ছেলে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। তার পরবর্তী পড়াশোনা নিয়ে চিন্তায় বাবা কার্তিক বিশ্বাস। বলাগড়ের চরকৃষ্ণবাটী পঞ্চায়েতের পদ্মডাঙা গ্রামের বাসিন্দা কার্তিক চাষাবাদ করেন। কিন্তু চাষের খরচ যে হারে বেড়েছে, তাতে খেতের আয় থেকে ছেলের ভবিষ্যৎ কী গড়া যাবে?
চণ্ডীতলার কৃষ্ণরামপুরের ষাটোর্ধ্ব সুশান্ত দাসের আক্ষেপ, আমপানে সেই যে ধান আর তিলের ক্ষতি হল, তার পর থেকে সমস্যা পিছু ছাড়ছে না। বিঘেখানেক জমিতে আলু বসিয়েছেন। প্রথম বার বৃষ্টিতে নষ্ট হওয়ায় দ্বিতীয় বার বসাতে হয়েছে। আদৌ লাভ হবে কি, সংশয় রয়েছে তাঁর। তাঁর কথায়, ‘‘ফড়েরা আলু কিনে নিয়ে যান। খরচটুকু উঠবে বলেও মনে হচ্ছে না। ঋণ শুধব কী করে!’’
কার্তিক বা সুশান্তের মতোই ভাল নেই কৃষিপ্রধান হুগলি জেলার বহু চাষি। যাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রান্তিক বা ক্ষুদ্র চাষি। চাষ করে লাভ হচ্ছে না। ধান বা আলুচাষিদের মতোই জেলার নানা প্রান্তে আক্ষেপ শোনা যাচ্ছে আনাজ-চাষিদেরও।তাঁরা জানাচ্ছেন, হিমঘর না-থাকায় ফলন নষ্টের আশঙ্কায় সঙ্গে সঙ্গে বেচে দিতে হয়। অধিক ফলন হলে বেচতে হয় জলের দরে।
বলাগড়ের এক আনাজ-চাষির কথায়, ‘‘ফলনে টান থাকলে, দাম কিছুটা চড়ে। তখন হইচই শুরু হয়। চাষির থেকে ক্রেতার কাছে যাওয়ার মাঝে ফসল অনেক হাত ঘোরে। তাতেই দাম চড়ে। চাষির লাভ সেই অনুপাতে কিছুই নয়।’’
চাষিদের পরিস্থিতি নিয়ে সম্প্রতি সমীক্ষা চালিয়েছে আরএসপি। তাতে উঠে এসেছে চাষির দুরবস্থার কথা। দলীয় নেতৃত্বের বক্তব্য, সমস্যা জানানোর পাশাপাশি তা সমাধানের উপায় বা দাবির কথাও কৃষি দফতরকে বলা হয়েছে।
আরএসপি নেতৃত্বের পর্যবেক্ষণ, দেশজোড়া কৃষক আন্দোলনে ফসলের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অথচ, এখানে এই ব্যবস্থা দুর্বল। ধানের সহায়ক মূল্য কুইন্টালপ্রতি ১৯৪০ টাকা হলেও বহু কৃষক ১৪০০-১৫০০ টাকায় বিক্রিতে বাধ্য হয়েছেন। নানা কারণে সরকারি কেন্দ্রে বেচতে পারেননি। গত মরসুমে আলু চাষেও অধিকাংশের ক্ষতি হয়েছে। চাষি দাম পাননি। প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে ধান, আলু, আনাজ— সব কিছুর ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হয়নি।
এক চাষির হিসেব, ১০ কাঠা জমিতে ৪০-৪২টি আলু হয়। প্রকৃতির মারে এ বার ১৫-১৬টি হয়েছে। পান্ডুয়ার রামেশ্বরপুর-গোপালনগরের শক্তিপদ পাল জানান, বিঘেপ্রতি আলু চাষে কমবেশি ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়। এ বার দু’বার চাষ করতে হয়েছে তাঁকে। খরচ ৩০ হাজার টাকা ছাড়িয়েছে। ফলনও ভাল হয়নি। তিনি ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে চাষ করছেন। তাঁর কথায়, ‘‘সরকার সহায়ক মূল্যে ধান কেনে। আলু কেনে না। ডাহা লোকসান হবে। খেয়েপরে বাঁচাই দায়!’’
কার্তিক জানান, গত বছর এই সময় এক বস্তা (৫০ কেজি) পটাশ সার ছিল ৮০০-৮৫০ টাকা। এ বার তা ১৮৫০ টাকা। আগাছা মারার ওষুধ ৩৮০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৫০-৫৭০ টাকায়। ডিজ়েলের দাম বৃদ্ধিতে ট্রাক্টর চালানোর খরচ বেড়েছে। তার উপর নিম্নচাপের লাগাতার বৃষ্টিতে আনাজ নষ্ট হওয়া মরার উপরে খাঁড়ার
ঘা’য়ের শামিল।