দেড় দশক পরে রাজ্যে ফের রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। ভোটে হারতে হয়েছে তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতা ও মন্ত্রীদের, যাঁরা বড় বড় দুর্গাপুজোর সঙ্গে সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই আবহেই চর্চা শুরু হয়েছে, ভোটের প্রভাব পুজোয় পড়বে কিনা, তা নিয়ে। পুজোর সঙ্গে যুক্ত, পরিচিত শিল্পীরা অনেকেই অবশ্য মনে করছেন, পুজোয় রাজনৈতিক নেতারা যে ভাবে যুক্ত থাকেন, তার সঙ্গে শিল্পীদের যুক্ত হওয়াটা একেবারেই আলাদা। তাই পুজোয় তার প্রভাব পড়বে না বলেই তাঁদের মত।
ক’বছর আগেই ইউনেস্কোর বিশ্ব আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে কলকাতার দুর্গাপুজো। তবে, তার অনেক আগে থেকেই পুজো মৌলিক শিল্পচর্চার পরিসর হয়ে উঠছিল। প্রায় দু’দশক আগে থেকেই পুজোর কাজকে শিল্পচর্চার মাধ্যম করে তোলেন পেশাদার শিল্পীদেরএকটি গোষ্ঠী, যাঁদের মধ্যে অন্যতম সনাতন দিন্দা। ১৯৯৮ সাল থেকে পুজোয় যুক্ত থাকা সনাতন বললেন, ‘‘আমি সিপিএম আমলেও পুজোর কাজ করেছি। তৃণমূল আমলেও করেছি। আবার বিজেপির প্রভাব আছে, এমন ক্লাবের পুজোও করেছি। কখনও কোনও অসুবিধা বা সমস্যা হয়নি। আমার মনে হয় না, আগামী দিনেও কোনও সমস্যা হবে।’’ সনাতনের মতে, কলকাতার দুর্গাপুজোর ব্যাপ্তি শুধুমাত্র ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ নয়, সেই পরিচিতিকে ছাড়িয়ে গিয়েছে বহু দিন। এখন তা এক বিরাট উৎসব, অর্থনীতিও বটে। তাই কোনও রাজনৈতিক দলই এতে বিঘ্ন ঘটাতে চাইবে না বলেই মনে করছেন সনাতন।
রাজ্যে সিপিএমের আমলের অবসানের পরে যখন তৃণমূল আমলের সূচনা হয়, তখনও তিনি এমন পরিস্থিতির সাক্ষী থেকেছেন বলে জানালেন পুজোর আর এক পরিচিত শিল্পী ভবতোষ সুতার। তিনি বলেন, ‘‘২০০৯ সালে আমি দক্ষিণ কলকাতার একটি বড় ক্লাবের পুজো করেছিলাম। তখন বাম আমলের এক মন্ত্রীর সেই ক্লাবে যাতায়াত ছিল। পরের বছর দেখলাম, ওই মন্ত্রীর সঙ্গে যোগ হল তখনকার বিরোধী তৃণমূলের এক শীর্ষ নেতার উপস্থিতি। তার পরে পালাবদলের পর থেকে ধীরে ধীরে বাম সরকারের ওই মন্ত্রী আর আসতেন না। তৃণমূলের ওই নেতা তথা মন্ত্রীই থাকতেন।’’ ভবতোষের মতে, ‘‘ক্লাবের সঙ্গে নেতাদের কেমন যোগাযোগ, তার সঙ্গে আমাদের, শিল্পীদের কোনও সম্পর্ক নেই। কোনও ক্লাবের কাজ করতে গেলে হয়তো কোনও নেতার সঙ্গে আলাপ হয়, সেটুকুই। আমার কাছে নিজের শিল্পী সত্তাই সর্বোত্তম। শিল্পীর কাছে পুজোটা নিজের সৃজনশীল সত্তাকে উপস্থাপিত করার একটা মঞ্চ, আমি সেটাই করব।’’
পুজোর আর এক শিল্পী অনির্বাণ দাসও মনে করছেন, রাজনীতিতে পালাবদলের প্রভাব শিল্পীদের উপরে পড়বে না। গত বছর অনির্বাণ ছ’টি পুজোর কাজ করেছেন। তার মধ্যে ছিল তৃণমূল সরকারের এক মন্ত্রীর পুজো বলে পরিচিত একটিপুজোও। সেই নেতা এ বারের ভোটে হেরে গিয়েছেন। তবে, রাজ্য রাজনীতির এই পট পরিবর্তনে শিল্পীদের কাজে সমস্যা হবে না বলেই মত অনির্বাণেরও। তিনি বললেন, ‘‘ক্লাবের নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে থাকবে বা কারা ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত থাকবেন, সেটা অন্য ব্যাপার। শিল্পীর কাজ আলাদা। আর দুর্গাপুজো এখন যে আকার নিয়েছে, তাতে সবাই চাইবেন পুজো সুষ্ঠু ভাবে, সুন্দর ভাবে হোক। তাই মনে হয় না, আমাদের, শিল্পীদের কোনও অসুবিধা হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)