মেহগনি-বট-অশ্বত্থের ছায়ামাখা উত্তর-দক্ষিণে ছড়ানো স্ট্র্যান্ডটাই এক সময়ে ছিল এ শহরের কুঞ্জবন।
তা এখনও আছে। চাঁদের মতো বাঁক নেওয়া গঙ্গাকে সাক্ষী রেখে এখানে যুগে যুগে কত যে প্রেমের ভাঙাগড়া তার হিসেব কেউ রাখে না। তবে, দিন পাল্টেছে। শহর আড়ে-বহরে বেড়েছে। তৈরি হয়েছে প্রেমের আরও দু’টি নতুন ঠিকানা। শহরের পশ্চিমে ‘কেএমডিএ পার্ক’ এবং তার থেকে আরও কিছুটা দূরে দিল্লি রোডের ধারে ‘নিউ দিঘা পর্যটন কেন্দ্র’ প্রতিদিন বিকেল-সন্ধ্যায় নিভৃত আলাপচারিতায় যেখানে ডুবে যান কলেজের ছাত্রছাত্রী থেকে যুবক-যুবতীরা। প্রেম যে নির্জনতা খোঁজে।
তবে, আজ, শনিবার ভ্যালেন্টাইনস ডে’-তে সেই নির্জনতা যে চন্দননগরের কোথায় মিলবে, তা নিয়ে ক’দিন ধরেই জল্পনার অন্ত নেই এখানকার প্রেমিক-প্রেমিকাদের। নিশ্চিত ভাবেই ভরে উঠবে স্ট্র্যান্ড, দু’টি পার্ক, রেস্তোরাঁর চেয়ার। চলবে প্রেমের উদ্যাপন। উপহার দেওয়া-নেওয়া।
তৃতীয় শতকে রোমান সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস ঘোষণা করেন, ভাল সৈনিক হতে গেলে বিয়ে করা যাবে না। এর প্রতিবাদে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন লুকিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকাদের বিয়ের ব্যবস্থা করতে শুরু করেন। তা জানতে পেরে সেন্টের মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন সম্রাট। তারপর থেকেই শুরু হয় ‘ভ্যালেন্টাইন্স ডে’ পালন।
চন্দননগরে অবশ্য রোজই ‘ভ্যালেন্টাইন ডে’। বলছিলেন খলিসানি এলাকার এক বৃদ্ধ। তাঁর কথায়, “আমাদের এই শহর তো ভিতরে ভিতরে প্রেমেরই শহর। সকাল-সাঁঝে স্ট্র্যান্ডে গেলেই বোঝা যায়। শুধু কমবয়সী ছাত্রছাত্রী বা যুবক-যুবতীই নন, এখানে আমাদের বয়সী নারী-পুরুষও দু’দণ্ড কাটিয়ে যান। স্ট্র্যান্ডের সৌন্দর্য সবাইকে টানে।” পরিবেশ-বন্ধু বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় আবার স্মরণ করিয়ে দেন, “শুধু নর-নারীর প্রেমই নয়, এ শহর যে দেশপ্রেম, প্রকৃতি-প্রেম এবং পরিবেশ-প্রেমেরও, তা-ও কিন্তু মাথায় রাখতে হবে।”
প্রেম-দিবসে সে সব আর কে মনে রাখে! এ দিন তো শুধুই আবেগে ভেসে যাওয়া। তবে, কেউ কেউ স্ট্র্যান্ডে যেতে ভয় পান। তাঁরা মূলত কলেজের ছাত্রছাত্রী। কারণ, সেখানে বড়দের চোখে পড়ে যাওয়ার ভয়। তেমনটাই বলছিলেন পাদ্রিপাড়ার অরুন্ধতী বিশ্বাস। তিনি এখন অবশ্য ব্যবসায়ী-ঘরণী। তাঁর কথায়, “আমি ওঁর সঙ্গে স্ট্র্যান্ডে কখনও বসতাম না। যদি কেউ দেখে ফেলে! মাঝেমধ্যে তাই কেএমডিএ পার্কে যেতাম। দু’জনের বাড়িতেও যাতায়াত ছিল।”
ক’দিন ধরেই শহরের বিভিন্ন গয়নার দোকানে, কার্ডের দোকানে, উপহারের দোকানে কমবয়সীদের ভিড়। সর্বত্রই লাল বা গোলাপি রঙের ছড়াছড়ি। আগে উপহার দেওয়া-নেওয়া সীমিত থাকত গোলাপ, পেন, টেডি বেয়ার, সুগন্ধী বা ব্যাগের মধ্যে। এখন কেউ কিনছেন গয়না, কেউ লাল ‘হার্ট শেপড কুশন’, কেউ বা পোশাক। শহরের বাগবাজার এলাকার এক উপহারের দোকানে দেখা গেল রকমারি ‘হার্ট শেপড্ কুশন’। দাম ৩০ থেকে সাড়ে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। দোকানের মালিক রাজা দত্ত বলছিলেন, “গত বার ওই কুশন যত তুলেছিলাম, এ বার তার চেয়ে তিন গুণ বেশি তুলেছি। দেদার বিক্রি। সরস্বতী পুজো থেকেই চলছে।”
এক সময়ে এ শহরে সরস্বতী পুজোই যে ছিল প্রেম উদ্যাপনের দিন, সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন শহরের আর এক বাসিন্দা শুভ্রাংশু রায়। তাঁর কথায়, “আমাদের সময়ে সরস্বতী পুজোটাই ছিল আসল। তার সঙ্গে ছিল মান্না দে’র গান।”
সময় বদলেছে। ফেসবুক, এসএমএসে প্রেমেও গতি এসেছে। ভ্যালেন্টাইনস ডে অন্য ভাবে কাটানোর পরিকল্পনা করে নিচ্ছেন নতুন প্রেমিক-প্রেমিকারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কলেজ-ছাত্রী যেমন বলেই দিলেন, “সকালেই কলকাতা চলে যাব। ওর সঙ্গে সারাদিন ঘুরব। সন্ধ্যায় ফেরা।”
কেউ কেউ অবশ্য নির্জনতার জন্য এগিয়ে রাখছেন কেএমডিএ পার্ককেই। তেমনই এক যুবক তমোঘ্ন রায়। তিনি বলেন, “১৫ টাকা দিয়ে টিকিট কেটে ঢুকে গেলে সারাদিন বেশ কাটানো যায়। বোটিং তো রয়েছেই। খাওয়া-দাওয়া নিয়েও চিন্তা নেই। ভিতরে দোকান। ভাবছি ওখানেই যাব।” কয়েক জন আবার শহরের পার্ক বা রেস্তোরাঁর অপ্রতুলতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
প্রেমিক-প্রেমিকারা স্ট্র্যান্ড বা পার্ক যেখানেই যান, তাঁদের জন্য কিন্তু এই বিশেষ দিনটির জন্য সাবধান-বাণী শুনিয়েছে পুলিশ। প্রকাশ্যে চুমু বা ঘনিষ্ঠ ভাবে বসা নৈব নৈব চ। ধরা পড়লে জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হতে পারে। পুলিশ সুপার সুনীল চৌধুরী জানিয়েছেন, এ দিন বাড়তি নজরদারি চালাবে সাদা পোশাকের পুলিশ। থাকবে মহিলা-পুলিশও।
কিন্তু প্রেম বারণ শুনবে তো!
(অতিরিক্ত প্রতিবেদন: গৌতম বন্দ্যোপাধ্যায়)।-নিজস্ব চিত্র।