ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এ ৬০ হাজার ভোটার বাদ দেওয়া হচ্ছে ভবানীপুর বিধানসভায়। এমনটাই অভিযোগ করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোমবার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে হোলি ও দোল উৎসব উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করেন তিনি। ওই বক্তৃতায় নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপির বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়ে মমতা বলেন, ‘‘আমি শক্ড (স্তম্ভিত), এরা অমানবিক, ভিনডিকটিভ কাজ করছে। ভীরু মানুষ পিছন থেকে লড়াই করে। ওরা জেনেশুনে নাম কেটেছে। আমার ভবানীপুর বিধানসভা ছোট একটি কেন্দ্র। আমার কেন্দ্র থেকে ৬০ হাজার ভোটারের নাম কাটা হচ্ছে। কিন্তু তার পরেও আমি বলছি, আমি ভবানীপুর থেকে জিতব, এক ভোটে হলেও জিতব।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘আমার বিশ্বাস আছে ভগবানে, বিশ্বাস আছে মায়ের উপর, বিশ্বাস আছে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধদের প্রতি। আমি ধর্নায় বসব, আমায় মোরাল সাপোর্ট দেবেন।’’
প্রসঙ্গত, মুখ্যমন্ত্রীর ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রথম দফার চূড়ান্ত ভোটার তালিকাপ্রকাশ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে তৃণমূল। এসআইআর প্রক্রিয়া শেষে প্রথম দফায় প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, এই কেন্দ্রে মোট প্রায় ৪৭,০৯৪ জন ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। পাশাপাশি, আরও প্রায় ১৪,১৫৪ জন ভোটারের নাম ‘বিবেচনাধীন’ অবস্থায় রয়েছে। অর্থাৎ, তাঁদের নাম স্থায়ী ভাবে তালিকাভুক্ত হবে কি না, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। এই পরিসংখ্যান সামনে আসতেই মমতা এই প্রথম প্রকাশ্যে নিজের মতামত জানিয়েছেন। কারণ, ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে বিধানসভার উপনির্বাচনে ভবানীপুর কেন্দ্রে বিপুল ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই নির্বাচনে জয়ের ব্যবধান ছিল ৫৮ হাজার ভোটেরও বেশি। সংশোধিত তালিকায় এত বড় সংখ্যক ভোটারের নাম বাদ পড়া ভবিষ্যৎ নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল। ইতিমধ্যে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং ভবানীপুর বিধানসভার বিএলএ-১ এবং বিএলএ-২-দের নিয়ে একাধিক বৈঠক করেছেন। তাতেই বোঝা গিয়েছে যে নিজের বিধানসভা কেন্দ্রের ভোটারদের নিয়ে তাঁর মনোভাবের কথা। তাই দোল উৎসবের মঞ্চ থেকে তিনি নিজের ভবানীপুর বিধানসভা থেকে ফের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথাই চ্যালেঞ্জের সুরে ঘোষণা করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের ব্যবধানের চেয়ে এখন বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে ভোটার তালিকার পরিবর্তন। বিশেষ করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে ভবানীপুরের মতো গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা হ্রাস এবং বিচারাধীন নামের সংখ্যা বৃদ্ধি প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক— দু’দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ। এই পরিস্থিতিতে এসআইআর প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, বাদ পড়া ভোটারদের পুনরায় অন্তর্ভুক্তির সুযোগ এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে আগামী দিনে বিতর্ক আরও তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলেই মনে করছে তৃণমূল।
আরও পড়ুন:
সোমবার মমতা বলেন, ‘‘আমাদের বাংলায় ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করতে চলেছে। আমার মন ভাল নেই। বিয়ের পর স্বামীর বাড়িতে গিয়েছেন, তাঁর নাম কেটে গিয়েছে। জেনুইন ভোটারের নাম কাটা হয়েছে। সব তথ্য দেওয়ার পরেও নাম কেটেছে। নির্বাচন কমিশন বায়াস হয়ে কাজ করেছে। ভ্যানিশ কুমার ভ্যানিশ করছে। মানুষের গণতন্ত্র বিপন্ন। ৫৮ লক্ষের নাম বাদ গিয়েছে ভেরিফিকেশন ছাড়াই।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘মাইক্রো অবজ়ার্ভার বিজেপি অফিসার হয়ে নাম কেটেছে। আমি আজ জানতে পেরেছি কালকে বিএলও-র ব্রেন স্ট্রোক হয়েছে। আজও হয়েছে এক জনের। এখানকার এক জন বদমাইশ লোক আছে, সব দোষ বিএলও-দের উপর দিচ্ছে। ওরা ভাল কাজ করছে। সব দোষ বিজেপির।’’
গত ১ মার্চ থেকে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে পরিবর্তন যাত্রা শুরু করেছে। সেই যাত্রায় একটি রথযাত্রার কর্মসূচি রাখা হয়েছে। সেই প্রসঙ্গ টেনে মমতা বলেন, ‘‘দিল্লির বিজেপির পার্টি অফিস থেকে নাম কাটছে আর এখানে রথযাত্রা পালন করছে। এই রথযাত্রা আপনাদের শেষ রথযাত্রা। বিনাশ যাত্রা হবে। ভবানীপুর ছোট কেন্দ্র। এখানে ২.৬ লক্ষ ভোটার আছে। লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সিতে ১৪ হাজার আরও ২০০০ কেটেছে নাম। আমি চেষ্টা করেছি। ভোটার কোথায়! কেন মিসিং? কোথায় তাঁরা? আমি তো চেষ্টা করেছি।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছি। আমরা শান্তিপূর্ণ ভাবে সহযোগিতা করেছি। ধৈর্য্য ধরেছি। কিন্তু ইচ্ছাকৃত নাম বাদ দিয়েছে। মানুষ কিন্তু তৈরি আছে। এটা ঠিক যার নাম উঠেছে সে এই দুঃখ বুঝবেন না। প্রতিবেশীর নাম কাটলে সে বুঝবে। তবে আজ ওর কেটেছে কাল আপনার কেটেছে।’’
ভবানীপুরে একটি জৈন মন্দির তৈরি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘‘আমি আজকের সব নাচ উপভোগ করলাম। দোল যাতে শান্তি এবং সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে কাটে তার জন্য বলব। সব ক্লাব, ইসকন থেকে শুরু করে সকলে আছেন। জৈন কমিটি একটা অনুরোধ করেছিল নিউটাউনে জমি চাই । জৈন মন্দির তৈরির জন্য। আমি বিশ্ব বাংলা গেটের পাশে জমি দেওয়া হবে। আপনারা মন্দির তৈরি করুন।’’