লড়াই তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীর। ‘খেসারত’ দিতে হল বিডিওকে। কারণ, নিয়ম মেনেই সরকারি টাকা নির্দিষ্ট প্রকল্পে খরচ করতে গিয়ে কোনও অনিয়মকেই গুরুত্ব দেননি তিনি। যা ‘খুশি’ করতে পারেনি পঞ্চায়েতে সমিতিকে। এই অবস্থায় বিডিওকে ‘সরাতে’ এককাট্টা হয়ে প্রশাসনের দ্বারস্থ হয় দু’টি গোষ্ঠীই। তারই সূত্রে ধরে শেষ পর্যন্ত সরে যেতে হয়েছে বিডিওকে। ঘটনাটি ঘটেছে হাওড়ার জগৎবল্লভপুরে।
তবে এই নিয়ে কোনও মন্তব্য করতে চাননি বিডিও তাপস মোহান্তি। তবে জেলা প্রশাসন সূত্রের খবর, রাজনৈতিক চাপের মুখে তিনি যে কাজ করতে পারছিলেন না তা চিঠি লিখে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। একইসঙ্গে বদলিও চেয়েছিলেন তিনি।
যদিও বিডিও বদলিকে ‘রুটিন’ বলেই দাবি জেলা প্রশাসনের। গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের অভিযোগ উড়িয়ে একই দাবি জেলা তৃণমূল নেতৃত্বেরও। উভয়পক্ষেরই যুক্তি, নির্বাচন সামনে। তাই তিন বছর একই পদে যাঁরা আছেন, তাঁদের বদলি করা হচ্ছে। যদিও জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, জগৎবল্লভপুরের বিডিও পদে তাপসবাবুর তিন বছর পূর্ণ হবে আগামী মে মাস নাগাদ। তাপসবাবুকে বদলি করা হয়েছে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাশাসকের অফিসে বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের দায়িত্বে। বিডিও-র পদের তুলনায় যার গুরুত্ব যথেষ্ট কম।
বিডিও-র সঙ্গে তৃণমূলের পঞ্চায়েত সিমিতির বিবাদের শুরু ২০১৪ সালে। সমিতির সভাপতি মহম্মদ ইব্রাহিম বিডিওর কাছে ৩৯টি অঙ্গনওয়াড়ি, ৪০টি মাধ্যমিক শিক্ষাকেন্দ্র এবং মাদ্রাসা শিক্ষাকেন্দ্রের অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ এবং ৩৭টি কবরস্থান সংস্কারের জন্য বরাদ্দের অনুমোদন চান। টাকা এসেছিল সংখ্যালঘু উন্নয়ন সংক্রান্ত তহবিল (এমএসডিপি) থেকে। জানা যায়, জমির ব্যবস্থা না করেই ভুয়ো প্রকল্প দেখিয়ে এই টাকা এনেছিলেন ইব্রাহিম। যেমন মাদ্রাসা শিক্ষাকেন্দ্র না থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত ক্লাসরুম তৈরির জন্য টাকা আনা হয়েছিল। কাজের টেন্ডারও হয়ে যায়। এ ছাড়া রাস্তা, বিডিও অফিসের দেওয়াল তৈরি প্রভৃতি কাজের জন্য ঠিকাদারদের বকেয়া বাবদ প্রায় এক কোটি টাকা দাবি করেন তিনি। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বিধি মানা হয়নি এই কারণ দেখিয়ে অনুমোদন দিতে অস্বীকার করেন বিডিও। ঠিকাদারদের বকেয়াও আটকে দেন তিনি। তাঁর যুক্তি ছিল, ওই সব কাজ হয়েছে মৌখিক ভাবে। এই নিয়ে বিডিও-র সঙ্গে সভাপতির বিবাদ চরমে ওঠে। ইব্রাহিমের বিরুদ্ধে হেনস্থার অভিযোগ করেন বিডিও। বন্ধ হয়ে যায় উন্নয়নের কাজ।
বছরখানেক আগে অনাস্থা প্রস্তাবের মাধ্যমে ইব্রাহিমকে সরিয়ে পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি হন তৃণমূলেরই মহম্মদ হাফিজুর রহমান। এমএসডিপি, তৃতীয় রাজ্য অর্থ কমিশন প্রভৃতি খাতের টাকা খরচের ক্ষেত্রে নতুন সভাপতির সঙ্গেও বিডিওর মতবিরোধ দেখা দেয়। সমিতি সূত্রের খবর, সাম্প্রতিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের ত্রাণ বিলির ক্ষেত্রে বিডিও সাফ জানান, যাঁরা ত্রাণ পাবেন তাঁদের তাঁর সামনে হাজির করাতে হবে। তবেই তিনি ত্রাণের টাকা দেবেন।
কী বক্তব্য প্রাক্তন ও বর্তমান সভাপতি?
দু’জনেই সব দায় চাপিয়েছেন বিডিওর উপরে। ইব্রাহিম বলেন, ‘‘অনেক তদ্বির করে এমএসডিপি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা এনেছিলাম। বিডিও-র জন্যই বেশিরভাগ খরচ করা গেল না। যে সব ঠিকাদার কাজ করেছিলেন তাঁদের প্রাপ্য টাকাও দেননি তিনি।’’ হাফিজুরের কথায়, ‘‘সব কাগজপত্র নিখুঁত না হওয়া পর্যন্ত কোনও ফাইল ছাড়তে রাজি হননি বিডিও। তাঁর দিক থেকে হয়তো তিনি ঠিক। কিন্তু এর ফলে টাকা খরচ করতে দেরি হয়ে গিয়েছে। পরবর্তী বরাদ্দ পেতে সমস্যা হবে।’’
সিপিএমের জেলা সম্পাদক বিপ্লব মজুমদার বলেন, ‘‘রাজ্যজুড়ে প্রশাসনে যে অরাজকতা চলছে তা বন্ধ করতে এই সরকার ব্যর্থ। কাজের ক্ষেত্রে বিডিওদের নিরপেক্ষতাও রাখতে দিচ্ছে না। দুর্নীতিকে সামনে রেখে তৃণমূলের যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, বিডিওকে বদলি করে তা রোখা যাবে না।’’
জেলা তৃণমূল (সদর) সভাপতি ও কৃষি বিপণন মন্ত্রী অরূপ রায় বলেন, ‘‘এই বদলির সঙ্গে তৃণমূলের কোনও সম্পর্ক নেই। প্রশাসন মনে করেছে তাই বদলি হয়েছেন বিডিও।
প্রশ্ন উঠেছে, নিয়ম মেনে সরকারি টাকা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খরচ করার বিষয়ে পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন দফতরের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের নির্বাচিত সদস্যদের। তা হলে জগৎবল্লভপুর পঞ্চায়েত সমিতির কর্তাদের নিয়ম মেনে না চলার দায় বিডিও-র উপরে চাপানো হবে কেন?
জেলা পরিষদের এক কর্তা জানান, খাতায়-কলমে অনেক কথা বলা হলেও বাস্তব অবস্থা কিছুটা ভিন্ন। টাকা আসে অনেক দেরিতে। ফলে কাগজপত্র একটু এদিক-ওদিক করে তড়িঘড়ি টাকা খরচ করে ইউসি (ইউটিলাইজেশান সার্টিফিকেট) দিতে হয়। অনেক ব্লকে এই ভাবেই কাজ চলে।