Advertisement
E-Paper

উপহারের ভ্রূণে বাঁধা পড়লেন দু’বাংলার মা

পুজোর কলকাতা থেকে জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি নিয়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় ফিরে যাচ্ছেন তিনি। এক ভারতীয় মায়ের যমজ সন্তানেরা নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়েছে তাঁর গর্ভে! বিজ্ঞানের দৌলতে শরীরের বাইরে শুক্রাণু-ডিম্বাণু নিষেক ঘটানো হচ্ছে হামেশাই।

পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৭ অক্টোবর ২০১৬ ০৩:৪৫

পুজোর কলকাতা থেকে জীবনের শ্রেষ্ঠ উপহারটি নিয়ে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় ফিরে যাচ্ছেন তিনি। এক ভারতীয় মায়ের যমজ সন্তানেরা নিশ্চিন্ত আশ্রয় পেয়েছে তাঁর গর্ভে!

বিজ্ঞানের দৌলতে শরীরের বাইরে শুক্রাণু-ডিম্বাণু নিষেক ঘটানো হচ্ছে হামেশাই। সেই ইনভিট্রো ফার্টিলাইজেশনই (আইভিএফ) এক সূত্রে বেঁধে ফেলল দুই বাংলার দুই মা-কে। মানবিক তাগিদে অঙ্গদানের কথা শোনা যায়। শুক্রাণু বা ডিম্বাণু দানের রেওয়াজও আছে। কিন্তু ভ্রূণ দান? সেই বিরল ঘটনার সাক্ষী থাকল কলকাতা।

এ পার বাংলায় নদিয়া জেলার বড়জাগুলি এলাকার শিপ্রা কুণ্ডু (নাম পরিবর্তিত) আইভিএফ-এর মাধ্যমে যমজ সন্তানের মা হয়েছিলেন। তাঁর ডিম্বাণু ও তাঁর স্বামীর শুক্রাণুকে ল্যাবরেটরিতে মিলিয়ে একাধিক ভ্রূণ তৈরি করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি ভ্রূণকে প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল শিপ্রা দেবীর গর্ভে। তার থেকে যমজ ছেলেমেয়ে হয় ওই দম্পতির। অবশিষ্ট ছিল আরও তিনটি ভ্রূণ। যেগুলি ল্যাবরেটরিতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। পরবর্তী কালে আবার সন্তান চাইলে ওই ভ্রূণগুলি মহিলার গর্ভে ফের প্রতিস্থাপন করা যেত। কুণ্ডু দম্পতি ওই তিনটি ভ্রূণই দান করেছেন সাতক্ষীরার গাবা গ্রামের বাসিন্দা সর্বাণী দাসকে (নাম পরিবর্তিত)। তার থেকে এখন যমজ সন্তান গর্ভে ধারণ করছেন ওই মা। শিপ্রা ও সর্বাণীর দুই জোড়া যমজ এক অর্থে পরস্পরেরও যমজ। কারণ ভ্রূণ হিসেবে তাদের জন্ম সময় এক। কিন্তু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময়টা আলাদা।

Advertisement

প্রবীণ চিকিৎসক বৈদ্যনাথ চক্রবর্তী বলছেন, জিনগত অসুখ থাকলে বা বেশি বয়সে পৌঁছে শুক্রাণু-ডিম্বাণু না থাকলে কারও দান করা ভ্রূণই সন্তানলাভের উপায়। প্রক্রিয়াটিকে বলা যেতে পারে, ভ্রূণ দত্তক নেওয়া। মা গর্ভ ধারণ করবেন, পিতা থাকবেন পালকের ভূমিকায়। সারোগেসি যে ভাবে জননী মা আর গর্ভধারিণী মা-কে আলাদা করে দেয়, এ ক্ষেত্রেও সেটাই হবে। প্রস্তাবিত সারোগেসি বিলে, বাণিজ্যিক সারোগেসি নিষিদ্ধ হতে পারে। কিন্তু ভারতীয় দম্পতির দান করা ভ্রূণ কোনও ভিনদেশি মায়ের জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করায় কোনও বাধা নেই।

কুণ্ডু দম্পতি বিয়ের বারো বছর পরেও নিঃসন্তান ছিলেন। তাঁরা চিকিৎসক সুদর্শন ঘোষদস্তিদারের কাছে আসেন গত বছর জুন মাসে। তাঁদের যমজ সন্তান হয় এ বছর এপ্রিলে। ২৫ মে তাঁরা তাঁদের উদ্বৃত্ত তিনটি ভ্রূণ লিখিত ভাবে দান করেন। সেই তিনটি ভ্রূণই গত মাসে প্রতিস্থাপিত হয়েছে সর্বাণীর গর্ভে। সুদর্শনবাবু বলছিলেন, ‘‘অনেক দম্পতি ভ্রূণ বছরের পর বছর

