Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

KMC election 2021: শব্দদূষণহীন পরিবেশের অধিকার তো আমাদের আছে

শহরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে তার বিভিন্ন ক্ষতস্থানের দিকেও আলোকপাত করা বিশেষ প্রয়োজন, যার শীর্ষে রয়েছে তীব্র শব্দদূষণ।

পায়েল ঘোষ
কলকাতা ০৮ ডিসেম্বর ২০২১ ০৭:৫৯
প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

কলকাতা শহরে আমরা তিন প্রজন্ম ধরে আছি। ঠাকুরমার জন্ম গড়পারে, বাবার গোয়াবাগানে, আর আমার বেলেঘাটায়। বর্তমানে আমি অবশ্য দমদম পার্কের বাসিন্দা। জন্ম থেকে এ শহরের সঙ্গে এতটাই ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে গিয়েছি যে, শহরটাকে জীবনযাপনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসাবেই ভাবি।

গত কয়েক বছরে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখেছি এ শহরে, যে তালিকার শীর্ষে রয়েছে পরিচ্ছন্নতা। এ ছাড়াও একাধিক উড়ালপুল-আন্ডারপাস, সবুজায়নের উদ্যোগ, পার্ক-স্টেডিয়াম-জলাশয়ের সংস্কার, রাস্তার আলোকায়ন, বাসস্টপের আধুনিকীকরণ এবং বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গি ও ম্যালেরিয়ার মশা দমনে সরকারি প্রচেষ্টার কথা বলতেই হয়। এ সবই হল আমাদের শহরের ইতিবাচক দিক।

কিন্তু শহরের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে গেলে তার বিভিন্ন ক্ষতস্থানের দিকেও আলোকপাত করা বিশেষ প্রয়োজন, যার শীর্ষে রয়েছে তীব্র শব্দদূষণ। টালা থেকে টালিগঞ্জ, রক্তদান শিবির হোক বা শীতবস্ত্র প্রদান, ক্রিকেট-ফুটবল টুর্নামেন্ট হোক বা পিঠে-পুলি উৎসব অথবা নাম-সংকীর্তন— অনুষ্ঠানের আয়োজকেরা প্রথমেই বেশ কয়েকটি সাউন্ড বক্স বা চোঙা লাগিয়ে ফেলেন। তার পরে বিকট আওয়াজে পাড়া সরগরম করে শুরু হয় সেই উদ্যোগের উদ্‌যাপন। এই পরিস্থিতিতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদের করণীয় কিচ্ছু থাকে না। কারণ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এই সমস্যা নিরসনের জন্য উদ্যোক্তাদের সাউন্ড বক্সের আওয়াজ কমানোর অনুরোধ করা, পাড়ার কাউন্সিলরের দ্বারস্থ হওয়া, স্থানীয় থানায় জানানো অথবা সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা— সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়। কেউ কোনও ভাবেই এই সমস্যার সমাধান করতে পারেন না। কেন পারেন না, সেই অজ্ঞাত কারণটা জানতে খুব ইচ্ছে করে। এই নিয়ন্ত্রণহীন শব্দদূষণের জেরে ক্রমাগত ভুগছে সদ্যোজাত শিশুরা, স্কুলপড়ুয়ারা (যাদের অনেকেরই এখন বাড়িতে বসেই স্কুল), বাড়িতে থাকা প্রচুর পেশাদার মানুষ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুরা, শারীরিক বা মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষ এবং প্রৌঢ়-প্রৌঢ়ারা। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের এটুকু অন্তত বোঝা উচিত যে, এই শহর যতটুকু পাড়ার দাদা, নেতা বা উৎসবের উদ্যোক্তাদের, ততটাই আমাদের মতো সাধারণ নাগরিকদেরও। পাড়াতুতো দাদাদের যেমন ‘আনন্দ’ করার অধিকার আছে, ঠিক তেমন সাধারণ নাগরিকদেরও শব্দদূষণহীন, সুস্থ পরিবেশ চাওয়ার অধিকার আছে।

