মাস ছয়েক আগে শহর কলকাতার অমানবিক মুখের এক ছবি দেখে নিজের মানবিক হাত বাড়িয়েছিলেন তমলুকের বাসিন্দা দেবপ্রিয় অধিকারী। সোমবার নিজেই তিনি হয়ে উঠলেন একই ধরনের অমানবিক ঘটনার শিকার। তবে তিনি পাশে পেলেন দুই মানবিক মুখকে।
মাস ছয়েক আগে মিন্টো পার্ক এলাকায় রাস্তার পাশে পড়ে কাতরাচ্ছিলেন দুর্ঘটনাগ্রস্ত এক যুবক। বাস থেকে নামতে গিয়ে পায়ের উপর দিয়ে চাকা চলে যাওয়ায় রক্তাক্ত অবস্থায় সেই যুবকটি ছটফট করছিলেন। কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে দেবপ্রিয়বাবু সেই যুবক বংশী মাইতিকে তুলে নিয়ে গিয়ে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছিলেন।
সোমবার, ছ’মাস পরে খোদ দেবপ্রিয়বাবু বাসের মধ্যে মাথা ঘুরে পড়ে অজ্ঞান যান। অভিযোগ, বাস থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় তাঁকে রাস্তার পাশে ফুটপাথে ফেলে দিয়ে পালিয়ে যান বাসের চালক ও কন্ডাক্টর। যাত্রীরা কেউ এগিয়ে আসেননি। পরে তাঁরই মতো এগিয়ে আসেন দুই ব্যক্তি- বিজয় রায় এবং মহম্মদ শামিম। তাঁকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যান তাঁরা।
কী হয়েছিল এ দিন?
দেবপ্রিয়বাবুকে উদ্ধার করা ব্যক্তি বিজয় রায় জানান, সকাল পৌনে ১১টা নাগাদ তিনি চৌরঙ্গি রোড এবং মেয়ো রোডের মোড়ে দাঁড়িয়েছিলেন বাস ধরবেন বলে। হঠাৎ তিনি দেখেন, উল্টো দিকের রাস্তার পাশে একটি মিনিবাস এসে থামল এবং সেই বাসের চালক এবং কন্ডাক্টর এক জনকে ধরাধরি করে নামিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু দূর থেকে কাকে নামানো হচ্ছে তা তিনি বুঝতে পারেননি বলেই জানিয়েছেন। এর পরই মিনিবাসটি চলে গেলে ফুটপাথের পাশে ফেলে রেখে যাওয়া ব্যক্তিকে ঘিরে লোকজন জড়ো হতে দেখেই তিনি রাস্তা পার করে ঘটনাস্থলে পৌঁছন বলে জানান।
বিজয়বাবুর কথায়, ‘‘আমি গিয়ে দেখি এক ব্যক্তি বসে রয়েছেন। তাঁর মাথা দিয়ে গলগল করে রক্ত বেরোচ্ছে। কিন্তু তিনি কোনও কথা বলতে পারছেন না। আমি ভিড় ঠেলে কাছে পৌঁছে ওই ব্যক্তিকে হাসপাতালে ভর্তির কথা বলতেই ভিড়টা যেন এক নিমেষে সরে গেল। আমি বুঝলাম যা করার আমাকেই করতে হবে। ট্যাক্সি ধরার জন্য হাত দেখালাম। কিন্তু রক্তাক্ত ব্যক্তিকে দেখে কোনও ট্যাক্সিও দাঁড়াল না। এর পর আমি মোবাইল থেকে অ্যাপনির্ভর ট্যাক্সি বুক করি। এরই মাঝে এক যুবক এসে বলেন তিনি আমার সঙ্গে হাসপাতালে যেতে রাজি আছেন।’’ বিজয়বাবু জানান, এর পরই তিনি আর মহম্মদ শামিম নামে ওই যুবক ট্যাক্সিতে রক্তাক্ত ব্যক্তিকে তুলে এসএসকেএম-এর জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। সেখানেই ওই ব্যক্তির মাথায় সেলাই করানোর পাশাপাশি সিটি স্ক্যান করানো হয়। জানতে পারেন তাঁর পরিচয়।
পরে সুস্থ হয়ে সেই দেবপ্রিয়বাবু জানান, মাঝে মাঝেই তাঁকে ব্যবসার কাজে কলকাতায় আসতে হয়। এ দিনও সেই কাজেই তমলুক থেকে বাসে করে এসে নেমেছিলেন ধর্মতলায়। পরে সেখান থেকে বেক বাগান যাবেন বলে ধর্মতলা থেকে বিবাদী-রামগড় মিনিবাস ধরেন। বাসে ওঠার পরে বসার জায়গাও পেয়ে যান তিনি। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি অসুস্থবোধ করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘হঠাৎ করে মাথাটা ঘুরে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সিট থেকে প়ড়ে যাই। জ্ঞান ফেরে যখন দেখি আমাকে বাস থেকে ধরাধরি করে নামিয়ে দিচ্ছে। পরে দু’জন এসে আমাকে নিয়ে হাসপাতালে যান।’’
এ দিনের ঘটনায় বাসচালক ও কন্ডাক্টরের ভুমিকা প্রসঙ্গে মিনিবাস অপারেটর্স কো-অর্ডিনেশন কমিটির-র সাধারণ সম্পাদক অবশেষ দাঁ বসেন, ‘‘বাসচালক এবং কন্ডাক্টরের ভূমিকা কী ছিল তা দেখব।’’ যদিও তাঁর পাল্টা উত্তর, ‘‘বাস থেকে কোনও এক জন অসুস্থ ব্যক্তিকে নামিয়ে দেওয়া কন্ডাক্টরের একার পক্ষে সম্ভব নয়। নিশ্চয় যাত্রীরাও সঙ্গে ছিলেন। তাঁদের তো প্রতিবাদ করা উচিত ছিল।’’