মালবাহী লরি চলাচলের কথাই নয় সেই রাস্তায়। অথচ অভিযোগ, তারই জন্য চলছে রাস্তা চওড়া করার কাজ। সেই কাজ এখনও সম্পূর্ণ হয়নি। আর এর ফলে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরেও চালু করা যাচ্ছে না প্রায় ১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি হাওড়ার পোদরা লঞ্চঘাট। আরও অভিযোগ, এর নেপথ্যে রয়েছে পরিবহণ দফতরের অফিসারদের একাংশের সঙ্গে স্থানীয় একটি ঠিকাদার সংস্থার গোপন আঁতাঁত। এলাকাবাসীরা জানাচ্ছেন, যে ঠিকাদার সংস্থা জেটি তৈরির কাজের বরাত পেয়েছিল, ওই জেটিতে যাওয়ার রাস্তার ধারে তাদেরই জাহাজ মেরামতির একটি কারখানা আছে। অভিযোগ, ওই রাস্তা চওড়া হলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ২২ চাকার ট্রাক কারখানায় ঢোকাতে পারবেন। তাই তিনি আশপাশের ঘরবাড়ি ভেঙে রাস্তা চওড়া করতে চাইছেন। এই কারণেই কাজ হয়ে যাওয়ার পরেও লঞ্চঘাট এখনও চালু করা যায়নি। যদিও যাবতীয় অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই ঠিকাদার। পুরো বিষয়টির তদন্ত চেয়ে মুখ্যমন্ত্রী ও পরিবহণমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন এলাকার বাসিন্দারা।
প্রসঙ্গত, পুলিশ ও প্রশাসনকে মোটা টাকা দিয়ে পোদরা ফেরিঘাট থেকে বেআইনি ভাবে নৌকায় যাত্রী পারাপারের অভিযোগ দীর্ঘ দিনের। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৯ সালে পোদরা লঞ্চঘাটটি অধিগ্রহণ করে রাজ্য সরকার। তার পরে পোদরা থেকে রাজাবাগান পর্যন্ত লঞ্চ পরিষেবা শুরু হয়। ২০১৩ সালে শুরু হয় গঙ্গার দু’পারে স্থায়ী জেটি নির্মাণ। এর জেরে বন্ধ হয়ে যায় বেআইনি ভাবে নৌকায় যাত্রী পারাপারের কাজ। অভিযোগ, সেই রাগে তৃণমূলের মদতপুষ্ট কয়েকশো দুষ্কৃতী জেটির নির্মাণ-কর্মীদের উপরে হামলা চালিয়ে সব ভেঙেচুরে দেয়। এর পরেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় জেটির নির্মাণকাজ। বিপাকে পড়েন পোদরা লঞ্চঘাট দিয়ে যাতায়াত করা প্রায় আট হাজার যাত্রী।
এলাকার বাসিন্দা তরুণ মণ্ডল বলেন, ‘‘সাধারণ মানুষের কথা ভেবে আমরা কলকাতা হাই কোর্টে রিট পিটিশন করি। আদালত রাজ্য সরকারকে লঞ্চঘাটটি পুনর্নির্মাণ করার নির্দেশ দেয়। ২০২৪ সালের ১৪ মার্চ স্থানীয় একটি জাহাজ মেরামতি সংস্থাকে ১৫ মাসের মধ্যে ওই জেটি তৈরির জন্য প্রায় ১৩ কোটি টাকার বরাত দেয় রাজ্য পরিবহণ দফতর।’’
স্থানীয় বিজেপির জেলা কমিটির সদস্য অলোক দুবের অভিযোগ, জলপথ পরিবহণ উন্নতির নামে তৃণমূল সরকার বিশ্ব ব্যাঙ্ক থেকে যে ১০২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছিল, সেই টাকায় নতুন লঞ্চঘাট তৈরি, তার রক্ষণাবেক্ষণ-সহ পরিকাঠামোগত নানা উন্নতির কথা ছিল। কিন্তু সেই কাজ না করে পরিবহণ দফতরের অফিসারদের একাংশকে ‘কাটমানি’ দিয়ে ওই বিপুল টাকা নয়ছয় করা হয়। অলোক বলেন, ‘‘পোদরা লঞ্চঘাটের ক্ষেত্রেও একই জিনিস ঘটেছে। কাজ শেষ হয়ে গেলেও দফতরকে জেটি হস্তান্তর করতে অহেতুক দেরি করা হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, লঞ্চঘাটের পাশ দিয়ে পঞ্চায়েতের যে রাস্তা গিয়েছে, সেখানে ভারী মালবাহী ট্রাক চলার কথা না থাকলেও রাস্তা চওড়া করে ওই ট্রাক চলাচলের জন্য একটি জাহাজ সংস্থা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’’
যদিও স্থানীয়দের সব অভিযোগ অস্বীকার করে জেটিঘাট নির্মাণকারী সংস্থার তরফে প্রসেনজিৎ পাত্র বলেন, ‘‘এটা ঠিক যে, রাস্তা মেরামতির কারণে ফেরিঘাট চালু করা যায়নি। তবে, ঘাট চালু না হওয়ারপিছনে আমাদের সংস্থার কোনও স্বার্থ নেই।’’
কাজ শেষ হওয়ার পরেও কেন লঞ্চঘাট চালু করা যায়নি, জানতে চাওয়া হলে হাওড়া জেলা প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘‘লঞ্চঘাটে যাওয়ার রাস্তা নিয়ে একটা সমস্যা তৈরি হয়েছিল। সেটি মিটে গিয়েছে। শীঘ্রই রাস্তার কাজ শুরু হবে। তার পরেই লঞ্চঘাট উদ্বোধন করা হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)