কখনও বলা হয়েছে, তিনি পর্নোগ্রাফিক ভিডিয়ো তৈরির সঙ্গে যুক্ত। কখনও বলা হয়েছে, মানব পাচারে নাম জড়িয়েছে তাঁর। কখনও আবার হুমকি দেওয়া হয়েছে, পাচারের টাকা তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রয়েছে! নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখতে দিতে হবে এবং অ্যাকাউন্টের টাকা তাঁদের কাছে পাঠাতে হবে, এমন দাবিও করা হয়েছে। নয়তো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ‘ডিজিটাল অ্যারেস্ট’ করা হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ভাবেই এক প্রবীণ চিকিৎসককে সাইবার প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ। হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ৯৫ লক্ষ টাকা।
প্রতারিত ওই ব্যক্তি গত শুক্রবার লেক টাউন থানার দ্বারস্থ হয়েছেন। এর আগে ন্যাশনাল সাইবার ক্রাইম রিপোর্টিং পোর্টালে অভিযোগ জানিয়েছেন। কিন্তু টাকা উদ্ধার করা তো দূর, মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত এই ঘটনায় কাউকে গ্রেফতারই করতে পারেনি পুলিশ। দ্রুত তদন্ত করার বদলে ‘জ়িরো এফআইআর’ রুজু করে মামলাটি বাঁকুড়ায় পাঠিয়ে দিয়েছে লেক টাউন থানা। এতে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বার বারই বলা হচ্ছে, আর্থিক প্রতারণার ঘটনা ঘটার পরের কয়েক ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যত দ্রুত পুলিশের দ্বারস্থ হওয়া যাবে, ততই বেশি খোয়া যাওয়া টাকা উদ্ধার করার সম্ভাবনা বাড়বে। তা সত্ত্বেও কী ভাবে দ্রুত তদন্ত শুরু করার বদলে জ়িরো এফআইআর করে মামলা স্থানান্তরিত করে দেওয়া হল? লেক টাউন থানা বিধাননগর কমিশনারেটের অন্তর্গত। পুলিশকর্তারা এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি।
৮৪ বছরের প্রতারিত ওই ব্যক্তি এক সময়ে স্কুল অব ট্রপিক্যাল মেডিসিনের ডিরেক্টর ছিলেন। তাঁর স্ত্রী, ৮৩ বছরের বৃদ্ধা এক সময়ে অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর অব হেল্থ সার্ভিসেস (নার্সিং) ছিলেন। অবসর গ্রহণের পরে বাঁকুড়ার ছাতনায় একটি গ্রামীণ হাসপাতাল তৈরি করেন ওই দম্পতি। গত ২৭ ডিসেম্বর সেখানে থাকাকালীনই প্রথম প্রতারকের ফোন পান বৃদ্ধ। অভিযোগ, তাঁকে বলা হয়, পর্নোগ্রাফি তৈরির সঙ্গে তাঁর যুক্ত থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। অভিযোগ অস্বীকার করলে একাধিক নম্বর থেকে তাঁকে ইন্টারনেট কল করে জেরা করা হয়। প্রতারিতের দাবি, ‘‘বেঙ্গালুরুর সাইবার ক্রাইম বিভাগ থেকে তদন্তের নামে একাধিক বার ফোনে জেরা করা হয়। এক সময়ে জানানো হয়, আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, তা ভুয়ো। আমাকে একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট দেওয়া হবে বলেও জানানো হয়। কিন্তু তার পরেই মুম্বইয়ের সিবিআই দফতরের নাম করে ফোন আসে। আমি নাকি মানব পাচারে যুক্ত। আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে পাচারের টাকা আছে। যে কোনও মুহূর্তে আমাকে গ্রেফতার করা হবে! ভারতীয় সিক্রেট সার্ভিস আইনে তদন্ত চলছে। এ ব্যাপারে কাউকে জানালে আরও কড়া পদক্ষেপ করা হবে। আমি ভয় পেয়ে যাই। স্ত্রী, পুত্র কাউকেই কিছু জানাইনি। আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ভেরিফিকেশনের জন্য অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা আর একটি অ্যাকাউন্টে পাঠাতে বলা হয়। সেই মতো লেক টাউনের অ্যাকাউন্ট থেকে ৭ জানুয়ারি ৬০ লক্ষ এবং ১৩ জানুয়ারি ৩৫ লক্ষ টাকা পাঠাই। পরে বুঝতে পারি, প্রতারিত হয়েছি।’’
কিন্তু সংবাদমাধ্যম-সহ নানা জায়গায় বার বার প্রচার সত্ত্বেও এ বিষয়ে সতর্ক হলেন না কেন? প্রবীণের দাবি, ‘‘ছাতনার যে গ্রামে হাসপাতাল বানিয়েছি, সেখানে খবরের কাগজ সহজে মেলে না। ফলে, বুঝতেই পারিনি।’’ পুলিশ কী বলছে? জ়িরো এফআইআর করা ছাড়া সে ভাবে কিছুই করা হয়নি বলে খবর। আপাতত তদন্ত চালাচ্ছে বাঁকুড়া পুলিশ। বৃদ্ধের দাবি, ‘‘বিধাননগর বা কলকাতা পুলিশ তদন্ত করলে ভাল হত। এখন অপেক্ষাই ভরসা।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)