সারাদিন ঘুরে ঘুরে ফুলের সাজের কাজ। সন্ধ্যায় নাজিরাবাদের বাড়িতে ফেরা। এটাই ছিল আমাদের মতো ফুলের কারিগরদের রোজনামচা। রবিবারও সন্ধ্যায় কাজ সেরে ফিরে স্ত্রীকে ফোন করি। রাতে খাওয়া সেরে সাড়ে ৯টা নাগাদ ঘুমিয়েও পড়ি। ভোরে কাকা শশাঙ্ক জানার ডাকে যখন ঘুম ভাঙল, দেখি চারপাশ দাউদাউ করে জ্বলছে। ধোঁয়ায় সব অন্ধকার। দম বন্ধ হয়ে আসছে।
ওই বাড়ি থেকে বেরোনোর দু’টি দরজা। কিন্তু এক দিকে আগুন ছড়িয়েছে। কোনও রকমে দোতলা থেকে নীচে ঝাঁপাই। পায়ে চোট পাই। তবে সেখানে আগুন ছিল না। আশপাশে সব জ্বলছিল। পাশ কাটিয়ে বেরোই। আমার ঘরের আরও তিন জনও বেরোতে পেরেছে। কিন্তু কাকা-সহ বাকিদের আর দেখিনি।
পূর্ব মেদিনীপুরের তমলুক থানার শালিকা ধনিচক গ্রামে বাড়ি আমার। গত ১০ বছর কলকাতায় ফুলের সাজের কাজ করছি। কিছুদিন চেন্নাইতেও ছিলাম। এখন যেখানে কাজ করছিলাম, সেই কাঁথির সংস্থার মালিকের নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে দোতলা টিনের বাড়ি আছে। সেখানেই আমাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। দোতলায় তিনটি বড় ঘর। প্রতিটিতে ৩০-৪০ জন থাকতে পারে। দুই ঘরের মাঝে টিনের দেওয়াল। একটা ঘরে আমরা ১৬-১৭ জন থাকতাম। আমার সঙ্গে কাকাও থাকতেন। পাশের ঘরে যে জনা ১৫-১৬ কারিগর থাকতেন, তাঁদেরও বেশিরভাগেরই বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরে। বাড়ির পিছন দিকে রান্নার ব্যবস্থা ছিল। আর এক তলায় গুদামে শুকনো ফুল, কাঁচা ফুল, থার্মোকল, প্লাইউড-সহ বিভিন্ন জিনিস মজুত থাকত। পাশেই ছিল মোমো তৈরির কারখানা ও গুদাম।
এখন টিভিতে, মোবাইলে দেখছি, সব পুড়ে ছারখার। কী ভাবে যে ওই জতুগৃহ থেকে বেরোলাম, ভাবলে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে। ডান পা, বাঁ গাল ঝলসে গিয়েছে। আমাদের চিকিৎসা হয়েছে এসএসকেএম হাসপাতালে। তার পরে বাড়ি ফিরেছি।
আমি এ যাত্রা বেঁচে গেলাম। চিন্তা হচ্ছে কাকা আর বাকিদের জন্য। জানি না, কী অবস্থায় আছে!
(অনুলিখন: আনন্দ মণ্ডল)
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)