার পরেই পুরসভা ৬০০টি সম্পূর্ণ বেআইনি বাড়ির তালিকা তৈরি করেছে। যার মধ্যে ছ’টি ওয়ার্ডের ছ’টি বহুতলকে ভাঙার তালিকায় প্রথম সারিতে রাখা হয়েছে। পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে পর্যায়ক্রমে এই ছ’টি বেআইনি বহুতল ভাঙার কাজ শুরু হবে। এ জন্য বুলডোজ়ারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে।
অভিযোগ, ২০১৩ সালে হাওড়া পুরসভায় তৃণমূল বোর্ড গঠন করার পর থেকে সেখানে বেআইনি নির্মাণের রমরমা হয়। পুরসভা সংক্রান্ত বিষয়ে ওয়াকিবহাল মহলের মতে, তখনই জরিমানা নিয়ে বেআইনি অংশকে আইনি করে নেওয়ার পদ্ধতি (যাকে পুর আইনে অ্যাসমেড প্ল্যান বলা হয়) হাওড়া পুরসভা তৈরি করে। তার পর থেকেই গত কয়েক বছরে ক্রমাগত হাওড়া শহর বেআইনি বহুতলে ভরে গিয়েছে। ২০১৮ সালের পরে নির্বাচিত বোর্ড না থাকায় রাজ্য সরকারের তৈরি করা প্রশাসকমণ্ডলী হাওড়া শহরের দায়িত্ব নেয়। ২০২১ সালের পর থেকে জরিমানা দিয়ে বেআইনি নির্মাণ আইনি করার পদ্ধতিতে লাগাম টানে প্রশাসকমণ্ডলী। তা সত্ত্বেও শহরের অধিকাংশ প্রোমোটার পুরসভার অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত একতলা বা দোতলা তৈরি করে বেআইনি নির্মাণ অবাধে চালিয়ে গিয়েছেন বলে অভিযোগ।
হাওড়া পুরসভার এক কর্তা বলেন, ‘‘২০১৩ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বেআইনি বহুতল তৈরি হয়েছে এখানে। সেটা বাদ দিয়ে ২০২২ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত ৬০০ বেআইনি বাড়ির তালিকা তৈরি হয়েছে। যে ৬০০টি বাড়ির ৮০ শতাংশ অংশ বেআইনি। অর্থাৎ, দোতলার অনুমোদন নিয়ে করা হয়েছে ৬-৭ তলা! সেই বাড়িগুলি আগে ভাঙা হবে।’’
পুরসভা সূত্রে জানা গিয়েছে, হাওড়া পুরসভা নিয়ে ২১ মে নবান্নে বৈঠক রয়েছে। ওই বৈঠকে পুরসভার বর্তমান আর্থিক অবস্থা এবং অফিসার, ইঞ্জিনিয়ার ও কর্মী না থাকার বিষয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট রাজ্য সরকারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এই সব কারণের জন্য হাওড়া পুরসভা কার্যত পঙ্গু হয়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে জানিয়ে দেওয়া হবে বেআইনি নির্মাণ নিয়ে পুরসভার তৈরি করা সাম্প্রতিক রিপোর্ট।
পুরসভার বক্তব্য, ২০১৩ সাল থেকে যে সব বেআইনি নির্মাণ হয়েছে, সব ভাঙার মতো পরিকাঠামো বা আর্থিক ক্ষমতা তাদের নেই। কারণ, বেআইনি বাড়ি ভাঙতে গেলেও অনেক অর্থ ও পরিকাঠামো লাগে। তাই ২০২২ সাল থেকে তৈরি ৬০০টি বেআইনি বাড়ির একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে ১৫, ১৯, ২৬, ২৭, ৪৪ এবং ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের মোট ছ’টি বহুতল আগে ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকারের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগিতা পেলে শহরের বাকি বেআইনি বহুতলগুলিও ভেঙে দেওয়া হবে।
এক পুর ইঞ্জিনিয়ার বলেন, ‘‘শুধু আর্থিক সমস্যাই আছে হাওড়া পুরসভায়, এমন নয়। এই মুহূর্তে পুরসভার মূল সমস্যা অভিজ্ঞ কর্মীর সঙ্কট। যেখানে পুরসভায় ইঞ্জিনিয়ার থাকার কথা ৯০ জন, আছেন মাত্র ১২ জন। এর মধ্যে পুরসভায় যাঁরা ৩০-৪০ বছর ধরে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার বা সাব-অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার পদে চাকরি করছেন, এক-এক জন ৫-৬টি করে দফতর সামলাচ্ছেন। গত বছর রাজ্য সরকার তাঁদের আচমকাই ঠিকাকর্মী ঘোষণা করে বেতন অর্ধেক করে দিয়েছে। এই বিষয়গুলিই বর্তমান সরকারকে জানানো হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)