জন্মের পর থেকেই সর্দি-কাশির সমস্যা লেগে থাকত। অনেক চিকিৎসককে দেখিয়েও সেই সমস্যা মেটেনি। বরং, বয়স বাড়ার সঙ্গে সর্দি-কাশির সমস্যা বেড়েছে। মাসকয়েক আগে তার হৃৎপিণ্ডে ফুটো রয়েছে জানতে পেরে ছ’বছরের ছেলেকে নিয়ে বেঙ্গালুরু পাড়ি দিয়েছিলেন বাবা-মা। পরীক্ষায় জানা যায়, স্বাভাবিক ভাবে হৃৎপিণ্ডের রক্ত সঞ্চালনের যে পদ্ধতি থাকে, ওই শিশুর জন্মগত ভাবে তার পুরোটাই উল্টো রয়েছে। তবে ভিন্ রাজ্যের হাসপাতালে অস্ত্রোপচার সম্ভব না হলেও কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে প্রায় আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে প্রাণের ঝুঁকি কাটিয়ে উঠেছে মালদহের ওই শিশুটি।
মালদহের বাসিন্দা ওই শিশুটির নাম ঋষভ ভগত। তার বাবা বিভিন্ন জায়গায় ঠিকা কর্মীর কাজ করেন। মা আঁচল ভগত জানাচ্ছেন, বেঙ্গালুরুতে তাঁদের জানানো হয়, অস্ত্রোপচার করতে দিল্লি যেতে হবে। কিন্তু তাঁরা আর সেখানে যাননি। বদলে একবালপুরের কাছে একটি বেসরকারি হাসপাতালে এসে শিশু-হৃদ্রোগ চিকিৎসককে দেখান। তিনিই তড়িঘড়ি অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ওই হাসপাতালেরকার্ডিয়োথোরাসিক অ্যান্ড ভাস্কুলার শল্য চিকিৎসক কুন্তল রায়চৌধুরীর কাছে পাঠান ঋষভকে। কুন্তল বলেন, ‘‘দ্রুত অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ছিল। না হলে ধীরে ধীরে হার্ট-ফেলিওর হয়ে বড় বিপদ হতে পারত।’’
চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, স্বাভাবিক ভাবে হৃৎপিণ্ডের ডান অলিন্দের সঙ্গে যুক্ত থাকে ডান নিলয়। কিন্তু, ঋষভের ক্ষেত্রে ডান অলিন্দের সঙ্গে বাম নিলয় যুক্ত ছিল। আবার, স্বাভাবিক ভাবে ডান নিলয় থেকে বেরোনো ধমনীর সঙ্গে ফুসফুসের যোগ থাকে, এবং বাম নিলয় থেকে মহাধমনী বেরিয়ে সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করে। কিন্তু ওই শিশুর সেটিও ছিল উল্টো— তার মহাধমনী যুক্ত ছিল ডান নিলয়ের সঙ্গে। কুন্তল বলেন, ‘‘বাম নিলয় সব সময়েই শক্তিশালী হয়। সেই তুলনায় অনেকটাই দুর্বল থাকে ডান নিলয়। কিন্তু শিশুটির সেখানে মহাধমনী থাকায়, ক্রমাগত রক্ত সঞ্চালন করার ফলে ডান নিলয়ে অতিরিক্ত চাপ পড়ছিল। তার ফলে ভাল্ভ ফুটো হয়ে গিয়েছিল।’’ চিকিৎসার পরিভাষায় জন্মগত এই ত্রুটিকে বলা হয়— ‘কনজেনিটালি কারেক্টেড ট্রান্সপজ়িশন অব গ্রেট আর্টারিস’।
বিএম বিড়লা হাসপাতালে গত মাসে শিশুসাথী প্রকল্পে ঋষভের অস্ত্রোপচার করা হয়। মোট আট ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা তার হৃৎপিণ্ড বন্ধ রাখা হয়েছিল। কুন্তলের পাশাপাশি, ঋষভকে প্রথমে যে শিশু-হৃদ্রোগ চিকিৎসক শ্যামাজিৎ সমাদ্দারের কাছে দেখানো হয়েছিল, তিনি এবং ‘পেডিয়াট্রিক কার্ডিয়াক ইন্টেনসিভ কেয়ার’-এর চিকিৎসক শতরূপা মুখোপাধ্যায়, কার্ডিয়াক অ্যানাস্থেটিস্ট প্রবীরকুমার দাসের দল পুরো অস্ত্রোপচারে ছিলেন। কুন্তল জানাচ্ছেন, ‘ডাবল সুইচ সার্জারি’ এবং ‘ডিকেএস’— এই দুই পদ্ধতিতে পুরো অস্ত্রোপচারটি করা হয়েছে। অর্থাৎ, ডান অলিন্দের সঙ্গে ডান নিলয় যুক্ত করা হয়েছে। আবার, হৃৎপিণ্ডে থাকা ফুটোর মাধ্যমেই বাম নিলয়ের সঙ্গে মহাধমনীকে যুক্ত করা হয়েছে। চিকিৎসকদের পাশাপাশি পারফিউশনিস্ট এবং নার্সদেরও ভূমিকাও ওই অস্ত্রোপচারে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
কুন্তল বলেন, ‘‘মহাধমনী যুক্ত করার পাশাপাশি, আরও একটি রাস্তাও তৈরি করা হয়েছে। যাতে বয়সের সঙ্গে হৃৎপিণ্ডের ছিদ্র আর না বাড়লেও রক্ত সঞ্চালন বাধাপ্রাপ্ত না হয়। ওই নতুন রাস্তা দিয়েই মহাধমনীতে রক্ত যেতে পারবে।’’ অস্ত্রোপচারের পরে প্রায় ২২ দিন হাসপাতালে কাটিয়ে গত ২৭ মে ছুটি পেয়েছে ঋষভ। চিকিৎসকদের কাছাকাছি থাকার জন্য কলকাতাতেই কিছু দিন ঘর ভাড়া নিয়ে ছিল তার পরিবার। ওই বালক এ বার সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন কাটাতে পারবে বলেই দাবি চিকিৎসকদের।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)