Advertisement
E-Paper

‘ওর বাবা আর আমি পারলাম, মেয়েটা পারল না?’

ঘরে তাঁর অপেক্ষায় থাকা অগ্নিদগ্ধ স্ত্রী অবশ্য জানেন, তাঁদের মেয়ে আর বেঁচে নেই। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। পিঠের পোড়া অংশ এখনও পুরো শুকোয়নি।

নীলোৎপল বিশ্বাস

শেষ আপডেট: ০১ জুন ২০১৯ ০০:৩২
ফেরা: নিজের বাড়িতে মধুসূদন রায় (বাঁ দিকে) এবং মাম্পি রায় (মাঝে)। শুক্রবার, উল্টোডাঙায়। (ডান দিকে) ঈশিকা। ছবি: স্নেহাশিস ভট্টাচার্য ও ফাইল চিত্র

ফেরা: নিজের বাড়িতে মধুসূদন রায় (বাঁ দিকে) এবং মাম্পি রায় (মাঝে)। শুক্রবার, উল্টোডাঙায়। (ডান দিকে) ঈশিকা। ছবি: স্নেহাশিস ভট্টাচার্য ও ফাইল চিত্র

হাসপাতালের সিঁড়ি দিয়ে স্ট্রেচারে করে নামানোর সময়ে তিনি বললেন, ‘‘বাবু কেমন আছে? কত দিন মেয়েটাকে দেখি না। ওর বেডের দিকটা ঘুরে গেলে ভাল হয়।’’ এর পরে তিনি জেদ ধরেন, ‘‘১০০ টাকা বেশি দিয়ে স্ট্রেচারটা ওই দিকে নিয়ে চলো!’’ কোনও মতে তাঁকে থামিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সে তোলেন পরিজনেরা।

ঘরে তাঁর অপেক্ষায় থাকা অগ্নিদগ্ধ স্ত্রী অবশ্য জানেন, তাঁদের মেয়ে আর বেঁচে নেই। মাথার চুল ছোট করে ছাঁটা। পিঠের পোড়া অংশ এখনও পুরো শুকোয়নি। তার মধ্যেই স্বামী ফিরেছেন শুনে বিছানায় উঠে বসে ওই তরুণী চিৎকার শুরু করেন, ‘‘ওর বাবাকে আমার কাছেই নিয়ে এসো। আমরা ওই ঘরে আর যাব না!’’ কান্নায় ভেঙে পড়ে এর পরে তিনি বলেন, ‘‘ওর বাবা আর আমি পারলাম, মেয়েটা পারল না? হাসপাতাল ফিরতে দেয়নি আমাদের মেয়েকে।’’

গত ৩১ মার্চ রাতে উল্টোডাঙার ফিফ্‌থ ব্যাটালিয়ন সংলগ্ন বস্তির ঘরে একই সঙ্গে অগ্নিদগ্ধ হন একই পরিবারের তিন জন। মধুসূদন রায়, তাঁর স্ত্রী মাম্পি ও তাঁদের সাড়ে ছ’মাসের মেয়ে ঈশিকা। শহরের বেশ কয়েকটি হাসপাতাল ঘুরে ছ’দিনের মাথায় এসএসকেএমে মৃত্যু হয় ঈশিকার। ওই হাসপাতালেরই বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন ঈশিকার বাবা-মাকে তখন মেয়ের মৃত্যুর কথা জানানো হয়নি। গত সপ্তাহে মাম্পিকে ছুটি দিয়েছে হাসপাতাল। শুক্রবার ছাড়া পান ঈশিকার বাবা মধুসূদন। মাম্পিকে মেয়ের কথা জানানো হলেও ভাইকে সে কথা জানানোর সাহস হচ্ছে না মধুসূদনের দাদা অলোক রায়ের। তাঁর কথায়, ‘‘কী করে বলব, মেয়েটা আর নেই! ঠিক সময়ে চিকিৎসা শুরু হলে মেয়েটাও ফিরত। দু’মাস হয়ে গেলেও স্বাস্থ্য ভবন কিছুই করল না!’’

অঘটনের সেই রাতে অগ্নিদগ্ধ ঈশিকাকে নিয়ে প্রতিবেশীরা প্রথমে ছোটেন বি সি রায় শিশু হাসপাতালে। সঙ্গে মা না থাকায় সেখানে ঈশিকাকে ভর্তি নিতে চাওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। এর পরে আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ও নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ঘুরে পরের দিন সকালে অনেক কষ্টে শিশুটিকে এসএসকেএমে ভর্তি করানো হয় বলে পরিজনেদের দাবি। একই ভাবে নানা হাসপাতালে ঘুরতে হয় শিশুটির বাবা-মাকেও। ছ’দিনের মাথায় ঈশিকার মৃত্যু হতেই নড়েচড়ে বসে স্বাস্থ্য ভবন। যে সমস্ত হাসপাতাল ঈশিকাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল বলে অভিযোগ, তাদের কাছ থেকে রিপোর্ট তলব করা হয়। কোনও ভাবেই রোগী না ফেরানোর নির্দেশিকাও জারি হয়।

তবে অলোকের অভিযোগ, ‘‘স্রেফ নির্দেশিকাই দেওয়া হয়েছে। আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলেননি।’’ তিনি জানান, স্বাস্থ্য ভবন থেকে তাঁদের ফোন করে ডাকা হয়েছিল। কিন্তু সে দিনই আবার ফোন করে জানিয়ে দেওয়া হয়, আসার দরকার নেই। পরে ডেকে নেওয়া হবে। তার পর থেকে আর কিছুই হয়নি।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করতে যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য-অধিকর্তা অজয় চক্রবর্তী বলেন, ‘‘স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা বিষয়টি দেখছেন। তিনি বলতে পারবেন।’’ তবে বারবার ফোন করা হলেও তা ধরেননি রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা প্রদীপ মিত্র। উত্তর দেননি মেসেজেরও। বাড়ি ফেরার পথে মধুসূদন অবশ্য বলছিলেন, ‘‘ওই পোড়া ঘরেই থাকতে হবে আমাদের। মেয়েটা সুস্থ হয়ে ফিরলে স্বাস্থ্যকর্তারা এক বার দেখে যান, আমরা কী ভাবে থাকি!’’

Fire Ultadanga
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy