E-Paper

নজরদারি করবে কে? জলা ভরাটের অঢেল টাকা ওড়ে নাজিরাবাদে

এক ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা, ‘‘গুদামঘর ভাড়ায় নিতে গিয়ে এমন এক নেতার কাছে যেতে হয়েছিল, যিনি রাজ্য রাজনীতিতে পরিচিত নাম। কলকাতা পুরসভার সঙ্গেযুক্ত এক মহিলার মাধ্যমে তাঁকেমাসে মাসে ভাড়ার টাকা পাঠাতে হয়।’’

নীলোৎপল বিশ্বাস, চন্দন বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:২৯
জলাভূমির অংশ দখল করে তৈরি হয়েছিল গুদাম।

জলাভূমির অংশ দখল করে তৈরি হয়েছিল গুদাম। ছবি: সুদীপ্ত ভৌমিক।

কলকাতা পুলিশের এলাকা থেকে কার্যত ঢিল ছোড়া দূরত্ব। তবে, কলকাতা পুলিশের অন্তর্গত নয়।বরং, এলাকাটি প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরের বারুইপুর পুলিশ জেলার নরেন্দ্রপুর থানার অধীন। কলকাতা এবং জেলা পুলিশের সীমানার এই জটিল বিন্যাসের কারণেই কি দিনের পর দিন নজরদারির বাইরে থেকে গিয়েছে নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদ অঞ্চল? নজরদারির এই ‘ফাঁক’ গলেই কি পর পর জলাজমি ভরাট হয়ে রাতারাতি তৈরি হয়ে গিয়েছে বিশাল বিশাল গুদাম ও বহুতল? এক রাতের অগ্নিকাণ্ডে একসঙ্গে বহু মানুষের পুড়ে মৃত্যুর ঘটনা সামনে আসার পরে এই প্রশ্নই উঠতে শুরু করেছে। সেই সঙ্গেই সামনেআসছে এমন জলাজমি ভরাটের এক চক্রের কথা। অভিযোগ, রীতিমতো সিন্ডিকেট গড়ে জলাজমি ভরাট করা হয়েছে। মোটা টাকায় সেই জমি বিক্রিও হয়েছে। সেই টাকার ভাগ কোন কোন পথে কোথায় পৌঁছেছে, সেই চর্চাও শুরু হয়েছে ‘মৃত্যুপুরী’ ঘিরে।

কান পাতলেই শোনা যায় বছর পাঁচেকের মধ্যে ওই এলাকার চেহারার আমূল বদলে যাওয়ার কথা। কলকাতার আর সম্প্রসারণেরসুযোগ নেই। যা রয়েছে কলকাতার পূর্ব দিকের এই অংশের। এমন ভাবনা থেকেই বছর দশেকআগে ওই এলাকায় একটি চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে স্থানীয়দের দাবি। যে চক্রের প্রধান পান্ডা হিসেবেউঠে আসছে স্থানীয় এক নেতা-দাদার নাম। বর্তমানে তিনি নাকিনিজের দলে অনেকটাই কোণঠাসা। কিন্তু সেই সময়ে কার্যত পুলিশি নজরদারিতেই তিনি জলাজমি ভরাট করিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। বছরের পর বছর এই বেআইনিকাজ চললেও পুলিশের জটিল সীমানা বিন্যাসের কারণে গোটা এলাকাকার্যত প্রশাসনের নজরদারির বাইরে থেকে গিয়েছে। এই অঞ্চলের কলকাতা পুলিশের অধীনে আসার কথা শোনা গেলেও কোনও এক অজ্ঞাত কারণে তা-ও হয়নি। স্থানীয় এক বাসিন্দার মন্তব্য,‘‘বছর কয়েক আগেও খেয়াদা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের এই অঞ্চলে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা কাঠা দরে জমি পাওয়া যেত। বর্তমানে এখানে জমির মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রতি কাঠা ২০ থেকে ২৫ লক্ষ টাকা।’’ আর এক বাসিন্দার মন্তব্য, ‘‘কলকাতায় আড়াই হাজার বর্গফুটের গুদামঘরের ভাড়া মাসে অন্তত দেড় লক্ষ টাকা। কিন্তু এখানে তা ৫০ হাজারে মেলে। ফলে, শহর লাগোয়া এই এলাকায় বহু ই-কমার্স সংস্থা গুদাম ভাড়া নিয়েছে।’’

এক ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা, ‘‘গুদামঘর ভাড়ায় নিতে গিয়ে এমন এক নেতার কাছে যেতে হয়েছিল, যিনি রাজ্য রাজনীতিতে পরিচিত নাম। কলকাতা পুরসভার সঙ্গেযুক্ত এক মহিলার মাধ্যমে তাঁকেমাসে মাসে ভাড়ার টাকা পাঠাতে হয়।’’ এই সূত্রেই সামনে আসছে ওই এলাকার রাজনৈতিক সমীকরণ। জানা যাচ্ছে, নাজিরাবাদ এলাকাটি খেয়াদা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীনে হলেও সেখানে রাজপুর-সোনারপুরপুরসভার এক পুরপ্রতিনিধির নির্দেশেই সমস্তটা হয়। খেয়াদা-২ গ্রাম পঞ্চায়েত সোনারপুর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত। ওইপুরপ্রতিনিধি এলাকার বিধায়কের ঘনিষ্ঠ। ওই এলাকার রাজনীতির কারবারিদের দাবি, ওই পুরপ্রতিনিধিই রাজপুর-সোনারপুর পুরসভার উত্তরের অংশের ‘শেষ কথা’।আবার দক্ষিণের অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন ওই পুরসভার আর এক মাথা। নিজেদের মধ্যে ভাগ করে কার্যত এলাকা শাসন করেন তাঁরা। সেই সূত্রেই রাজ্যের এক প্রভাবশালীমন্ত্রীর সেই এলাকায় নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। আগুন লাগার পরে তাঁদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতেশুরু করেছে। রাজপুর-সোনারপুরের একটি ওয়ার্ডের পুরপ্রতিনিধি তথা ঘটনাস্থল যে বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত, সেই সোনারপুর উত্তরের বিধায়ক ফিরদৌসি বেগমের স্বামী নজরুল আলি মণ্ডলের যদিও দাবি, ‘‘কী সমীকরণে কী চলে, বলতে পারব না। পঞ্চায়েতের এলাকা, যা বলার তারাই বলবে।’’ খেয়াদা-২ পঞ্চায়েতের প্রধান মিতা নস্কর বললেন, ‘‘ওই অঞ্চল থেকে পঞ্চায়েতের কোনও আয় হয় না। বেআইনি কাজ আটকাতেই আমরা নোটিস দিয়েছি।’’

কিন্তু সেই নোটিসে কাজ হয়েছে কি? ‘মৃত্যুপুরী’ ঘুরে তা অন্ততমনে হল না।

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Syndicate Land Mafia

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy