Advertisement
E-Paper

ট্রেলারের ধাক্কা বাইকে, মৃত হেলমেটহীন ২ খুদে

‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’-এর কথা বারবার বলছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নির্দেশে বিনা হেলমেটে মোটরবাইক চালানো

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ নভেম্বর ২০১৬ ০১:৩৮
অনিকেত ও  সঞ্জনা

অনিকেত ও সঞ্জনা

‘সেফ ড্রাইভ, সেভ লাইফ’-এর কথা বারবার বলছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর নির্দেশে বিনা হেলমেটে মোটরবাইক চালানো

এবং নিয়ম ভেঙে বেপরোয়া গাড়ি চালানো রুখতে সারা রাজ্যে লাগাতার প্রচার চালাচ্ছে পুলিশও। কিন্তু কাজের কাজ কতটা হচ্ছে তাতে? প্রাণের মাসুল গুনে বুধবার ফের তা চোখে আঙুল দিয়ে
দেখিয়ে দিয়ে গেল দুই শিশু। আশঙ্কাজনক আরও এক জন। ডানলপ মোড়ের কাছে সবেদাবাগান বাসস্টপে বেপরোয়া ট্রেলারের ধাক্কায় মোটরবাইক থেকে ছিটকে পড়ে তারা। কারও মাথাতেই হেলমেট ছিল না। ঘটনায় চোট পেয়েছেন দুই শিশুর বাবা, মোটরবাইক চালক নিজেও।

পুলিশ জানায়, দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে আপার কেজি-র ছাত্র অনিকেত যাদব (৫), ছাত্রী সঞ্জনা যাদবের (৫)। পিজি হাসপাতালে ভর্তি কেজি-র পড়ুয়া অনুরাগ যাদব (৪)। বাইকটি চালাচ্ছিলেন অনিকেত ও অনুরাগের বাবা বিশ্বনাথ যাদব। কোমরে, পায়ে, হাতে চোট পেয়েছেন ওই যুবক। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, বিশ্বনাথবাবু নিজে হেলমেট পরলেও তাঁর সামনে ও পিছনে থাকা তিনটি বাচ্চার মাথা ছিল ফাঁকা। এ দিন সিগন্যাল মেনে রাস্তায় মোড় ঘুরেই তিনি দেখেন সামনে আর একটি মোটরবাইক নিয়ম ভেঙে একমুখী রাস্তায় ইউ টার্ন করছে। বিশ্বনাথবাবু নিজের বাইকের গতি কমাতেই পিছন থেকে বেপরোয়া গতিতে ছুটে আসা ট্রেলারটি তাঁদের ধাক্কা মারে।

তিনটি ট্রাফিক নিয়ম ভাঙার জেরেই এ দিনের দুর্ঘটনা বলে মনে করছেন পুলিশকর্তারা— এক, শিশুদের মাথাতেও হেলমেট থাকা উচিত ছিল। তাতে হয়তো মাথায় অল্প আঘাত লাগতে পারত। দুই, সিগন্যাল না মেনে বেপরোয়া গতিতে ছুটছিল ট্রেলার। তাতেই সামনে কী ঘটছে দেখার সময় ছিল না চালকের। তিন, একমুখী রাস্তার মাঝে আচমকা মোটরবাইক ঘোরানোর কথা নয়। তাতে পিছনের গাড়ির দুর্ঘটনা পড়ার আশঙ্কা থাকে।

কী ঘটেছিল এ দিন? পুলিশ জানায়, রোজকার মতো এ দিনও সকাল সাড়ে ৮টা নাগাদ আড়িয়াদহ ডি ডি মণ্ডল ঘাট রোডের বাসিন্দা বিশ্বনাথ নিজের দুই ছেলে অঙ্কিত ও অনুরাগ এবং ভাইঝি সঞ্জনাকে মোটরবাইকে চাপিয়ে ডানলপ মোড়ের বেসরকারি স্কুলে পৌঁছতে যাচ্ছিলেন। পৌনে ৯টা নাগাদ দেশপ্রাণ শাসমল রোডে দমকল কেন্দ্রের সামনের মোড় থেকে বাঁ দিকে বাইক ঘোরান তিনি। দু’পা এগিয়ে সবেদা বাগান বাস স্টপের কাছে আর একটি মোটরবাইককে ইউ টার্ন নিতে দেখে বিশ্বনাথ নিজের বাইকের গতি কমাতেই দশ চাকার ট্রেলারটি ধাক্কা মারে। টাল সামলাতে না
পেরে বাইক থেকে ছিটকে পড়েন সকলেই। একটি শিশুর মাথায় ট্রেলারের চাকার হাল্কা ধাক্কাও লাগে। বেগতিক বুঝে পিডব্লিউডি রোড ধরে ডানলপের দিকে না গিয়ে ডানলপ সেতুতে উঠে চম্পট দেয় ট্রেলারটি।

