ভিড় করে থাকা জনতা। সেই জনতাকে ছুঁয়ে যায় নেতানেত্রীর হাত। ওই স্পর্শই তাঁদের সঙ্গে ভোটারের সেতু গড়ে দেয়।
বদলে যাওয়া যুগে স্পর্শও বদলেছে। এখন স্মার্টফোনের পর্দা স্পর্শ করে রিল দেখতে দেখতে তৈরি হয়ে যায় ভোটদানের পছন্দ। তাই ভোটারের ব্যক্তিগত পরিসরেই ঢুকতে চাইছে রাজনৈতিক দলগুলি। সাহায্য করছে যন্ত্র-মেধা। প্রতিটি ভোটারের নামে তৈরি হচ্ছে ফোন কল, যেখানে ভোটারের নাম উল্লেখ করে পরিচিত নেতা তাঁর খোঁজ নেবেন। নিজের নাম শুনে খুশি হবেন ভোটার। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর আলাদা ভাষা এবং চাহিদা মেনেই যন্ত্র-মেধার সাহায্যে খুব কম সময়ে তৈরি করা যায় এমন অসংখ্য ফোন কল।
গত লোকসভা ভোটে যন্ত্র-মেধা নির্ভর এমন প্রচার উপাদান তৈরি করতে বহু সংস্থা বরাত পেয়েছিল। বিহারের ভোটে কাজ করা ভোট-কুশলী সংস্থার এক পেশাদার বললেন, “শহুরে ভোটারেরা অনেক সময় এমন ফোন পেলে শুনেই কেটে দেন। কিন্তু গ্রামে বহু ভোটার প্রশ্ন শুনে নিজের সমস্যার কথা বলেন। সেটাই রাজনৈতিক দলগুলির পুঁজি।” ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের বাড়তি সুবিধে, তারা এই তথ্য জেনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে পারে প্রশাসনের মাধ্যমে। তবে বিরোধীরাও এলাকার সমস্যা অনুযায়ী নির্দিষ্ট প্রচারের সুযোগ পায়। পশ্চিমবঙ্গের মতোই বিরোধী-শাসিত একটি রাজ্যে শাসক দলের সহযোগী ভোট-কুশলী সংস্থার এক কর্তা বললেন, “যন্ত্র-মেধা লক্ষ লক্ষ ফোন কল থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে খুব দ্রুত ম্যাপিং করতে পারে। তা থেকে ভৌগোলিক, ভাষাগত বা জাতিগত গোষ্ঠীর চাহিদা সম্বন্ধে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। আমাদের কাজ অনেকটা সহজ হয়ে যায়।” এ ছাড়া, নানা ব্যবসায়িক অফার, ফর্ম পূরণ ইত্যাদির মাধ্যমে অজান্তে তথ্য ছড়িয়ে যায় বাজারে।
বিজেপির দেশজোড়া সাফল্যের পিছনেও রয়েছে এই তথ্যভান্ডার। এ ক্ষেত্রে তাদের হাতিয়ার ‘সরল’ (‘সংগঠন রিপোর্টিং অ্যান্ড অ্যানালিসিস’) অ্যাপ। বুথ স্তর থেকে এই অ্যাপের মাধ্যমে ভোটারদের তথ্য আসে দলীয় নেতৃত্বের কাছে। বুথ স্তরের কর্মীদের কাজ, যে সব নাগরিক দলের বিভিন্ন খবর পেতে চান তাঁদের এই অ্যাপে নথিভুক্ত করানো। বিজেপির আইটি সেলের প্রধান অমিত মালবীয় বছর দুয়েক আগে একটি প্রযুক্তি সম্মেলনে এই অ্যাপকে ‘ভোট জেতানোর যন্ত্র’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের কী অবস্থা? তৃণমূল সূত্রে জানা যাচ্ছে, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) সময় কমিশনের তরফে বুথ স্তরের অফিসারেরা (বিএলও) যেমন ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করেছেন, তেমনই তৃণমূলের এজেন্টরা (বিএলএ) ভোটারদের তথ্য তুলেছেন ‘দিদির দূত’ অ্যাপে। বুথ থেকে সরাসরি তথ্য পৌঁছেছে রাজ্য নেতৃত্বের কাছে। দলীয় সূত্রে দাবি, দলের একেবারে শীর্ষ স্তর থেকেই এই তথ্য আপলোডের কথা বলা হয়েছে।
তথ্য হাতের মুঠোয় এলে তা ব্যবহার করা যায় নানা ভাবে। বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী, যাকে বিপণনের পরিভাষায় বলে ‘টার্গেটেড অডিয়েন্স’, তাদের জন্য তৈরি করা যায় প্রচারের ভিন্ন নকশা। একাধিক সংস্থা সূত্রে জানা গেল, গলার স্বর যন্ত্র-মেধার সাহায্যে ক্লোন করে অডিয়ো-মেসেজ তৈরির খরচ ৬০ হাজার থেকে ১০ লক্ষ টাকা, প্রচারের পরিধি ও গুণমান অনুসারে। কোনও ব্যক্তির ডিজিটাল অবতার তৈরি করতে লাগে এক লক্ষ টাকা। ওয়টস্যাপে সেই প্রচার-উপাদান পাঠানোর চুক্তি নির্দিষ্ট সংস্থার সঙ্গে হয় রাজনৈতিক দলগুলির। কখনও বার্তা পিছু ৩০-৩৫ টাকা, কখনও সামগ্রিক কয়েক লক্ষ টাকারও চুক্তি হয়।
কিন্তু যন্ত্র-মেধার বিশ্লেষণ কতটা নির্ভরযোগ্য? যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক উজ্জ্বল মৌলিক জানাচ্ছেন, যন্ত্র-মেধার বিশ্লেষণ যে ১০০ শতাংশ নির্ভুল তা বলা যাবে না। তাঁর কথায়, “অবশ্যই ওই বিশ্লেষণ যাচাই করে নিতে হবে। যেহেতু যন্ত্র-মেধা মানুষের দেওয়া নির্দেশ এবং তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করে, তাই ঠিক ফল পেতে তাকে যথাযথ নির্দেশ দিতে হবে।” কিন্তু সেই নির্দেশ যদি দেওয়া হয় অসৎ উদ্দেশ্যে? তা রোখার উপায় আছে কি?
(চলবে)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)