Advertisement
E-Paper

বন্ধুকে খুনে যাবজ্জীবন তিন বন্ধুর

ব্যারাকপুর আদালতের বিচারক তাপস মিত্র গত বৃহস্পতিবার তিন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। সাজাপ্রাপ্তেরা হল মহম্মদ সরফরাজ, মহম্মদ ওয়াকিল এবং জাহিদ হোসেন। তিন জনেই জগদ্দলের গোলঘরের বাসিন্দা। প্রিন্সের বাড়ি ছিল জগদ্দলের পূর্বাশায়।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৫ এপ্রিল ২০১৯ ০১:২০
দাবি: বিচার চেয়ে বুধবার ব্যারাকপুর আদালত চত্বরে অভিষেকের পরিচিতেরা। নিজস্ব চিত্র

দাবি: বিচার চেয়ে বুধবার ব্যারাকপুর আদালত চত্বরে অভিষেকের পরিচিতেরা। নিজস্ব চিত্র

বেড়াতে যাওয়ার নাম করে ডেকে নিয়ে গিয়ে গল্প করতে করতে দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়া অভিষেক (প্রিন্স) চৌবেকে খুনই করে ফেলেছিল তার তিন বন্ধু। ঘটনার পরেও অভিষেকের বাড়ির লোকের কাছ থেকে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা চালিয়ে যায় নির্বিকার ওই তিন তরুণ। এক বছর আগের সেই ঘটনায় দোষী তিন তরুণকে বুধবার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিল ব্যারাকপুর আদালত। সকলেরই বয়স কুড়ি থেকে বাইশের মধ্যে।

ব্যারাকপুর আদালতের বিচারক তাপস মিত্র গত বৃহস্পতিবার তিন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করেছিলেন। সাজাপ্রাপ্তেরা হল মহম্মদ সরফরাজ, মহম্মদ ওয়াকিল এবং জাহিদ হোসেন। তিন জনেই জগদ্দলের গোলঘরের বাসিন্দা। প্রিন্সের বাড়ি ছিল জগদ্দলের পূর্বাশায়।

মামলার সরকারি আইনজীবী বিভাস চট্টোপাধ্যায় জানান, ঘটনাটি ঘটে ২০১৮ সালের ২০ জানুয়ারি। বিকেলে পড়তে যাওয়ার নাম করে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল প্রিন্স। কিন্তু সে পড়তে যায়নি। তার বন্ধু জাহিদ এবং সরফরাজ তাকে ডেকেছিল। হুগলি ঘাট এলাকায় গঙ্গার ধারে বসে তিন বন্ধু মদ খায়। রাতের দিকে তারা নৈহাটি জুবিলি সেতুতে বেড়াতে যায়। গল্প করার ফাঁকে তারা প্রিন্সকে বলে, ‘দ্যাখ কত জল’। প্রিন্স ঝুঁকতেই তাকে ঠেলে গঙ্গায় ফেলে দেয় জাহিদেরা। এর পরে সরফরাজেরা মুক্তিপণ আদায়ের জন্য ওয়াকিলকে দলে নেয়। প্রিন্সের ফোনটি ওয়াকিলকে দেয় তারা।

বছর কয়েক আগে মৃত্যু হয়েছে প্রিন্সের বাবার। ছেলে ২০ তারিখ বাড়ি না ফেরায় পরদিন জগদ্দল থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন মা রেণুদেবী। সে দিনই প্রিন্সের ফোন থেকে তাঁর ফোনে ১০ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ চেয়ে মেসেজ আসে। কিন্তু, পাল্টা ফোন করলে অন্য প্রান্ত থেকে কোনও সাড়া মিলত না। বেশিরভাগ সময়ে ফোন বন্ধ থাকত। তবে ফেসবুকে সক্রিয় থাকতে দেখা যেত প্রিন্সকে।

প্রিন্সের জামাইবাবু সুশান্তকুমার সাউ দিল্লিতে চাকরি করেন। তিনি ফেসবুকে ছবি দিয়ে প্রিন্সের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা জানান। সেখানে প্রিন্সের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে মন্তব্য করা হয়, ‘‘আমি তো ওদের সঙ্গেই আছি। ফোন করে দেখো।’’ ফোন করলে অবশ্য কেউ ধরেনি। এই বিষয়গুলি পুলিশকে জানানো হলে, তারা প্রিন্সের মোবাইল ও ফেসবুক অ্যাকাউন্টের তথ্য সন্ধানে নামে। তার আগে একাধিক বার জেরা করা হয়েছিল সরফরাজ এবং জাহিদকে। কিন্তু তাদের দেখে ঘুণাক্ষরেও বোঝা যায়নি যে, তারা প্রিন্সকে মেরে ফেলেছে।

তদন্তে পুলিশ জানতে পারে, প্রিন্সের ফোন থেকেই ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে প্রথমে ওয়াকিলকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জেরা করে ধরা হয় সরফরাজ এবং জাহিদকে। জেরায় সরফরাজ পুলিশকে বলেছিল, ‘‘খাওয়ার পরে যে ভাবে সিগারেট ছুড়ে ফেলি, সে ভাবেই প্রিন্সকে নদীতে ফেলে দিয়েছি।’’ তখন তদন্তকারীরা জানতে পারেন, ৩১ জানুয়ারি খড়দহ ঘাটে এক তরুণের দেহ মিলেছে। ৪ ফেব্রুয়ারি বাড়ির লোকজন সেটিই প্রিন্সের দেহ বলে শনাক্ত করেন।

কেন খুন? পুলিশের জেরায় এবং আদালতে অভিযুক্তেরা স্বীকার করেছিল, প্রিন্স দামি মোটরবাইক ও মোবাইল নিয়ে ঘুরত। সে জানিয়েছিল, তাদের অনেক টাকা। টাকার লোভেই তারা প্রিন্সকে খুন করেছিল। কিন্তু অপহরণ করেও তো মুক্তিপণ নেওয়া যেত? অভিযুক্তেরা জানায়, প্রিন্স তাদের পরিচিত। ফলে মুক্তিপণ নিয়ে তারা এলাকায় থাকতে পারত না। সেই জন্যই তাকে খুন করে গল্প ফেঁদে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা করেছিল।

মামলার রায় দিতে গিয়ে বিচারক বলেছেন, এমন ঘৃণ্য এবং নৃশংস অপরাধ সমাজকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। ‘বন্ধুত্ব’ শব্দের সামনে প্রশ্নচিহ্ন তুলে ধরে। এই মামলায় সাইবার তথ্যের বড় ভূমিকা ছিল। সেই তথ্য ছাড়া দোষীদের অপরাধ এমন নিখুঁত ভাবে প্রমাণ করা যেত না।

সাজা শুনে প্রিন্সের মা রেণুদেবী বলেন, ‘‘ছেলেকে তো আর ফিরে পাব না। তবে এই রায়ে আমরা খুশি।’’

Crime Murder Friend Court
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy