এতদিন একজনের বিচরণক্ষেত্র ছিল সংবাদজগৎ। সেই সূত্রে বিভিন্ন রাজনীতিরে সঙ্গে ওঠাবসা। এ বার তিনি নিজেই সরাসরি রাজনীতির ময়দানে! তাঁর প্রতিপক্ষ রাজনীতিতে পোড়খাওয়া। শিক্ষকতার সুবাদে বহু ছাত্রছাত্রীর পরিচিত।
এক জন লড়বেন দলের জয়ের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য। তাঁর প্রতিপক্ষের লড়াই জয়ে ফেরার। পরিচিতির নিরিখে দু’জনের টক্কর প্রায় সমানে সমানে।
গঙ্গাপাড়ের বিধানসভা কেন্দ্র উত্তরপাড়ায় ভোটের লড়াই জমে গিয়েছে ইতিমধ্যেই। লড়াই তৃণমূলের সাংবাদিক প্রার্থী প্রবীর ঘোষালের সঙ্গে সিপিএম তথা জোটের প্রার্থী শ্রুতিনাথ প্রহরাজের। এক জন পাঁচ বছরে রাজ্যের ‘উন্নয়নের’ ফিরিস্তি শুনিয়ে ভোট চাইছেন। অন্য জন ঠিক উল্টো। তাঁর হাতিয়ার রাজ্যের ‘অনুন্নয়ন’ এবং ‘দুর্নীতি’। সঙ্গে কংগ্রেসকে পেয়ে যাওয়ায় বাড়তি উদ্যম।
গত লোকসভা এবং বিধানসভা নির্বাচনের মাপকাঠিতে এ বার ভোটে প্রবীরবাবুরই পাল্লা ভারী বলে দাবি তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের। ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করে তৃণমূল পেয়েছিল ১ লক্ষ ৪ হাজার ৭৫৩ ভোট। বামফ্রন্ট পেয়েছিল ৬১ হাজার ৫৬০টি ভোট। তার পরে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে অবশ্য তৃণমূল একাই লড়ে। উত্তরপাড়া বিধানসভা কেন্দ্রে তৃণমূল পেয়েছিল ৬৮ হাজার ৭২২টি ভোট। বিজেপি পায় ৫২ হাজার ৪৯১টি ভোট। বামেদের ঝুলিতে যায় ৪৮ হাজার ৯৯০টি ভোট এবং কংগ্রেস ভোট পেয়েছিল মাত্র ৭৯৮৩টি।
এই হিসেবে ভরসা করেই ফের উত্তরপাড়া জয়ের স্বপ্ন দেখছেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকেরা। কিন্তু জয় এ বার তত সহজ হবে না বলেই ধারণা রাজনৈতিক শিবিরের। তাদের মতে, একে তো সারদা থেকে নারদ কাণ্ড এবং সব শেষে উড়ালপুল বিপর্যয় এবং সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের কথা সামনে আসায় শাসক দলের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেয়েছে। তার উপরে গত পাঁচ বছরে এই কেন্দ্রের বিধায়ক অনুপ ঘোষালের নানা কাজকর্ম সাধারণ মানুষ ভাল ভাবে নেননি। এমনকী, এলাকায় তাঁর উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। সেই ‘প্রতিকূলতা’ প্রবীরবাবুর পক্ষে কাটানো সহজ হবে না। তা ছাড়া, এ বার বিজেপি-হাওয়া উধাও। বিজেপি-ভোটের একাংশ এবং এলাকার বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মী-সমর্থকদের ভোট যদি জোটের পক্ষে যায় তা হলে অনেক হিসেবই বদলে যাবে।
পরিস্থিতি যে কঠিন, তা ঘনিষ্ঠ মহলে মানছেনও কোন্নগরের বাসিন্দা প্রবীরবাবু। অনেক আগে থেকেই তাই হোম-ওয়ার্ক করে ময়দানে নেমেছেন। কলকাতার সাংবাদিক মহলে পরিচিত মুখ প্রবীরবাবুর এলাকায় যথেষ্টই মেলামেশা রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। তার উপর তিনি স্থানীয় নানা ক্লাব-সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। তবে, তাঁকে কিছুটা বাড়তি সুবিধা দিয়েছে তৃণমূল পরিচালিত উত্তরপাড়া এবং কোন্নগর পুরসভার কাজ। এলাকার গঙ্গার ঘাট, রাস্তা, আলো-সহ বিভিন্ন নাগরিক পরিষেবার উন্নয়ন ঘটানো হয়েছে দাবি দুই পুরসভারই। সে সব কথা প্রচারেও আনছেন প্রবীরবাবু। তাঁর কথায়, ‘‘চেষ্টা করছি যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছনো যায়। প্রচারে ফাঁক রাখতে চাই না। এই ক’মাসে যত অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ পেয়েছি, রক্ষার চেষ্টা করেছি। এর পর উপরওয়ালা।’’
প্যারীমোহন কলেজের শিক্ষক শ্রুতিনাথবাবুও জয়ে ফেরার জন্য তাঁর পরিচিতিটাকেই বেশি ভরসা করছেন। তিনি রাজনীতির ময়দানে অভিজ্ঞ। বাম মনোভাবাপন্ন কলেজ শিক্ষকদের সংগঠনের প্রথম সারির নেতা। আগে এই কেন্দ্রের বিধায়কও ছিলেন। গত বার অবশ্য ভোটে দাঁড়িয়েও জিততে পারেননি। তবে, হারলেও ময়দান ছেড়ে যাননি। এলাকার সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে যুক্ত রাখতেন। খুব সমস্যায় না পড়লে প্রতিটি অনুষ্ঠানেই হাজির থেকেছেন। সেই জনসংযোগ তাঁকে ভোট বৈতরণী পার করিয়ে দেবে বলেই মনে করছেন শ্রুতিনাথবাবু।
জোটের শিক্ষক-প্রার্থীর কথায়, ‘‘গত বার আমাদের পক্ষে হাওয়া ছিল না। এ বার কিন্তু হাওয়া অন্য রকম। তা ছাড়া, প্রচারে যে সাড়া পাচ্ছি, তাতে আমরা আশাবাদী।’’
১৯ মে হাওয়া কোন দিকে বয়, সেটাই দেখার জন্য তাকিয়ে রয়েছে উত্তরপাড়া।