এত দিন সীমানার বাইরে ছিল বিপদ। সতর্কতার ফাঁক গলে সেই বিপদ, নোভেল করোনাভাইরাস ঘরে ঢুকে পড়েছে। যা উড়ালপুল ভেঙে পড়া, নাগরিকত্ব হারানো, মেট্রোর সুড়ঙ্গ বিপর্যয়, ডেঙ্গি এবং আন্ত্রিকের মতো একাধিক আতঙ্কে ভোগা এই শহরের মানসিক চরিত্রই ভেঙে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন মনোরোগ চিকিৎসক এবং মনোবিদেরা। কারণ, ডেঙ্গি ও কলেরায় মৃত্যুর হার বেশি হলেও তারা ‘চেনা শত্রু’। ফলে উৎকণ্ঠা থাকলেও তা জন-মনের চরিত্র বদলাতে পারেনি। কিন্তু ‘অচেনা শত্রু’ কোভিড-১৯, যার উৎস এবং বিনাশ সব কিছুতেই ধোঁয়াশা। ফলে এই অচেনা আতঙ্ক (ফিয়ার অব আননোন) শহরবাসীর মানসিক গঠন বদলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞেরা।
এপিডেমিয়োলজির গবেষণা বলছে, কোনও এলাকায় স্পর্শজনিত মহামারির ক্ষেত্রে বাসিন্দাদের অবচেতনেই পরস্পরের মধ্যে শারীরিক দূরত্ব বজায়ের মানসিকতা তৈরি হয়। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাসিন্দারা কমপক্ষে ১-১.২ মিটার দূরত্ব বজায় রাখেন বা রাখতে চান। মনোবিদেরা জানাচ্ছেন, জন ঘনত্বের দিক থেকে দেশের প্রথম ২০টি শহরের তালিকার উপরের দিকে থাকা কলকাতার অবচেতনেও তেমন ধারা তৈরি হবে কি না, তা কয়েক দিনেই বোঝা যাবে। মনোবিদ নীলাঞ্জনা স্যান্যাল বলছেন, ‘‘যে কোনও মহামারি চলে যাওয়ার পরেও জনজীবনে তার ছাপ রেখে যায়। নোভেল করোনাভাইরাসের ছাপ ইতিমধ্যেই পড়েছে, আগামী দিনেও তা থাকবে।’’ এর প্রভাব জীবনের প্রাথমিক শিষ্টাচারে পরিবর্তন ঘটাবে কি, প্রশ্ন মনোরোগ চিকিৎসক প্রথমা চৌধুরীর। তাঁর কথায়, ‘‘করোনাভাইরাসের আতঙ্ক যত্রতত্র থুতু না ফেলা, হাঁচি-কাশির সময়ে রুমাল বা হাত দিয়ে মুখ ঢাকা, পরিষ্কার থাকার অভ্যাস তৈরি করতে পারবে তো? কারণ, আমরা তো অন্যদের কথা ভাবিই না। অন্যের কী অসুবিধা হতে পারে বা হচ্ছে, সেটা এ বার ভাবতে হবে।’’
কোভিড-১৯-এর চরিত্র বুঝতে কাজ করা গবেষকদের অনেকেই জানাচ্ছেন, মহামারির সংক্রমণ ঠেকাতে স্কুল-কলেজ বা যে কোনও জমায়েত বন্ধ করে এবং আইসোলেশন ও কোয়রান্টিন-সহ যে সব পদক্ষেপ করা হয়, প্রতিটিরই পরোক্ষ প্রভাব থাকে। এক গবেষক জানাচ্ছেন, কোয়রান্টিনের ইতিহাস বলছে, যখনই এই পদ্ধতি গৃহীত হয়েছে, তার প্রভাব জনজীবনে পড়েছে। কারণ, চলাফেরা নিয়ন্ত্রিত করা বা ঘরবন্দি থাকা, পুরোটাই আরোপিত। ওই গবেষকের কথায়, ‘‘এর সঙ্গে নৈতিকতার প্রশ্নও জড়িত। চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ বা ঘরবন্দি থাকা প্রবল ভাবেই মানবাধিকারের সঙ্গে জড়িত। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) এই ধরনের সুপারিশের আগে নৈতিক দিকটিও আলোচনা করে।’’ অন্য গবেষকের কথায়, ‘‘কোভিড-১৯ সংক্রমণের প্রেক্ষিতে জানুয়ারিতেই ব্রিটেনের ‘দ্য নাফিল্ড কাউন্সিল অন বায়োএথিকস’ বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা নিয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। নৈতিকতার কী কী প্রশ্ন জড়িত, সেখানে বলা হয়েছে।’’
তবে কখনওই বাচ্চাদের সামনে কোয়রান্টিনের আতঙ্কের ছবি তুলে না ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট পায়েল ঘোষ। তাঁর কথায়, ‘‘এই খাবার খাওয়া যাবে না, ওটা খাওয়া যাবে না বা আরও বেশি করে জিনিস মজুত করতে হবে। এমন আলোচনা ওদের সামনে করলে ছোটদের মধ্যে অনিশ্চয়তা এবং আতঙ্ক তৈরি হবে। স্পর্শকাতর বাচ্চাদের মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।’’ তবে মনোরোগ চিকিৎসকদের সকলেই একটি বিষয়ে সহমত, শহরে কোভিড-১৯-এর প্রবেশ মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে নিত্যদিনের খাবার-সহ বিভিন্ন জিনিস মজুত করে রাখার (প্যানিক বায়িং) প্রবণতা তৈরি করতে পারে। মনোরোগ চিকিৎসক জয়রঞ্জন রামের কথায়, ‘‘আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে ভবিষ্যতের জন্য মজুত রাখতে অনেকেই বেশি জিনিস কেনা শুরু করেছেন। এর ফলে জিনিসের দাম বাড়তে পারে। করোনাভাইরাসের প্রভাবে স্বাভাবিক বাঁচার অভ্যাস ভুলে শুধু টিকে থাকার মানসিকতা তৈরির আশঙ্কা থাকছে।’’
সচেতন ভাবে সেই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, বলছেন মনোরোগ চিকিৎসকেরা। কারণ, মহামারির ইতিহাস বলছে, কখনও একক ভাবে এই বিপদের মুখোমুখি হওয়া যায়নি। ফলে ‘একক ভাবে বাঁচব’— এই মানসিকতাও বিপদকে এড়াতে পারবে না। বরং সমবেত সতর্কতা দিয়েই ‘অচেনা শত্রু’-র সংক্রমণ রোখা সম্ভব।