ল্যাবরেটরিতে রেখে দেন। হয়তো তাঁদের সন্তান হয়ে গিয়েছে। আর সন্তানের কথা ভাবছেনও না। তা সত্ত্বেও ভ্রূণটি গবেষণার কাজে লাগানো বা অন্য কোনও দম্পতিকে দান করার ব্যাপারে তাঁরা এগিয়ে আসেন না। সে দিক দিয়ে দাস সম্পতির কপাল ভাল ছিল যে, তাঁরা কুণ্ডু দম্পতির দান করা ভ্রূণ তিনটি পেয়ে গিয়েছিলেন।’’ আর এক মায়ের গর্ভে তাঁর যমজ ভ্রূণ বড় হচ্ছে বলে খবর পেয়ে উচ্ছ্বসিত শিপ্রাও। বললেন, ‘‘মা হিসেবে এ বার নিজেকে আরও পরিপূর্ণ মনে হচ্ছে। ওরা সবাই সুস্থ থাকুক।’’

চিকিৎসকেরা এইখানেই মুক্ত কণ্ঠে বাহবা দিচ্ছেন শিপ্রা এবং তাঁর স্বামীকে। কারণ আইভিএফ-এর মাধ্যমে সন্তানধারণ এখন খুবই প্রচলিত। অধিকাংশ দম্পতিই তাঁদের ভ্রূণ সংরক্ষিত করে রাখতে চান। কিন্তু সন্তান হয়ে যাওয়ার পরে অনেকেই সংরক্ষিত বাকি ভ্রূণ বা ‘ফ্রোজেন এমব্রায়ো’ সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েন। ফলে ল্যাবরেটরিতে ক্রমাগত সেগুলি জমতে থাকে। সেই সংরক্ষিত ভ্রূণ কাউকে দান করা যাবে কিনা বা গবেষণায় লাগানো যাবে কিনা অথবা নষ্ট করে ফেলা হবে কিনা জানতে চেয়ে চিঠি দিলে বা ফোন করলে জবাবও দেন না অনেকে। বন্ধ্যত্ব বিশেষজ্ঞ ইন্দ্রাণী লোধের কথায়, ‘‘সাধারণত ৫ বছর রাখার পর সংরক্ষিত ভ্রূণের কোনও দাবিদার না এলে সেটা নষ্ট করে ফেলা যায় বা অন্য কাজে লাগানো যায়। কিন্তু অনেক চিকিৎসকই আইনের চক্করে ফেঁসে যাওয়ার ভয়ে ইতস্তত করেন।’’ চিকিৎসকদের বক্তব্য, এগুলি সংরক্ষণের জন্য তরল নাইট্রোজেন দরকার। লাগাতার তার জোগান দেওয়া বেশ খরচসাপেক্ষ। দম্পতিদের অনেকে সেটাও বহন করেন না।

অথচ এই ভ্রূণ দান করা হলে অনেক সন্তানহীন দম্পতির মুখে হাসি ফুটতে পারে। কয়েক বছর আগে স্পার্ম ডোনেশন বা শুক্রাণুদান নিয়ে হিট ছবি ‘ভিকি ডোনর’ তৈরি করেছিলেন সুজিত সরকার। তিনি বললেন, ‘‘ভ্রূণ দানের বিষয়টি নিয়েও আমরা আলোচনা করেছিলাম তখন। মানুষ যদি নিজেদের উদ্বৃত্ত ভ্রূণ দান করেন, তা হলে সন্তানকামী অনেক দম্পতির সমস্যা মিটতে পারে।’’ বিশেষত যাঁরা জিনগত অসুখে ভুগছেন, তাঁদের জন্য এই ভ্রূণই হতে পারে আশীর্বাদ।

চব্বিশ বছরের বিবাহিত জীবনে দাস দম্পতির যেমন তিনটি সন্তান হয়েছিল। তিন জনেই প্রতিবন্ধী। দু’টি সন্তান ইতিমধ্যেই মারা গিয়েছে। জীবিত সন্তানটি মূক ও বধির। মানসিক রোগও রয়েছে। সর্বাণীর জিনগত সমস্যার কারণেই এমন হচ্ছে বলে জানান চিকিৎসকেরা। ফলে সুস্থ সন্তানের জন্য তাঁদের কারও দান করা ভ্রূণই দরকার ছিল। আনন্দের কান্না এখন যেন বাঁধ মানছে না সর্বাণীর। হাসিকান্না মিশিয়ে বলছেন, ‘‘একটা সুস্থ সন্তানের ‘মা’ ডাক শোনার জন্য ২৪ বছর অপেক্ষা করেছি। কলকাতা থেকে সেই ইচ্ছাপূরণের ডালি নিয়ে দেশে ফিরছি।’’

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy