দুটো বিস্কুটের একটা তখনও মেয়ের পড়ার টেবিলে পড়ে। পাশে দুধের খালি গ্লাস, তখনও গায়ে দুধ লেগে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার সকাল সওয়া ৬টা নাগাদ নাগাদ মায়ের দেওয়া দুধ ও দুটো বিস্কুটের একটি খেয়ে ‘দেরি হয়ে যাচ্ছে’ বলে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়তে বেরিয়ে গিয়েছিল মনীষা। আরামবাগের মুথাডাঙার পাত্রপাড়ার এ বারের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী মনীষা কুণ্ডু। ঠিক এক ঘণ্টা পরে সকাল ৭টা ১৫ মিনিট নাগাদ যখন বাড়িতে খবর আসে তখন অন্যদিনের মতো বাড়ির কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন মা মিঠুদেবী। প্রথমে ঠিকমতো ‘শুনতে’ না পেয়ে ফের জানতে চাওয়ার পর মেঝেতেই মেয়ের নাম ধরে চিৎকার করে বসে পড়েন। বাবা মনোজ কুণ্ডু কোনওমতে ঘটনাস্থলে যান। মেয়ের থ্যাঁতলানো মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে ডুকরে ওঠেন। প্রতিবেশীরা তাঁকে ধরে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
ছোটখাটো ব্যবসা রয়েছে মনোজবাবুর। সকাল ১০টা। টেবিলের উপর তখনও পড়ে দুধের গ্লাস আর বিস্কুট। সেদিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতেই মনোজবাবু বলে ওঠেন, ‘‘দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে পড়া থেকে ফিরে বাকি বিস্কুটটা খাবে বলেছিল। একমাত্র সন্তান আমাদের। আমাদের নিয়ে ওর নানা স্বপের কথা বলত। এখন কী নিয়ে বাঁচব বলুন তো? স্বপ্নের কারিগরকেই তো কেড়ে নিল ভগবান।’’
মা মিঠুদেবী বাড়ির দরজার সামনে মনসা মন্দিরের চাতালে সমানে মাথা ঠুকছেন আর অসংলগ্ন কথা বলে চলেছেন। ঠাকুমা বৃদ্ধা অঞ্জলিদেবী শোকে নির্বাক। চোখের জল মুছতে দেখা গেল বাড়িতে জড়ো হওয়া প্রতিবেশীদের প্রায় সকলকেই। পরিবার সূত্রে জানা গেল, এ দিন সকালে বেশ কিছুটা দূরে হরাদিত্য গ্রামে স্কুলেরই ইংরেজি শিক্ষকের বাড়িতে পড়তে গিয়েছিল মনীষা। বাড়ি থেকে সাইকেলে মুথাডাঙা বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে সেখান থেকে আরও তিন সহপাঠীর (যার মধ্যে শিবানীও ছিল) সঙ্গে বাসে হরাদিত্য যেত সে।
শিবানীর মা ছবিদেবী। ছবি মোহন দাস।
মেয়ের মৃত্যু সংবাদ চারপাশটা শূন্য করে দিয়েছে মনীষার বাড়ি থেকে দুই কিলোমিটার দূরের নায়েক পরিবারেরও। মায়াপুরের কামারপাড়ার বাসিন্দা শিবানী নায়েকও এ দিন চা-বিস্কুট খেয়ে পড়তে বেরিয়ে যায়। বাবা কাঠের কাজ করেন। ঘরে টাঙানো মেয়ের ছবি দেখিয়ে বুক চাপড়াতে চাপড়াতে মা ছবিদেবী বলেন, ‘‘বেরোবার আগে বলেছিল, আলুর তরকারি করতে। ৯টা নাগাদ পড়ে ফিরে মুড়ি দিয়ে খাবে। আমি কিছু জানি না, শুধু মেয়েটাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।’’ বাবা নেপাল নায়েক দরজায় মাথা দিয়ে কেঁদে চলেছেন। বললেন, ‘‘খবর পেয়ে গিয়ে দেখি মেয়ে চোখ চেয়ে শুয়ে আছে। মাথায় হাত বুলিয়ে কত ডাকলাম, সাড়া দিল না। আমার ওপর কি অভিমান ছিল?’’ দিদির এমন মৃত্যু হতবাক করে দিয়েছে ছোট্ট সুমনকেও। ক্লাস এইটের ছাত্র সুমনের সব সময়ের খুনসুটির সঙ্গী ছিল একমাত্র দিদি। বাড়িতে পড়া বুঝিয়ে দেওয়ারও একমাত্র আশ্রয়। কিন্তু এখন? সজল চোখদু’টো প্রতিবেশীদের ভিড়ের মধ্যে যেন তারই উত্তর খুঁজছিল।
স্কুলের দুই ছাত্রীর মৃত্যুতে শোকে মুহ্যমান মুথাডাঙা রামকৃষ্ণ উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পড়ুয়া থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকা, কর্মী সকলেই। স্কুল খোলা থাকলেও হয়নি ক্লাস। কখন মৃতদেহ স্কুলে আনা হবে তারই প্রতীক্ষায় সকলে। দুপুর ২টো নাগাদ দু’জনের দেহ স্কুলে এলে চোখের জল মুছতে দেখা গেল প্রায় সকলকেই। যাঁর কাছে মনীষা ও শিবানী পড়ত সেই ইংরাজির শিক্ষক সন্দীপ পানও ভেঙে পড়েছেন। বললেন, ‘‘সবে পড়াতে বসেছি। একে একে ছাত্রীরা আসছিল। তখনি দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। দেখি দু’জন নিথর হয়ে পড়ে, বাকি দুই ছাত্রী আহত। লোকজনদের সাহায্যে ওদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। স্কুলের প্রধান শিক্ষক শেখ মহম্মদ মহসিন বলেন, ‘‘আমাদের দুই ছাত্রীর মৃত্যুতে আমরা শোকাহত। দু’জনই খুব শান্ত আর মেধাবী ছিল। শিবানী গরিব পরিবারের মেয়ে। মনীষা ওর বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান। ওঁদের কে সান্ত্বনা দেবে?