Advertisement

এ বার আসি পরবর্তী ক্ষতস্থানের প্রসঙ্গে। বৃষ্টি হলে রাস্তায় যে জল জমে, এ তথ্য কলকাতাবাসীর কাছে নতুন নয়। কিন্তু বেশ কয়েক বছর ধরে দেখছি, কলকাতার বিভিন্ন জায়গায় জল জমে থাকার মেয়াদ দিন পাঁচেকও গড়িয়ে যাচ্ছে। দুর্গন্ধময় কালো জলের মধ্যে আদ্যন্ত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে দিনের পর দিন কাটাতে হচ্ছে ওই সমস্ত এলাকার বাসিন্দাদের। সময় মতো খাল সংস্কার করা বা নিকাশি ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ— কোনওটাই ঠিক ভাবে হয়ে উঠছে না। কলকাতার পার্শ্ববর্তী অনেক উপনগরীতেও একই পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে। যত ক্ষণ না রাস্তা অবরোধ করে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ জানাচ্ছেন, তত ক্ষণ পর্যন্ত নিকাশির মতো একটি জরুরি
পরিষেবা নিয়ে কোনও উদ্যোগই দেখা যায় না প্রশাসনের। একটি শহরকে সুস্থ গতিতে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে এই বিষয়টিতে নজর দেওয়া খুবই জরুরি।

আর একটি বড় সমস্যা দৃশ্যদূষণ। বিজ্ঞাপন ও রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক হোর্ডিংয়ে তিলোত্তমার নাভিশ্বাস ওঠার অবস্থা। কিছু হোর্ডিংয়ের বানান বা ভাষা এতটাই অস্বস্তিদায়ক যে, এ শহরকে সংস্কৃতির পীঠস্থান বলে ভাবতে দ্বিধা হয়। আর আছে মাথার উপরে তারের জঙ্গল। বৈদ্যুতিক তারের সঙ্গে কেব্‌ল সংযোগ ও ব্রডব্যান্ডের তার অগোছালো ভাবে ছড়িয়ে আছে শহর জুড়ে। এ বিষয়ে প্রশাসনিক উদ্যোগ একান্ত জরুরি।

আরও একটি বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। পেশাগত কারণে আমাকে অভিভাবক ও বাচ্চাদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে হয়। একটা বিষয় লক্ষ করেছি, বর্তমানে বাচ্চাদের মধ্যে শারীরিক সুস্থতার অভাব বড় বেশি। নিয়মিত খেলাধুলো বা শারীরচর্চা— কোনওটাই তাদের রোজকার দিনলিপিতে নেই। সে ক্ষেত্রে প্রশাসনের তরফে পাড়ার পার্ক বা খেলার জায়গাগুলিতে ‘ফিটনেস কোচ’ নিযুক্ত করা হলে সব বয়সের বাচ্চারা নিয়মিত ভাবে শারীরিক কসরতের সুযোগ পায়। এর ফলে তাদের অতিচঞ্চলতার সমস্যা কিছুটা হলেও কমতে পারে। সব চেয়ে বড় কথা হল, এই ধরনের উদ্যোগে তাদের মনের আনন্দ-সূচক অনেকটাই বাড়তে পারে।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি বিষয় নিয়ে বলা প্রয়োজন। বর্তমানে আমরা ছোট থেকে বড়, প্রায় সকলেই কমবেশি স্মার্টফোনের প্রতি আসক্ত, যা আমাদের মনঃসংযোগ ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাচ্চাদের উপরে এর প্রভাব আরও মারাত্মক। তাই শহর জুড়ে যদি কিছু ‘গ্যাজেট ফ্রি’ জ়োন তৈরি করা হয়, তা হলে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক হবে। যেমন, কোনও পার্ক বা রেস্তরাঁর একাংশ এ ভাবে চিহ্নিত করলে খুব ভাল হয়। এতে নির্বিঘ্নে পারিবারিক সময় কাটানোর অভ্যাসও তৈরি হবে আমাদের মধ্যে, যা বর্তমানে দুর্লভ হয়ে উঠেছে।

পরিশেষে বলতে চাই, আমাদের শহরকে সুস্থ ও সুন্দর করে তোলার সব রকম উপকরণ এবং সম্ভাবনা রয়েছে। দরকার শুধু সততা এবং নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে সেই ইতিবাচক পরিবর্তনগুলো করার সদিচ্ছা। আশা করি, আমাদের সেই আশা পূরণ করবেন শহরের যত্ন নেওয়ার দায়িত্বে থাকা প্রশাসনিক ব্যক্তিরা।

পেরেন্টিং কনসালট্যান্ট

আরও পড়ুন

Advertisement