রাস্তার উপরে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনটি শিশু ও এক যুবককে পড়ে যেতে দেখে চেঁচামেচি জুড়ে দেন আশপাশের মানুষ। ওই সময়ে কাছেই লরির কাগজপত্র পরীক্ষা করছিলেন পুলিশ কর্মীরা। ছুটে আসেন তাঁরা। আহতদের একটি গাড়িতে তুলে রথতলার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই অনিকেত ও সঞ্জনাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। আশঙ্কাজনক অবস্থায় অনুরাগকে কলকাতায় স্থানান্তরিত করা হয়। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে বিশ্বনাথকে ছেড়ে দেওয়া হয়। অন্য দিকে, ট্রাফিক পুলিশই বাইক নিয়ে তাড়া করে বনহুগলি থেকে ট্রেলারটিকে আটক করে।

কান্নায় ভেঙে পড়েছেন সঞ্জনার মা। বুধবার, আড়িয়াদহের বাড়িতে।ছবি: সজল চট্টোপাধ্যায়

এ দিনের ঘটনার পরে পুলিশের সামনে বিক্ষোভ দেখান স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের অভিযোগ, দক্ষিণেশ্বর থেকে ডানলপ মোড় পর্যন্ত পুরো রাস্তাটাই ক্রমশ মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে। রাস্তার ধারে বালিবোঝাই লরি পার্কিং থেকে শুরু করে বেপরোয়া গতিতে লরি নেমে আসে নিবেদিতা সেতু থেকে। ডানলপ মোড়মুখী বাসগুলির মধ্যে চলে রেষারেষি। আবার রাত নামলেই ওই রাস্তা এবং ডানলপ সেতুতে শুরু হয়ে যায় মোটরবাইকের দাপট। সবেদা বাগান এলাকার বাসিন্দা শুভেন্দু বসু বলেন, ‘‘প্রতিদিন ডানলপ মোড়ে যানবাহন, লোকসংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু যানবাহনের দৌরাত্ম্য বন্ধ হচ্ছে না। সিভিক ভল্যান্টিয়াররাও ঠিক মতো কাজ করেন না।’’

দক্ষিণেশ্বর থেকে ডানলপ মোড় পর্যন্ত গোটা পিডব্লিউডি রোডে জাতীয় সড়ক, পূর্ত দফতর, পুরসভার অংশ রয়েছে। এ দিন দুর্ঘটনার পরে পূর্ত দফতরের কর্তা ও ডানলপ ট্রাফিকের ওসি রঞ্জন রুদ্রকে সঙ্গে নিয়ে এলাকা পরিদর্শনে যান ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (জোন-২) ধ্রুবজ্যোতি দে এবং ডিসি (ট্রাফিক) অবধেশ পাঠক। গোটা রাস্তায় কী কী সমস্যা রয়েছে, সেখানে কী করণীয়— তা নিয়ে দুপুরে বরাহনগর থানায় সব পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করেন পুলিশ কর্তারা। ঠিক হয়েছে আজ, বৃহস্পতিবার পূর্ত দফতর ও জাতীয় সড়ক কর্তৃপক্ষের কর্তারা যৌথ ভাবে ওই রাস্তা পরিদর্শন করবেন। প্রশাসনের এক কর্তা বলেন, ‘‘পরিদর্শনের পরেই কাজের পরিকল্পনা করা হবে। কী ভাবে যানজট না করে দুর্ঘটনা এড়িয়ে
ওই রাস্তা গতিশীল রাখা যায়, তা দেখা হবে।’’

কিন্তু বাসিন্দা ও প্রশাসনের কর্তাদের একাংশের প্রশ্ন— এত কিছুর পরেও কি নিয়ম ভাঙার অভ্যাস কমবে?

schoolkids accident
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy