তোলাবাজির অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল কলকাতা পুরসভার প্রাক্তন কাউন্সিলর শাম্স ইকবালকে। ছ’ঘণ্টার মধ্যে ১০০০ টাকার বন্ডে জামিন পেলেন তিনি। শাম্সের ‘বর্ণময়’ জীবন ইতিমধ্যেই আলোচনায়।
১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন শাম্স। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের অত্যন্ত ‘ঘনিষ্ঠ’ এই শাম্স ফিরহাদকে ডাকতেন ‘ববি আঙ্কেল’ বলে। সমাজমাধ্যমে ববি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও তাঁর একাধিক ছবি রয়েছে। এক বার তিনি কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি নিয়ে পুরসভায় গিয়ে সকলের নজর কেড়েছিলেন।
ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে শাম্স ইকবাল। ছবি: ফেসবুক।
২০২৪ সালে গার্ডেনরিচে একটি বহুতল ভেঙে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছিল। বেআইনি ভাবে বহুতল তৈরি হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সেই বহুতল ছিল শাম্সের ১৩৪ নম্বর ওয়ার্ডেই। বেআইনি নির্মাণে তাঁরও নাম জড়িয়েছিল। ওই বহুতলটির প্রোমোটার ওয়াসিমের সঙ্গে শাম্সের ছবি সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়। অভিযোগ, সেই সময়ে শাম্সকে আড়াল করেছিলেন খোদ ফিরহাদ। সম্প্রতি, তারাতলায় নির্মীয়মাণ গুদাম ভেঙে পড়ার ঘটনাতেও শাম্সের নামে অভিযোগ দায়ের হয়েছে। অভিযোগ করেছেন ভারতীয় জনতা মজদুর দলের জনৈক নেতা।
ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে শাম্স ইকবাল (ডান দিকে)। ছবি: ফেসবুক।
আরও পড়ুন:
গার্ডেনরিচের ঘটনার পর শাম্সের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তুলে সমাজমাধ্যমে পোস্ট করেছিলেন তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। শাম্সের গ্রেফতারির দাবি তুলেছিলেন তিনি। লিখেছিলেন, ‘‘শাম্স ইকবাল বেআইনি নির্মাণের বেতাজ বাদশা। চকচকে লাল গাড়ি চালিয়ে এক বার পুরসভায় এসেছিলেন। তাঁর এই জমকালো জীবন গড়ে উঠেছে সেই সমস্ত মানুষের জীবনের বিনিময়ে, যাঁরা বহুতলের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছেন।’’ পাঁচ কোটি টাকার বেশি দামি বেন্টলি গাড়ি শাম্স কিনেছেন বলেও দাবি করেছিলেন শুভেন্দু। সাধারণ এক কাউন্সিলর কোথা থেকে এত টাকা পান? প্রশ্ন তুলেছিলেন তিনি। রাজ্যে পালাবদলের পর অবশ্য এই শুভেন্দুর পা ছুঁয়ে শাম্সের প্রণামের একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে (সেই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি আনন্দবাজার ডট কম)।
টলিউড অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে শাম্স ইকবাল। ছবি: ফেসবুক।
শাম্সের বিলাসবহুল জীবনযাপনের কথা কলকাতা পুরসভায় বহুল আলোচিত। ২০২১ সালের পুরভোটে গার্ডেনরিচ থেকে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন তিনি। ৯৮ শতাংশ ভোট পেয়েছিলেন, যা সকল কাউন্সিলরের চেয়ে বেশি। দাবি করেছিলেন, মানুষের আশীর্বাদই তাঁর সহায়। এ হেন শাম্স পুরসভায় গিয়েছিলেন লাল রঙের চোখধাঁধানো অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি নিয়ে। হাওয়ায় খবর ছড়িয়ে পড়েছিল দ্রুত। তাঁর গাড়ি দেখতে পুরসভার সামনে রীতিমতো ভিড় জমে গিয়েছিল। পুরকর্মীরাও অনেকে গাড়ি দেখতে জড়ো হয়েছিলেন। এমনকি, কাউন্সিলরদের কাউকে কাউকে উঁকি মারতে দেখা যায় শাম্সের গাড়ির দিকে। বাজারে অ্যাস্টন মার্টিনের দাম কোটি টাকার উপরে।
বলিউড অভিনেত্রী তমন্না ভাটিয়ার সঙ্গে শাম্স ইকবাল। ছবি: ফেসবুক।
তারকাদের বৃত্তের আশপাশে থাকতে পছন্দ করতেন শাম্স। টলিউডের একাধিক জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকার সঙ্গে তাঁর ছবি রয়েছে সমাজমাধ্যমে। ছবি তুলেছিলেন বলিউডের তমন্না ভাটিয়ার সঙ্গেও। তাঁর দৈনন্দিন যাপনের পরতে পরতে বিলাসিতার ছাপ স্পষ্ট। শাম্সের বাবা মুন্না ইকবালও এলাকার পরিচিত নেতা এবং কাউন্সিলর ছিলেন। গার্ডেনরিচের এক সাব-ইনস্পেক্টর হত্যার মামলায় মুন্নার নাম জড়িয়েছিল। এ ছাড়া, বন্দর এলাকায় জোর করে জমি লিখিয়ে নেওয়া, বেআইনি কার্যকলাপের একাধিক অভিযোগ রয়েছে শাম্সের বিরুদ্ধে। ১০ বছর আগে ডিসি (বন্দর)-এর কাছে শাম্সের নামে ছ’কাঠা জমি জোর করে লিখিয়ে নেওয়া সংক্রান্ত অভিযোগ জানিয়েছিলেন ওয়াজ়িদ আলি শাহের বংশধর আসিফ আলি মির্জা।
টলিউড অভিনেত্রী তথা প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদ মিমি চক্রবর্তীর সঙ্গে শাম্স ইকবাল। ছবি: ফেসবুক।
২০২১ সালের পুরভোটের সময় শাম্স যে হলফনামা দিয়েছিলেন, তাতে তাঁর অস্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ ছিল ৫ লক্ষ ৬৮ হাজার ৩৭৬ টাকা। তাঁর স্ত্রীর নামে ছিল ৭৫ লক্ষ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি। ৪৭ লক্ষ টাকা দিয়ে শাম্সের স্ত্রী একটি মার্সিডিজ় গাড়িও কিনেছিলেন ২০১৭ সালে। হলফনামায় তার উল্লেখ রয়েছে।