বাণিজ্যিক গ্যাস সিলিন্ডারের আকাল চলছে এখনও। সরকারি স্কুলে মিড-ডে মিল রান্নার জন্য এখন তাই কাঠের উনুনই ভরসা। সেই কাঠও সহজে মিলছে না। কখনও তা কিনতে হচ্ছে নিমতলা ঘাট স্ট্রিটে কাঠের পাইকারি বাজার থেকে, কখনও বা জোগাড় করে আনা হচ্ছে আসবাবপত্রের কারখানার বর্জ্য কাঠের টুকরো। কিন্তু কমিউনিটি কিচেন যাঁরা চালাচ্ছেন, তাঁদের প্রশ্ন, এ ভাবে কাঠ জোগাড় করে আর কত দিন রান্না করতে হবে? তাঁরা জানাচ্ছেন, গ্যাসের আকালে জ্বালানি কাঠের চাহিদা এবং দাম, দুটোই বেড়ে গিয়েছে। সেই সঙ্গে কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করার ফলে বাতাসে দূষণও ছড়াচ্ছে।
হাতিবাগান এলাকার কমিউনিটি কিচেনের অন্যতম কর্ণধার শান্তনু বন্দ্যোপাধ্যায় জানালেন, তাঁদের রান্নাঘরে প্রতিদিন ৭০ থেকে ৮০টি স্কুলের ছ’-সাত হাজার পড়ুয়ার জন্য মিড-ডে মিল রান্না হয়। শ্যামবাজার, হাতিবাগান থেকে শুরু করে ট্যাংরা-সহ শহরের বেশ কয়েকটি এলাকার স্কুলে তাঁরা খাবার সরবরাহ করেন। শান্তনু বললেন, ‘‘আমাদের রোজ যেখানে ১০-১২টি করে গ্যাস সিলিন্ডার লাগে, সেখানে পাচ্ছি মোটে দু’-তিনটি সিলিন্ডার। এত কম গ্যাসে তো রান্না হয় না। তাই গোটা রান্নাই কাঠের উনুনে হচ্ছে। আমাদের কমিউনিটি কিচেনের কাছেই একটি স্কুলের মাঠের পাশে শামিয়ানা খাটিয়ে কাঠের উনুন তৈরি করেছি। সেখানেই যাবতীয় রান্না হচ্ছে। কাঠ আনতে হচ্ছে নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের পাইকারি কাঠের দোকান থেকে। শুধু তো কমিউনিটি কিচেন নয়, অনেক জায়গাতেই জ্বালানি হিসাবে এখন কাঠের ব্যবহার চলছে। ফলে কাঠের দামও বেড়ে গিয়েছে।’’
শান্তনু জানালেন, রাঁধুনিদের কাঠ জ্বালিয়ে রান্না করার অভ্যাস নেই। তাই তাঁদের বেশ কষ্ট হচ্ছে। সেই সঙ্গে কাঠের উনুন থেকে যাতে দূষণ বেশি না ছড়ায়, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হচ্ছে। শান্তনু বলেন, ‘‘গোটা পরিস্থিতির কথা জানিয়ে কলকাতা জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শকের অফিসে চিঠি দিয়েছি।’’
দমদম এলাকার একটি কমিউনিটি কিচেনে মিড-ডে মিল এবং মা ক্যান্টিনের জন্য রান্না হয়। সেখানকার এক কর্তা নভোনীল রায়চৌধুরী জানালেন, তাঁদের হেঁশেলে প্রায় পাঁচ-ছ’হাজার পড়ুয়ার মিড-ডে মিল রান্না হয়। সেই সঙ্গে সাতটি মা ক্যান্টিনের জন্যও রান্না হয়। নভোনীল বলেন, ‘‘আমাদের কমিউনিটি কিচেনের আশপাশে বেশ কয়েকটি কাঠের দোকান রয়েছে। সেগুলি মূলত আসবাবপত্রের দোকান। আসবাবপত্র তৈরি করার পরে কিছু উদ্বৃত্ত কাঠ থাকে। সেই ফেলে দেওয়া কাঠেরই এখন চাহিদা তুঙ্গে। সেই কাঠ আমরাও কিনছি। এলাকায় কিছু কাঠকয়লার দোকানও রয়েছে। সেখান থেকেও কেনা হচ্ছে। কিন্তু এই ভাবে কতদিন চলবে?’’
শুধু কমিউনিটি কিচেনই নয়, যে সব স্কুলের নিজস্ব রান্নাঘর আছে এবং উনুনে রান্না করার মতো জায়গা রয়েছে, সেখানেও এখন কাঠের উনুনে রান্না হচ্ছে। যেমন, বাঙুরের নারায়ণ দাস মেমোরিয়াল মাল্টিপারপাস স্কুলের প্রধান শিক্ষক সঞ্জয় বড়ুয়া বলেন, ‘‘গ্যাসের সিলিন্ডারের ওটিপি পাওয়ার পরেও সিলিন্ডার নিয়মিত মিলছে না। তাই কাঠেই রান্না করছি। স্কুলের পিছন দিকে কাঠেরউনুন তৈরি করে সেখানে রান্না করছি।’’ তবে শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, এখন প্রথম পর্যায়ক্রমিক পরীক্ষা চলছে বলে সব পড়ুয়া স্কুলে যাচ্ছে না। কিছু স্কুলে আবার কেন্দ্রীয়বাহিনী ঢুকে পড়েছে বলে সেই সব স্কুলে নিয়মিত ক্লাস হচ্ছে না। তাই মিড-ডে মিলের চাহিদা আগের তুলনায় একটু কম। সমগ্র শিক্ষা মিশনের কলকাতা জেলার চেয়ারম্যান কার্তিক মান্না বলেন, ‘‘কমিউনিটি কিচেন এবং যে সব স্কুলে কাঠে রান্না হচ্ছে, তাদের জ্বালানি কাঠ, কেরোসিন, উনুন তৈরির খরচ বাবদ একটি বিশেষ তহবিল থেকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হচ্ছে। আমরা বলেছি, পদের একটু হেরফের হতে পারে, কিন্তু মিড-ডে মিল পড়ুয়াদের রোজদিতেই হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)