প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা আছে। আছে অভিজ্ঞতাও। এবং ইন্টারভিউ বা মৌখিক পরীক্ষায় তিনিই প্রথম। তাঁকে নিয়োগপত্র দেওয়ার অনুমোদন ও নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চশিক্ষা দফতরও। তা সত্ত্বেও সেই প্রথম স্থানাধিকারীকে অন্ধকারে রেখে মৌখিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানে থাকা প্রার্থীকে নিয়োগ করার অভিযোগ উঠেছে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।
পদটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাউন্সিল অব আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্ট্যাডিজের সেক্রেটারি বা সচিবের। বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের খবর, ওই পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হন মেদিনীপুরের বাসিন্দা সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। তিনি কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে এমটেক। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যান্ডিং বা স্থায়ী কমিটি প্রথম স্থানাধিকারী মাহমুদকেই নিয়োগপত্র দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। তা সত্ত্বেও তাঁকে সেই নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। কিছু দিন পরে খোঁজখবর করতে গিয়ে মাহমুদ জানতে পারেন, তাঁকে অন্ধকারে রেখেই মৌখিক পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানাধিকারীকে নিয়োগপত্র দিয়ে দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়-কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন দফতরে বিষয়টি জানিয়েও কোনও প্রতিকার পাননি মাহমুদ। নিরুপায় হয়ে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশনকে চিঠি লিখেছেন তিনি। চিঠিতে তাঁর অভিযোগ, ‘পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও নিছক সংখ্যালঘু বলেই আমাকে বঞ্চিত করা হয়েছে।’ ওই পদে নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী ও কমিশন-প্রধানের কাছে মাহমুদের আবেদন, বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের যে-সব আধিকারিক এতে জড়িত, তাঁদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে যথোচিত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। তাঁর বঞ্চনার প্রতিকার করা হোক।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০১৩ সালের ২৯ অগস্ট কাউন্সিল অব আন্ডারগ্র্যাজুয়েট স্ট্যাডিজের সেক্রেটারি বা সচিবের পদে মৌখিক পরীক্ষায় ৬৫.৪ নম্বর পেয়েছিলেন মাহমুদ। আর দ্বিতীয় স্থানাধিকারী মুকুলকান্তি গোলের নম্বর ৬৪.৮। ‘‘মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও আমাকে কেন নিয়োগপত্র দেওয়া হল না, কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না। কী কারণে কারা আমাকে বঞ্চিত করলেন, সেই বিষয়েও আমি অন্ধকারে,’’ বলছেন মাহমুদ।
তথ্যের অধিকার আইনে বিশ্ববিদ্যালয়কে একাধিক চিঠি লিখেছেন ওই প্রার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে মাহমুদকে জানানো হয়, কাজের অভি়জ্ঞতা যথাযথ না-থাকায় তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই যুক্তি মানতে রাজি নন ওই প্রার্থী। তাঁর অভিযোগ, ‘‘আসলে ওই পদে কাকে নেওয়া হবে, আগেভাগেই সেটা ঠিক করে রাখা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে যে-সব তথ্য সাজানো হচ্ছে, তা মিথ্যা। আমার পড়ানোর যথাযথ অভিজ্ঞতা আছে।’’ অভিজ্ঞতাই যদি না-থাকে, তাঁকে মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হল কেন, প্রশ্ন মাহমুদের।
বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার জয়ন্তকিশোর নন্দী বলেন, ‘‘ওই পদের জন্য কলেজে পড়ানোর অভিজ্ঞতা আবশ্যিক ছিল। প্রথম স্থানাধিকারী প্রার্থীর সেই অভিজ্ঞতা ছিল না। ওই প্রার্থী যে-কলেজে পড়িয়েছেন বলে দাবি করছেন, আমরা সেখানে খোঁজখবর নিয়েছি।’’
রেজিস্ট্রার ওই প্রার্থীর পড়ানোর অভিজ্ঞতার বিষয়টি উড়িয়ে দিলেও নথি কিন্তু অন্য কথা বলছে। মাহমুদ পাঁশকুড়া বনমালী কলেজে অস্থায়ী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পড়ানোর অভিজ্ঞতা যাচাই করতে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে ৬.১১.২০১৩ তারিখে ওই কলেজকে চিঠি
লেখা হয়। পাঁশকুড়া বনমালী
কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ নন্দন ভট্টাচার্য পরে ১৮.১১.২০১৩ তারিখে বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারকে চিঠি লিখে জানান, ‘সিলেকশন কমিটির সুপারিশ মেনেই সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে কলেজে অস্থায়ী শিক্ষকের পদে নিয়োগ করা হয়। তিনি কলেজে ০১-০৮-১৯৯৮ থেকে ১৫-০৩-২০০২ পর্যন্ত শিক্ষকতা করেছেন।’
ওই প্রার্থীকে সচিব-পদে নিয়োগ করা যাবে কি না, তা জানতে চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে মাহমুদের যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার নথি উচ্চশিক্ষা দফতরের কাছে পাঠানো হয়েছিল। উচ্চশিক্ষা দফতরের তরফে তৎকালীন যুগ্মসচিব মধুমিতা দাস জানান, ‘বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর আইন অনুযায়ী প্রার্থীকে নিয়োগপত্র দেওয়া যাবে।’
উচ্চশিক্ষা দফতরের নির্দেশ এবং ছাড়পত্র সত্ত্বেও মাহমুদকে ওই পদে নিয়োগ করা হল না কেন?
উপাচার্য রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, ‘‘সব কিছুই হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এগ্জিকিউটিভ কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত মেনে। এই বিষয়ে আমার কিছু করার নেই।’’ পাঁশকুড়া কলেজের তরফে পাঠানো চিঠিতে তো পরিষ্কার বলা হয়েছিল, নিয়ম মেনেই মাহমুদকে নিয়োগ করা হয়েছিল এবং তিনি টানা তিন বছর সাত মাস ১৪ দিন কাজ করেছেন। তা সত্ত্বেও তাঁকে কেন নিয়োগপত্র দেওয়া হল না?
উপাচার্য নিরুত্তর।
কিন্তু নীরবতা দিয়ে সচিব-পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া যাচ্ছে না। ওই বিশ্ববিদ্যালয়েরই নথি বলছে, সুপারিশপত্রে স্ট্যান্ডিং কমিটির তরফে মাহমুদকে প্রথমে কাজে যোগ দিতে সুপারিশ করা হয়। পরে সেই সুপারিশপত্রেই বলা হয়, ‘সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ওই পদে যোগ না-দেওয়ায় মেধা-তালিকা অনুযায়ী দ্বিতীয় স্থানাধিকারী মুকুলকান্তি গোলে কাজে যোগ দেবেন।’
‘‘আমাকে কখনওই কাজে যোগ দিতে বলা হয়নি। আমি কাজে যোগ দিইনি বলে যা বলা হচ্ছে, তা মিথ্যা। আমি যে মৌখিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়ের তরফে সেটাও আমাকে জানানো হয়নি। দেওয়া হয়নি নিয়োগপত্রও। বিশ্ববিদ্যালয়ের কাগজপত্রই বলে দিচ্ছে, পুরোটা সাজানো,’’ বলছেন মাহমুদ।